শিক্ষায় রূপান্তরের পথে মালয়েশিয়া, মুখ থুবড়ে কেন বাংলাদেশ
শিক্ষা একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। অথচ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুটি বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ আজ শিক্ষা সংস্কারে দাঁড়িয়ে আছে দুই বিপরীত মেরুতে। একদিকে মালয়েশিয়া উচ্চাভিলাষী জাতীয় শিক্ষা ব্লুপ্রিন্ট নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগোতে চাইছে, অন্যদিকে বাংলাদেশে শিক্ষা খাত যেন প্রতিনিয়ত হোঁচট খাচ্ছে পরিকল্পনার অভাব, প্রশাসনিক অচলাবস্থা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায়।
ব্লুপ্রিন্ট বনাম অস্থিরতা: দুই দেশের ভিন্ন দর্শন
মালয়েশিয়ার শিক্ষা খাতে বড় সংস্কারের ঘোষণা নতুন কিছু নয়। অতীতেও দেশটি একাধিক ব্লুপ্রিন্ট ও রোডম্যাপের সাক্ষী হয়েছে। তবে জাতীয় শিক্ষা ব্লুপ্রিন্ট ২০২৬–২০৩৫ এ প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিম যে দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন, তা আগের যে কোনো পরিকল্পনার তুলনায় বেশি সুসংহত, বহুমাত্রিক এবং আদর্শগতভাবে স্পষ্ট।
এটি শুধু পাঠ্যসূচি বদলের নথি নয় বরং প্রশ্ন তোলে, ভবিষ্যৎ মালয়েশীয় নাগরিক কেমন হবে? তার মূল্যবোধ, পরিচয় ও দক্ষতার ভিত্তি কী?

অন্যদিকে বাংলাদেশে শিক্ষা খাত চলছে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত, সংকট সামাল দেওয়া আর পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার দোলাচলে-যেখানে দীর্ঘমেয়াদি কোনো দৃষ্টিভঙ্গি চোখে পড়ে না।
রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রশ্নে মালয়েশিয়ার কঠোর অবস্থান
ব্লুপ্রিন্টের সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত সবধরনের বিদ্যালয়ে বাহাসা মালায়ু ও ইতিহাস বাধ্যতামূলক করা। আন্তর্জাতিক ও বেসরকারি স্কুলকেও জাতীয় পাঠ্যক্রমের আওতায় আনার মাধ্যমে মালয়েশিয়া স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রশ্নে কোনো আপস নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি জাতীয় ঐক্য জোরদারের উদ্যোগ হলেও বহুসাংস্কৃতিক সমাজে বাস্তবায়ন পদ্ধতি হবে বড় চ্যালেঞ্জ। সংবেদনশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কৌশল ছাড়া এই সিদ্ধান্ত নতুন বিতর্কও তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশে ঠিক উল্টো চিত্র-জাতীয় পরিচয়, ইতিহাস ও নাগরিক মূল্যবোধ নিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় কোনো সুস্পষ্ট ও সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি নেই। পাঠ্যবই বদলেছে, আবার বদলায়নি; সিদ্ধান্ত হয়েছে, আবার প্রত্যাহার হয়েছে-ফলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়ই বিভ্রান্ত।
পরীক্ষামুখী শিক্ষা থেকে দক্ষতাভিত্তিক ব্যবস্থায় যাত্রা
২০২৬-২০২৭ সাল থেকে মালয়েশিয়ায় চালু হতে যাওয়া নতুন লার্নিং মেট্রিক্স পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়। লক্ষ্য-শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা ও বাস্তব দক্ষতা পরিমাপ।

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়-এটি কি সত্যিকারের পরিবর্তন, নাকি পুরোনো পরীক্ষার নতুন মোড়ক? বাংলাদেশে meanwhile পরীক্ষা বাতিল, বিকল্প মূল্যায়ন, আবার পরীক্ষা ফিরিয়ে আনা-সব মিলিয়ে মূল্যায়ন ব্যবস্থা নিজেই এক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। শিক্ষার গুণগত মান নয়, বরং সিদ্ধান্তের অসংগতিই এখানে প্রধান সমস্যা।
শিক্ষক: সংস্কারের মূল চালিকা শক্তি, না দুর্বল কড়ি?
মালয়েশিয়া শিক্ষকদের কক্ষ উন্নয়নে ১০০ মিলিয়ন রিঙ্গিত বরাদ্দ দিয়েছে। তবে শিক্ষাবিদরা বলছেন, অবকাঠামো যথেষ্ট নয়-প্রশিক্ষণ, মানসিক চাপ কমানো এবং পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত না হলে সংস্কার কাগজেই থেকে যাবে।
বাংলাদেশে শিক্ষকরা আরও বড় সংকটে। শিক্ষকদের হেনস্তা, শিক্ষাঙ্গণে ‘মব সংস্কৃতি’, প্রশাসনিক অস্থিরতা-সব মিলিয়ে শিক্ষক সমাজ আজ সবচেয়ে অনিরাপদ।
টিভেট ও কর্মমুখী শিক্ষা: সম্ভাবনা না শ্রেণিভেদ?
মালয়েশিয়া ২০২৭ সাল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে টিভেট অন্তর্ভুক্ত করে শ্রমবাজারের সঙ্গে শিক্ষাকে যুক্ত করতে চায়। তবে সমালোচকদের আশঙ্কা-এটি যেন দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা, কম সম্মানজনক ট্র্যাক না হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষা এখনো মূলধারার বাইরে। সামাজিক মর্যাদা ও কর্মসংস্থানের বাস্তব সংযোগ না থাকায় এই খাত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পিছিয়ে।
উচ্চশিক্ষা: সুযোগ সম্প্রসারণ বনাম সক্ষমতার প্রশ্ন
মালয়েশিয়ায় মেধাবী, দরিদ্র ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশাধিকার বাড়ানোর ঘোষণা সামাজিক ন্যায়ের দৃষ্টান্ত। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান, সক্ষমতা ও অর্থায়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকারের চেয়ে বড় প্রশ্ন-মান নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা পরিবেশ ও নেতৃত্ব সংকট।
বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে ব্যর্থতার পাল্লা ভারী
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শিক্ষা খাতে ব্যর্থতার চিত্র আরও স্পষ্ট। সময়মতো বিনা মূল্যের পাঠ্যবই বিতরণ না হওয়া, মাধ্যমিক স্তরের লাখো বইয়ের ঘাটতি, এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল ও বিতর্কিত ফল প্রকাশ সব মিলিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা চরমে।

নতুন শিক্ষাক্রমের কোনো সুস্পষ্ট রোডম্যাপ নেই। পুরোনো শিক্ষাক্রমে ফিরে গেলেও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অস্পষ্ট। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন নেতৃত্বহীন, ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন কার্যত স্থবির।
শিক্ষাবিদদের মতে, সীমিত সময়ের মধ্যেও একটি দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা দর্শন ও রূপরেখা তৈরি করা সম্ভব ছিল-কিন্তু সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবই আজ বড় প্রশ্ন।
বাস্তবায়নই আসল পরীক্ষা
মালয়েশিয়ার জাতীয় শিক্ষা ব্লুপ্রিন্ট ২০২৬–২০৩৫ একটি শক্তিশালী ঘোষণাপত্র-যেখানে পরিচয়, মানবিকতা ও দক্ষতার ভারসাম্য খোঁজার চেষ্টা আছে। কিন্তু ইতিহাস বলে, শিক্ষা সংস্কার কখনোই কাগজে সফল হয় না।
আর বাংলাদেশে শিক্ষা খাতের সংকট দেখিয়ে দেয়-পরিকল্পনা ছাড়া শিক্ষা শুধু ব্যয়, বিনিয়োগ নয়। প্রশ্ন একটাই-মালয়েশিয়া কি এবার পরিকল্পনাকে শ্রেণিকক্ষ পর্যন্ত নিতে পারবে? আর বাংলাদেশ কি শিক্ষা নিয়ে অবশেষে দীর্ঘমেয়াদি সাহসী সিদ্ধান্ত নেবে? উত্তর দেবে সময়। কিন্তু সময়ের অপচয় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে শিক্ষার্থীদেরই।
এমআরএম