এটিএম মাসুম
গণরায় নিয়ে টালবাহানা করলে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মাসুম বলেছেন, জনগণের দেওয়া গণরায় বাস্তবায়নে বিলম্ব, টালবাহানা কিংবা অস্বচ্ছতা নিয়ে দেশের বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ ও অসন্তোষ বাড়ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং সাধারণ জনগণের একাংশ মনে করছেন, জনগণের স্পষ্ট মতামত উপেক্ষা করা হলে দেশে নতুন করে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
শনিবার (১৬ মে) সকালে নগরীর সাফা আর্কেড কমিউনিটি সেন্টারে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা জামায়াত আয়োজিত রুকন সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি অভিযোগ করেন, জনগণ দীর্ঘদিনের সংকট, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে যে রায় দিয়েছে, সেটি দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় যদি অযথা বিলম্ব করা হয় বা রাজনৈতিক কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয় তাহলে জনমনে ক্ষোভ আরও বাড়বে।
এটিএম মাসুম বলেন, জনগণের প্রত্যাশা এখন শুধু প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ নয়; তারা বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। বিশেষ করে ভোটাধিকার, সুশাসন, আইনের শাসন এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে জনগণের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। জনগণের রায়কে দুর্বল করার বা উপেক্ষা করার যেকোনো চেষ্টা জনগণ ভালোভাবে নেবে না। কারণ ইতিহাসে দেখা গেছে, যখন মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে, তখনই জনরোষ বিস্ফোরিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা যে আন্দোলন শুরু করেছি, তা কোনো ব্যক্তি, দল বা ক্ষমতার স্বার্থে নয়; এটি মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা এবং সত্য প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের মুক্তি, সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং এমন একটি রাষ্ট্র ও সমাজ গঠন করা, যেখানে জুলুম, অবিচার, বৈষম্য ও দমন-পীড়নের কোনো স্থান থাকবে না।
তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, পৃথিবীতে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি মহান আল্লাহর কাছেও একটি উত্তম আমল। আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন মর্যাদা দিয়ে, আর সেই মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা, মজলুমের পাশে দাঁড়ানো এবং সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া ঈমানি চেতনারই অংশ।
এটিএম মাসুম বলেন, এই আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা এমন এক সমাজ গড়তে চাই, যেখানে মানুষ ভয় নয়, স্বাধীনভাবে বাঁচবে; যেখানে মতপ্রকাশের অধিকার থাকবে; যেখানে দুর্নীতি, অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে আইনের সঠিক প্রয়োগ হবে। যেখানে ধর্ম, বর্ণ ও মতভেদ ভুলে সবাই মানবিক মূল্যবোধে ঐক্যবদ্ধ থাকবে।
তিনি বলেন, আমরা অন্যায়, শোষণ ও ভয়ের রাজনীতি থেকে দুনিয়ার মানুষের মুক্তি চাই। একই সঙ্গে আমরা পরকালে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে চাই। তাই আমাদের প্রত্যেক পদক্ষেপ হতে হবে সততা, ধৈর্য, ন্যায় এবং মানবকল্যাণের পথে পরিচালিত।
সম্মেলনে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান। সংগঠনকে আরও শক্তিশালী, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং আদর্শভিত্তিক করতে রুকনদের (সদস্যদের) আদর্শ সংগঠক হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তিনি বলেন, একটি সুসংগঠিত ও লক্ষ্যভিত্তিক আন্দোলন বা সংগঠন টিকিয়ে রাখতে হলে সদস্যদের মধ্যে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা এবং দায়িত্ববোধ থাকা অপরিহার্য। সংগঠনের মূল শক্তি সদস্যরা। রুকনরা যদি আদর্শ, সৎ ও সংগঠকসুলভ চরিত্রের অধিকারী হন তাহলে সংগঠন আরও গতিশীল ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সংসদ সদস্য আলহাজ শাহাজাহান চৌধুরী বলেন, সামাজিক কাজ শুধু দান-অনুদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি দায়িত্ববোধ, একটি মানবিক চেতনা এবং সমাজ পরিবর্তনের শক্তিশালী মাধ্যম। শিক্ষার প্রসার, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, বৃক্ষরোপণ, স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং তরুণ প্রজন্মকে নৈতিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করা—এসবই সামাজিক কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হলে পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংগঠন এবং ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা জামায়াতের আমির আলা উদ্দীন সিকদারের সভাপতিত্বে ও জেলা সেক্রেটারি আব্দুল জব্বারের পরিচালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতের ফেনী জেলার সাবেক আমির ও কুমিল্লা অঞ্চলের টিম সদস্য অধ্যাপক লিয়াকত আলী ভূঁইয়া, চট্টগ্রাম জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক ফজলুল করিম, সাংগঠনিক সেক্রেটারি আনোয়ার ছিদ্দিক চৌধুরী, বায়তুলমাল সেক্রেটারি ড. আব্দুল হামিদ চৌধুরী, জেলা কর্মপরিষদ সদস্য মাস্টার নুরুচ্ছাম, অধ্যক্ষ নুর নবী, ইঞ্জিনিয়ার বোরহান উদ্দিন, অধ্যাপক মাওলানা বোরহান উদ্দিন, রফিকুল ইসলাম প্রমুখ।
এমআরএএইচ/এমএমকে