ধনীদের কর ফাঁকি, মাশুল গুনছেন খেটে খাওয়ারা

প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩:১৭ পিএম, ৩০ নভেম্বর ২০২০

আম্বিয়া অন্তরা, নিউইয়র্ক থেকে

আজ ৩০ শে নভেম্বর, আয়কর দিবস। ২০০৭ সাল থেকে দিনটি বাংলাদেশে জাতীয়ভাবে পালিত হয়ে আসছে। একটি দেশের উন্নতি অনেকাংশে নির্ভর করে আয়কর গ্রহণ করার ওপর। সেক্ষেত্রে আমাদের দেশে অনেক ব্যতয় আছে।

দেশে থাকাকালীন আমি একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হিসাবে এই শব্দটার সঙ্গে পরিচিত ছিলাম। রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আনুগত্য প্রকাশের মাধ্যম হচ্ছে কর প্রদান করা। কিন্তু আয়কর দিতে গিয়ে মুখোমুখি হতে হয়েছে নানাবিধ তিক্ত অভিজ্ঞতার। এই কথাগুলোর সঙ্গে বেশি পরিচিত হয়েছি; এত টাকা কর দেবেন কেন? আমাদের হাতে ছেড়ে দিন, আমরা অনেক কমিয়ে দেব।

বিনিময়ে আমাদের একটা অংশ দিতে হবে। এ রকম হয়রানির কারণে আমরা কর প্রদানে উৎসাহ হারিয়ে ফেলতাম। দেশে ২০০৭ সালের পর বহু সভা সেমিনার রাষ্ট্রীয় কারসাজি ইত্যাদি দেখতে দেখতে এতগুলো বছর যাওয়ার পরেও স্বচ্ছভাবে কর আদায়ের একটা সুন্দর পথ আমরা দেখতে পাইনি। অবাক করার বিষয় হলো প্রতিবছর যাদের নাম শ্রেষ্ঠ কর-দাতাদের সারিতে উঠে আসে তারা দেশের ধনীর তালিকায় থাকে না।

এই ফিলোসফিক্যাল সমীকরণ প্রতিটি সাধারণ নাগরিককে কিছুটা ভাবায় এবং স্পষ্ট হয়ে আসে এই খাতে ব্যাপক হারে অনিয়মের বিষয়। যেসব দেশে কর নির্ধারণ করা আছে সেসব দেশের বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ নির্ধারিত হয় নাগরিকদের থেকে প্রাপ্ত আয়কর থেকে।

যদিও দেশ ভেদে আয়করের রয়েছে ভিন্নতা। যেমন উচ্চ হারের আয়কর দেয়ার ক্ষেত্রে সবার প্রথমে আছে সুইডেন যেখানে প্রায় ৫৭.২ শতাংশ আয়কর দেয়া হয়, ডেনমার্কে ৫৫.৯ শতাংশ আয়কর দেয়া হয়, অস্ট্রিয়ায় ৫৫ শতাংশ আয়কর দেয়া হয়, ফিনল্যান্ডে ৫৩.৬০ শতাংশ আয়কর দেয়া হয়, আরুবায় ৫২ শতাংশ আয়কর দেয়া হয়, নেদারল্যান্ডসে ৫১.৬০ শতাংশ। সব শেষে রয়েছে ইসরায়েল ও স্লোভেনিয়া, বেলজিয়াম যেখানে ৫০ শতাংশ করে আয়কর দেয়া হয়।

এছাড়াও সরাসরি নাগরিকদের থেকে কর নেয়া হয় না অ্যাঙ্গুইলা, অ্যান্টিগুয়া ও বার্বুডা, বাহামা, বাহরাইন, বারমুডা, ব্রুনাই দারুসসালাম, কেম্যান দ্বীপপুঞ্জ, কুয়েত, ওমান, কাতার, সেন্ট কিটস ও নেভিস, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত; আর তা স্পষ্টত দেশের অর্থনীতি এবং পলিসির সাথে সম্পর্কিত।

এখন প্রশ্ন হলো কর আমরা কেন দেব? একজন করদাতা নাগরিক হিসাবে একটা উদাহরণ দেই। বর্তমানে নিউইয়র্কে আছি, সামান্য একজন নাগরিক হয়ে এখানে প্রতিবছর সরকারকে বড় অঙ্কের আয়কর জমা দিই। যা বাংলাদেশের শীর্ষ করদাতাদের ধনীরাও হয়তোবা দেয় না। বলে রাখি আমারও বাৎসরিক আয় খুব বেশি নয়। আর এটা নিশ্চিতভাবে দেই বলেই নিউইয়র্কের জীবন যাত্রা নিরাপত্তা অনেক উঁচু, আর এই কর স্বচ্ছভাবে দেয়ার কারণেই নিউইয়র্কের নাগরিকদের সেবা এবং আয় ব্যয়ের একটা ভারসাম্য লক্ষণীয়।

আমাদের দেশে সরাসরি খাত হলো ১. প্রতিরক্ষা ২. অভ্যন্তরীণ শান্তি ও শৃংখলা বজায় রাখা ৩. বিচার বিভাগ ৪. নগরায়ণ খাত ইত্যাদি। কর বা রাজস্ব উন্নতি ত্বরান্বিত করে আর দেশে আমরা যথাযথ কর দেয়ার পর যখন রাষ্ট্র দায়িত্ব এড়িয়ে চলে তখন সত্যি সত্যি করদাতারা উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। কয়েকদিন আগে একটা গবেষণা সংস্থা, সিপিডির জরিপে দেখলাম, বাংলাদেশে আয়কর দেয়ার যোগ্য মানুষের সংখ্যা ৮০ লাখেরও বেশি এবং বেসরকারি কিছু গবেষণায় দেখলাম এই সংখ্যা এক কোটিরও বেশি। কিন্তু প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ লোক কর ফাঁকি দিয়ে বেঁচে যাচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে অর্থনীতির প্রায় ৪৫ থেকে ৬৫ শতাংশ টাকার কর দেয়া হয় না। করের বাইরে থেকে যায় কালো টাকা। যখন আমরা কর ঠিকমতো আদায় করতে পারি না তখন সেখানে অবৈধ অর্থনীতি রাজত্ব করে বিদেশ পাচার করে। কর ফাঁকি দিয়ে বিত্তশালীরা বিদেশে নাগরিকত্ব নিচ্ছে। এতে দেশে সাধারণ মানুষেরা হচ্ছে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

একটা জরিপে দেখা গেছে, ৬২ হাজার বাড়ি তৈরি করার উৎস জানায় না মালিকেরা। ধনী ভাড়াটিয়ারাও অনায়াসে গোপন করেন তাদের আয়ের উৎস। আর এর প্রভাবে কর পাওয়ার কথা যা তার অর্ধেক ডুবে যাচ্ছে এবং তা নির্ধারণ করতে অসুবিধা হয় তবে কম সংখ্যক লোক কর দেন।

দেখা গেছে, বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত এবং এক রকম সামর্থ্যবান লোকেরা নিয়মিত কর দেন। অথচ নিউইয়র্ক এবং উন্নত দেশগুলো তার সিঁকি পয়সার হিসাব দিতে হয়। ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জরিপে দেখে গেছে, বাংলাদেশে বিভিন্ন পেশায় কাজ করে প্রায় আড়াই লাখ বিদেশি।

আর এই বিদেশি নাগরিক যারা আছেন তারা বছরে ২৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা নিচ্ছেন দেশ থেকে এবং এর ফলে ১২ হাজার কোটি টাকার কর হারাচ্ছে রাষ্ট্র যা আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার কর দেয়ার পদ্ধতির থেকে ভিন্ন। নিউইয়র্কসহ এই ফাঁকি দেয়ার বিষয়টা সবচেয়ে লক্ষণীয় হওয়ার কারণ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে মাধ্যম আয়ের করদাতাদের ওপর করের প্রভাব বাড়ছে এবং লুকায়িত করের বোঝা বাড়ছে খেটে খাওয়া মানুষের মাথায়।

অতিদরিদ্র ব্যক্তি বা পরিবার যারা বর্তমানে উপার্জনহীন তাদের কাছ থেকে উচ্চ কর আদায় করা কতটুকু সমীচীন তা আসলেই ভাবনার বিষয়। এর লাগাম টেনে না ধরলে অতিরিক্ত কর বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়াবে। যারা কর ফাঁকি দিচ্ছেন তাদের মাশুল কি আমরা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ দেব?

উদাহরণ হিসাবে বলা যেতে পারে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের গ্রাহক নিরবচ্ছিন্ন ও দ্রুত গতির ইন্টারনেট সাশ্রয়ী মূল্যে পেয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। সে সময়ে আমাদের ডিজিটাল সরকার ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে টেলিযোগাযোগ সেবায় সম্পূরক শুল্ক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়।

আগেই এ খাতে গত পাঁচ বছরে পাঁচবার কর বাড়িয়ে সরাসরি আমাদের কাছ থেকে ২৮ দশমিক ৫০ শতাংশ আদায় করা হত। এবার আরও ৫ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে আমাদের কাছ থেকে ১০০ টাকায় ৩৩ দশমিক ৭৫ টাকার সাথে অপারেটরদের ওপর আরোপিত কর নেয়া হচ্ছে যা প্রায় ৩০ টাকা। এটা সমান্য উদাহরণ আরো বৃহত্তর প্রভাব পড়ছে।

তাই আমাদের রাজস্ব আদায় জোরদার এবং দেশের আর্থিক খাতকে আরও সুসংহত করতে হলে এসব প্রতিরোধে আমাদের আরো গুরুত্ব দেয়া। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য আমাদের সচেতন হয়ে আইনের প্রয়োগ আর জোরদার করতে হবে। কোনো বিত্তশালী যদি দীর্ঘদিন ধরে কর না দিয়ে রাষ্ট্রকে বঞ্চিত করে তবে তাদের আইনের আওতায় এনে প্রকৃত কর আদায় করে দেশে উন্নয়নকে আরো গতিশীল করতে হবে।

এমআরএম/পিআর

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]