মালয়েশিয়ায় প্রবাসীদের ভোট উৎসবে বিষাদের সুর
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ২৫ জানুয়ারির মধ্যে প্রবাসী ভোটারদের পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
মালয়েশিয়ায় বসবাসরত ৮৪ হাজারেরও বেশি ভোটার নিবন্ধন করলেও অধিকাংশ প্রবাসী বাংলাদেশি এখনো ব্যালট পেপার হাতে না পাওয়ায় ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কেউ রেজিস্ট্রেশন করতে পারেননি, কেউ রেজিস্ট্রেশন করেও ব্যালট পাননি, আবার কেউ ব্যালট এলেও আইনি জটিলতা ও ভয়ের কারণে তা গ্রহণ করতে সাহস পাননি-এমন নানা প্রতিবন্ধকতার কথা উঠে এসেছে প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলে।
পোস্টাল ভোটের সুযোগ ঘোষণার পর শুরুতে প্রবাসীদের মধ্যে উৎসাহ তৈরি হয়। দীর্ঘদিন পর দেশের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়ে অনেকে আবেদন করেন। তবে সেই উৎসাহ দ্রুতই হতাশায় রূপ নেয়। প্রযুক্তিগত ত্রুটি, অ্যাপের অকার্যকারিতা, ঠিকানায় ব্যালট না পৌঁছানো এবং পোস্ট অফিসের জটিলতায় প্রবাসীদের বড় একটি অংশ কার্যত ভোটের বাইরে থেকে যায়। এসব কারণে অনেকের ব্যালটও দেশে ফিরে এসেছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, মালয়েশিয়া থেকে প্রায় ৪ হাজারেরও বেশি ব্যালট ফেরত এসেছে।
মালয়েশিয়ার বিভিন্ন রাজ্যে বসবাসরত প্রবাসীরা জানান, পোস্টাল ভোটের পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল অপরিকল্পিত ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার উদাহরণ। অনেক ক্ষেত্রে ভোটার যে ঠিকানা দিয়েছেন, সেখানে ব্যালট পৌঁছায়নি। আবার পোস্ট অফিসে ব্যালট পৌঁছালেও ভোটারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যালট সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে ভোট কারচুপির অভিযোগ।
মালয়েশিয়া মালাক্কা প্রদেশ বিএনপির সভাপতি মতিউর রহমান অভিযোগ করেন, পোস্টাল ভোট ব্যবস্থায় চরম আনাড়িপনা দেখা গেছে। তার দাবি, এই সুযোগে একটি মহল সহজ-সরল প্রবাসীদের ঠিকানা সংগ্রহ করে নিজেরাই ব্যালটে ভোট দিয়ে দিচ্ছেন।
তিনি বলেন, আমাদের বেশিরভাগ প্রবাসীই অল্প শিক্ষিত। প্রযুক্তি ও অ্যাপের ব্যবহারে তারা দক্ষ নয়। এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে কিছু ব্যক্তি প্রতারণা করছে। এটি প্রবাসীদের ভোট ডাকাতির চেষ্টা।
মতিউর রহমান আরও বলেন, অনেকেই অ্যাপ ডাউনলোড করলেও রেজিস্ট্রেশন করতে পারেননি। কেউ রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করলেও ব্যালট পেপার আসেনি। এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করা হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে অভিযোগ তার।
মালয়েশিয়া বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজি সালাহ উদ্দিন বলেন, বৈধ কাগজপত্র ও বৈধ ঠিকানা থাকা সত্ত্বেও বহু প্রবাসী ব্যালট পাননি। আবার যাদের বৈধ কাগজপত্র নেই, তারা ভয়ে পোস্ট অফিসে গিয়ে ব্যালট গ্রহণ করছেন না। অনেক ক্ষেত্রে পোস্ট অফিসও সরাসরি ডেলিভারি দিচ্ছে না। ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রবাসী ভোট দিতে পারছেন না।
প্রবাসীদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও এই সংকটের বাস্তবতা তুলে ধরে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার চুনকা গ্রামের হৃদয় মিয়া জানান, তিনি ৬-৭ বার চেষ্টা করেও অ্যাপে রেজিস্ট্রেশন করতে পারেননি। অ্যাপ কোনোভাবেই রেজিস্ট্রেশন নিচ্ছিল না বলেন তিনি।
মোস্তফা কামাল বলেন, তিনি ও তার সহকর্মীরা বৈধভাবে বৈধ ঠিকানায় বসবাস করছেন। রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করার পরও ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত তাদের ঠিকানায় কোনো ব্যালট পৌঁছেনি। বরং একটি বার্তায় জানানো হয়েছে ‘অ্যাড্রেস নট এভেইলেবল অ্যাট টাইম অব ডেলিভারি’। এতে তারা চরম হতাশ হয়েছেন।
এনসিপির মালয়েশিয়া সমন্বয়ক ইঞ্জিনিয়ার এনাম আহমদ বলেন, তিনি ও তার স্ত্রী দুজনই বৈধভাবে বৈধ ঠিকানায় থাকলেও ব্যালট পাননি। আবেদনে ফোন নম্বর দেওয়া ছিল, কিন্তু পোস্ট অফিস থেকে কেউ যোগাযোগ করেনি। পরে নিজ উদ্যোগে সেন্ট্রাল পোস্ট অফিসে গিয়ে ব্যালট সংগ্রহ করেছি, বলেন তিনি।
তার দাবি, এভাবে বহু পোস্টাল ব্যালট ফেরত গেছে। কেউ কেউ আবার নিজেরা পোস্ট অফিসে যোগাযোগ করে একাধিক ব্যালট একসঙ্গে সংগ্রহ করেছেন, যা স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
ইঞ্জিনিয়ার এনাম আহমদের মতে, যদি হাইকমিশনের মাধ্যমে ব্যালট সংগ্রহ ও বিতরণের ব্যবস্থা করা হতো, তাহলে একদিকে যেমন ব্যালট নষ্ট হতো না, অন্যদিকে সরকারের খরচও কমত এবং প্রক্রিয়াটি আরও বিশ্বাসযোগ্য হতো।
সব মিলিয়ে মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের পোস্টাল ভোট অভিজ্ঞতা একটি হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরেছে। ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে না পারা প্রবাসীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অনাস্থা বাড়াচ্ছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ভবিষ্যতে প্রবাসী ভোট কার্যকর করতে হলে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন, পোস্টাল ব্যবস্থার সমন্বয়, কূটনৈতিক মিশনের সক্রিয় ভূমিকা এবং ভোটার সুরক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। নইলে প্রবাসীদের ভোটাধিকার কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
এমআরএম