প্রবাসে অন্তর্দহনে ছারখার হওয়ার একদিন

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:২২ পিএম, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

পরবাস জীবন চলছে তার নিয়মে; কোথাও কোনো অনিয়ম নেই। প্রতিদিন একই সময় অফিসে যাওয়া, একই সময় বাসায় ফেরা, একই সময় ঘুমাতে যাওয়া, এ যেন রোবোটিক জীবন। কেউ একজন সব সেটআপ করে দিয়েছে আর আমি চলছি সেই নির্দেশনা অনুযায়ী। মাঝেমধ্যে এই জীবনটার প্রতি একঘেয়েমি চলে আসে। জীবনটা তুচ্ছ ও সামান্য মনে হয়।

সবসময় একটা ভয় তাড়া করে আমায়, কখন জানি এই জীবন থমকে যায়। কত মানুষই তো স্বপ্ন প্রত্যাশা নিয়ে ঘুমাতে যায়। সকালে তার নিস্তেজ দেহ আবিস্কৃত হয়। ঘুমের মধ্যেই সে স্বপ্নগুলো অপূর্ণ রেখে পরপারে পাড়ি জমায়। মাঝেমধ্যে জানতে ইচ্ছে হয়। মানুষ কি সত্যিই ঘুমের মধ্যে মারা যায়। অনেক মহান ব্যক্তিরা বলেন, সৃষ্টিকর্তা মানুষকে জাগ্রত অবস্থায় দুনিয়ায় আনেন আবার জাগ্রত অবস্থাই দুনিয়া থেকে নিয়ে নেন।

মাঝেমধ্যে খুব অস্থিরতায় ভুগি। সৃষ্টিকর্তা এতকিছু শেয়ার করার ক্ষমতা দিলো অথচ জন্ম ও মৃত্যুর অনুভূতি কারো কাছে শেয়ার করার অধিকার দিলো না। একমাত্র জন্ম আর মৃত্যুর অভিজ্ঞতাই মানুষ কারো কাছে শেয়ার করতে পারে না।

আচ্ছা মৃত্যু মানেই তো সব শেষ। এইতো কয়েকদিন শোক, সমালোচনা। তবে অনেকেই জীবিত অবস্থার চেয়ে মৃত্যু অবস্থায় বেশি শক্তিশালী হয়। তবে আমার মৃত্যুর কিছুদিন পর ওমর ফারুকী নামের কেউ একজন ছিল সবাই তা ভুলে যাবে। এটাই হয়ত প্রকৃতির নিয়ম। এই নিয়নের বাহিরে যাওয়ার সাধ্য কারো নেই।

এই তো কয়েক মাসে একজন প্রবাসীর কষ্টের সাক্ষী হয়েছিলাম। সেদিন আমার বন্ধের দিন ছিল, সারাদিন বাসায় থাকার পর বিকেলে বের হয়েছিলাম। সেদিনের বিকেলটা ছিল খুবই সুন্দর। পশ্চিমাকাশে সূর্য দিনের শেষ উত্তাপ ছড়িয়ে আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে রক্তিম আকার ধারণ করেছিল। সূর্যটাকে তখন বিশাল উত্তপ্ত প্লেট মনে হয়েছিল। কালো মেঘ এসে সূর্যকে আড়াল করে দিলে, আমি নির্বাক তাকিয়ে ছিলাম। এমন ক্ষমতা সম্পূর্ণ সূর্য যে সারা বিশ্বকে আলো দিয়ে প্রাণ বাঁচিয়ে রেখেছে, তাকে সামান্য মেঘখণ্ড আড়াল করে দিলো।

আস্তে আস্তে মেঘটা সরে যায়। একঝাক নাম না জানা পাখি গোলাকার লাল সূর্যের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়া দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছিলাম। কি যে দারুন দৃশ্য!

তখন রাস্তায় লোকগুলো ব্যস্তভাবে হেঁটে বাসায় ফিরছিল, এমন সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করার সময় কারো হাতে নেই। আসলে পেটে ক্ষুধা নিয়ে আর যাই হোক প্রকৃতি উপভোগ করা যায় না। কর্মক্লান্ত মানুষগুলোর মনে নিজের বাসস্থান ছাড়া আর কিছুই ছিল না। সবাই যেন বাসায় ফিরে বিছানায় গা এলিয়ে দিলেই প্রশান্তি পায়।

সেদিন অবসর না হলে প্রকৃতি এত কাছে হতে দেখা হতো না। প্রবাসে অবসর পাওয়াটা খুবই কঠিন। সপ্তাহে একদিন ছুটি থাকলেও অনেকেই ছুটি নেয় না। তার কারণ ছুটির দিন কাজ করলে দ্বিগুণ হাজিরা দেওয়া হয়। বাসায় বসে না থেকে যদি দ্বিগুণ হাজিরা আসে, কে ছুটি নিয়ে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে চায়।

কিছুক্ষণ প্রকৃতি উপভোগ করার পর আমিও ভিড়ের সাথে মিশে বাসার দিকে রওনা দিয়েছিলাম। আমি আনমনে হাঁটছি হঠাৎ লক্ষ্য করি আমার সামনে একজন হাউমাউ করে কান্না করছে আর ধীরে ধীরে হাঁটছে। তার মুখের সামনে একটি মোবাইল কানের কাছে আরেকটি। এভাবে দুই হাতে দুই মোবাইল নিয়ে একজনকে কান্না করতে দেখে অবাক না হয়ে পারিনি। লোকটি আমার কাছাকাছি আসতেই তার চোখের পানি দেখে মন খারাপ হয়ে গেলো।

আশ্চর্য লোকটির কান্না চোখের পানি কাউকে প্রভাবিত করল না। সবাই যার যার মত হেঁটে যাচ্ছিল। লোকটি সামনে এলে সবাই সরে তাকে যেতে রাস্তা করে দিয়েছিল। আসলে আমরা যখন নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকি তখন অন্যের দুঃখ কষ্ট আমাদের প্রভাবিত করে না।

আমরা সবাই যার যার মতো করে হেঁটে যাচ্ছি অথচ কেউ জানলাম না কিংবা জানার চেষ্টা করছি না প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে তার ভেতরটা তছনছ হয়ে যাচ্ছে। আমি থমকে দাঁড়ালাম। তার কান্নার কারণ জানার জন্য উদগ্রীব হলাম। আমি তার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধে হাত রেখে বলেছিলাম, ভাই এভাবে কান্না করছেন কেন? আমার উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি আমাকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কান্না শুরু করলেন।

তার আচরণে আমি বিব্রত। একজন অচেনা অজানা লোককে জড়িয়ে কান্না করতে কাউকে এই প্রথম দেখলাম। হয়ত লোকটা কান্না করার জন্য অবলম্বন খুঁজছিল। আমাকে দেখে তার ভেতরের জমে থাকা লোনা জল এক নিমিষে উপচে পড়তে লাগল।

লোকটিকে শান্ত্বনা দিয়ে বললাম, ভাই কান্না করবেন না। আপনার কি হয়েছে বলা যাবে কি? তিনি আমার কাঁধ থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে বড় মোবাইলটি আমার হাতে দিলেন। মোবাইলের স্কিনে একটি পাঁচ কিংবা ছয় বয়সের ছেলের কাফনে মোড়ানো লাশ দেখে আঁতকে উঠলাম, মুহূর্তে আমার ছেলেদের কথা মনে পড়ে গেল। বাচ্চা ছেলেটি আমার আপনের চেয়ে আপন হয়ে গেলো।

এ যেন আমারই সন্তান সাদা কাফন জড়িয়ে শুয়ে আছে। আমি নিজেকে স্থির রাখতে পারলাম না। বুঝতে পারলাম এটা তারই সন্তান, লোকটা এতক্ষণ সন্তান হারানোর কষ্টে এভাবে কান্না করছিল।

আমি তার দিকে তাকিয়ে নিজেকে দেখতে পেলাম। এমন কোমল শিশুর লাশ দেখার পর আর কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না। পৃথিবীতে সবচেয়ে কষ্টকর দৃশ্য হলো সাদা কাফনে জড়ানো সন্তানের লাশ দেখা। ভাইকে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে বসিয়ে পরিচয় জানতে চাইলাম। ভাই কান্নাজড়িত কণ্ঠে তার কথা বলতে লাগলেন।

আমার নাম ফরিদ (কাল্পনিক)। দেশের বাড়ি কুমিল্লা। আমি বিয়ে করে সিঙ্গাপুর চলে আসি। বিয়ের পর আমার সন্তান হচ্ছিল না। এই নিয়ে দুঃখের দহনে পুড়ছিলাম। এরপর তিনি থেমে গেলেন। আমি তার দিকে তাকিয়ে দেখি তার দু'চোখ গড়িয়ে লোনা জল ঝরছে। সে কিছুটা সময় নিয়ে জামার হাতায় চোখের জল মুছে বলতে আরম্ভ করল। সন্তান হচ্ছিল না মানে আমার দুটি সন্তান জন্মের পরপর মারা যায়। প্রথম সন্তান গর্ভে আসার দুইমাস পর গর্ভেই নষ্ট হয়ে যায়।

দ্বিতীয় সন্তানটি জীবিত অবস্থায় দুনিয়ায় এলেও মৃত্যু সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল। জন্মের পরই তার নিউমিনিয়া ধরা পড়ে। সাথে সাথে ডাক্তাররা তাকে আইসিওতে ভর্তি করে। তখন আমি দেশে গিয়েছিলাম। বউ আমাকে দেখে অসহায়ভাবে তাকিয়ে ছিলো। তার অসহায় চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল সে অপরাধী সে আমাকে বলছে, সরি আজও আমি তোমাকে একটি সন্তানও দিতে পারেনি। মানুষের চোখের একটা ভাষা আছে, যা সকলে বোঝে না। আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে সবই বুঝেছিলাম।

আমি তাকে জড়িয়ে কপালে চুমু দিয়ে বলেছিলাম, তোমার কোন দোষ নেই, সবই আমার কপালের দোষ। বউ আমাকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদেছিল সেদিন। তার কান্না আমার ভেতরটা ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছিল।

এরপর বুকে সাহস জুগিয়ে মৃত্যু শয্যায় শায়িত সন্তানের দর্শনে গিয়েছিলাম। আমার বুকের ধনকে দেখে আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনি। দেখতে ঠিক রাজপুত্রের মতই হয়েছিল। আমি কাছাকাছি দাঁড়িয়ে তাকে মনেপ্রাণে দেখছিলাম। মনে হয়েছিল এ যেন আমার আত্মা, কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস। সেদিন রাতেই তার মৃত্যু হয়।

তার মৃত্যুতে পুরো পরিবারে শোকের ছায়া নেমে আসে। আস্তে আস্তে সেই শোককে ভুলে আমরা নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখি। পৃথিবীতে কোনো কিছুই স্থায়ী না তেমনি আমাদের শোকও। অনেক সাধনার পর আমার ৩য় সন্তানের জন্ম হয়। তাকে পেয়ে আমরা সবকিছু ভুলে যাই। পরিবারের সবাই তাকে মনপ্রাণে ভালোবেসে বড় করতে থাকে।

আমি বছরের দুইবার সন্তানকে দেখতে দেশে যাই। একবার সিঙ্গাপুরে ছেলে ও ছেলের মাকে ঘুরতে এনেছিলাম। তখন কি যে আনন্দে কেটেছিল দিন তা আপনাকে বুঝাতে পারব না।

সেই মানিক আমার বাড়ির পাশের পুকুরে ডুবে আজ মারা যায়। আমি কিভাবে সেই কষ্ট সইব। তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না। তার কান্না দেখে আমারও দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। তার কান্নায় কোন বাধা দিলাম না। সে আজ কান্না করুক মন খুলে কান্না করুক, আজ তো তার কাঁদারই দিন।

কান্না থামিয়ে ভাই বলেছিলেন, জানেন ভাই ছেলের মৃত্যুতে বউ অজ্ঞান হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছে। বউয়ের সামনে কিভাবে দাঁড়াব। তাকে কি বলে শান্ত্বনা দেব। আমি যে এক অসহায় পিতা যে সন্তানকে দেখে রাখতে পারেনি।

আমি তার কাঁধে হাত রেখে বলেছিলাম, আপনাকে শক্ত হতে হবে। আপনি বাড়ি গিয়ে বউয়ের পাশে দাঁড়ান নইলে উনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়বেন। ফরিদ ভাই উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, হ্যাঁ ভাই আমি দেশে যাব। আর প্রবাসে আসব না। যার জন্য প্রবাসে পড়েছিলাম সে সন্তানই নেই, তাহলে আর প্রবাসে পড়ে থেকে কি হবে।

ফরিদ ভাই আর দাঁড়ালেন না। তিনি এক বুক কষ্ট নিয়ে চলে গিয়েছিলেন। আমি পেছন থেকে তার চলে যাওয়া দেখে দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছিলাম। এর চেয়ে আমার আর কিবা করার ছিল।

এখন জানি না ফরিদ ভাই কেমন আছেন। তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করিনি। তার সাথে কি বলে কথা শুরু করব তাই ভেবে পাচ্ছিলাম না। পৃথিবী হয়ত তার নিয়মে চলছে কিন্তু কেউ জানে না তার স্ত্রী আর তার মনের কি অবস্থা।

বাহিরের থেকে হয়ত তারা সহজ স্বাভাবিকই থাকবেন কিন্তু ভেতর থেকে দু'জন সারাজীবন সন্তান হারানোর বেদনা বয়ে বেড়াবেন। প্রকৃতির নিয়ম উপেক্ষা করার সাধ্য কারো নেই। একজন প্রবাসীর এভাবে অন্তর্দহনে পোড়ার সেই দিনটি আজও আমাকে পিড়িত করে। তার কথা মনে পড়তেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি।

ওমর ফারুকী শিপন, সিঙ্গাপুর থেকে/এমআরএম/এমএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]