ছাত্রলীগেই ডুবছে আওয়ামী লীগ


প্রকাশিত: ০৪:৪২ এএম, ২৩ জুন ২০১৫

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের নানা সাফল্য ম্লান করছে তারই ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই ছাত্রলীগ যেন অতিবেপরোয়া হয়ে ওঠে।

আন্দোলন-সংগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সংগঠনটি খোদ আওয়ামী লীগের জন্যই এখন বিষফোঁড়া। ফলে অর্জন, সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ৬৭ বছরে পা রাখা আওয়ামী লীগ অস্থির সময় পার করছে ছাত্রলীগের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের কারণে।

পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শুরুতে জন্ম নেয়া ছাত্রলীগ শুরু থেকেই গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের ঐতিহ্য ধারণ করতে থাকে। মূল সংগঠনের সঙ্গে একাত্বতা রেখে ৫২`র ভাষা আন্দোলন, ৬২`র ছাত্র আন্দোলন, ৬৬`র ছয় দফা, ৬৯`র গণঅভ্যুত্থান, ৭০`র নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধসহ প্রতিটি আন্দোলনে ছাত্রলীগ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে । সর্বশেষ স্বৈরাচার শাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও ছাত্র সংগঠনগুলোকে নেতৃত্ব দেয় ছাত্রলীগ। ছাত্র সংগ্রামের ঐতিহ্যের নাম বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

অথচ কালের বিবর্তনে ঐতিহ্য হারাতে বসেছে ছাত্রলীগ। পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে সংগঠনটির নানা অপকর্ম। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রলীগ যেন এক মূর্তমান আতঙ্কের নাম। গত ছয় মাসেই ছাত্রলীগের সঙ্গে ছাত্রলীগের সংঘর্ষে কমপক্ষে পাঁচজন প্রাণ হারিয়েছে। ১৬ এপ্রিল দিনাজপুরে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে দুইজন ছাত্রলীগ নেতা নিহত হয়েছেন। ১৩ এপ্রিল কুমিল্লায় দুই গ্রুপের সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন শহর ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুল ইসলাম। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নভেম্বর মাসে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের নিজেদের মধ্যকার সংঘর্ষে আরও দুই জন নিহত হয়।

মহাজোট সরকারের সাড়ে ৬ বছরে ছাত্রলীগের সঙ্গে ছাত্রলীগের এবং ছাত্রলীগের সঙ্গে অন্যান্য সংগঠনের মধ্যকার সংঘর্ষে প্রায় অর্ধশত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়েছে। ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ হয়েছে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে। একাধিকবার বন্ধের ঘটনা ঘটেছে অন্তত অর্ধ ডজন বিশ্ববিদ্যালয়। এভাবে বারবার শিক্ষা বন্ধ হয়ে পড়ায় হাজার হাজার শিক্ষার্থী চরম ভোগান্তিতে পড়ে। বিপর্যয়ের মুখে পড়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম।

বিভিন্ন অপরাধের ভিত্তিতে ১৭০ জনের অধিক নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার হয়েছেন দুই ডজনরেও বেশি নেতাকর্মী। তবে এসব বহিষ্কার অনেকটাই লোক দেখানো বলে জানা গেছে। ক্ষমতার দাপটে দলীয় কার্যক্রমে অংশ নেয়ার পাশাপাশি বহিষ্কৃতদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্লাস-পরীক্ষাতেও অংশ নিতে দেখা গেছে।
 
ছাত্রলীগের এরকম কর্মকাণ্ডের কারণে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের সাংগাঠনিক নেত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। ছাত্রলীগের অপকর্মের সমালোচনা করে অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলামের মতো বিশিষ্টজনরা ২০১০ সালের ১১ এপ্রিল গণমাধ্যমে বিবৃতিও দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছিলেন, ছাত্রলীগের মধ্যে ছাত্র শিবিরের অনুপ্রবেশ ঘটছে। ছাত্রলীগের আচরণে বিরাগভাজন হয়ে বক্তব্য দিয়ে আসছেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা।

হল দখল, চাঁদাবাজি, মাস্তানি, টেন্ডারবাজি, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, মাদক ব্যবসা, নানা অপরাধমূলক কাজে ভাড়া খাটা ও দখল-বাণিজ্য যেন ছাত্রলীগের নিত্যদিনের ঘটনা। এসময় ছাত্রলীগের হাতে লাঞ্চিত হয়েছেন অসংখ্য নারী, সাংবাদিক, পুলিশ, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী। প্রশ্নপত্র ফাঁস, নকল বাণিজ্য, পরীক্ষার হল কন্ট্যাক্ট করেও লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ছাত্রলীগ। আবার নিজেদের দ্বন্দের কারণেই ধর্মঘট ও অবরোধ ডেকে ক্যাম্পস অচল করার দৃষ্টান্তও স্থাপন করেছেন তারা।

এসব অপকর্মের কারণে ছাত্রলীগ-ই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, মুল সংগঠন আওয়ামী লীগকেও এর চরম খেসারত দিতে হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের ভাবমূর্তি যতটুকু ক্ষূন্ন হয়েছে তার পেছনে ছাত্রলীগের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডই অনেকাংশে দায়ী বলে মনে করেন দলের নেতারা। ছাত্রলীগের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কারণেই সরকারের নানা বিষয়ের সাফল্য জনগণের সামনে তুলে ধরা যায়নি। ফলে ৬৭ বছরে পা রাখা আওয়ামী লীগ তার ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগকে নিয়েই এখন মহাবিপাকে।

আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগের রাজনীতি খুব কাছে থেকে পর্যবেক্ষণ করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড নিয়ে কথা হয় এই ইতিহাসবিদের সঙ্গে। অধ্যাপক আনোয়ার বলেন, ‘আওয়ামী লীগের মতো ছাত্রলীগেরও আন্দোলন-সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রলীগের ভূমিকা ঈর্ষনীয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছাত্রলীগ তার নীতি আদর্শ থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। যে ছাত্রলীগে গণতান্ত্রিক আন্দোলের অগ্রসৈনিক ছিল, সেই ছাত্রলীগের কারণেই গণতন্ত্র আজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘মহাজোট সরকার আমলে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু ছাত্রলীগ-যুবলীগের অপকর্মের কারণে, তা ম্লান হয়ে গেছে। ছাত্রলীগের কারণেই সরকার তার সাফল্যের কথা জনসম্মুখে তুলে ধরতে ব্যর্থ হচ্ছে।’
    
এএসএস/এআরএস/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।