বইবোঝাই গাধা ও নৈতিকতার সংকট
কুরআনের সূরা আল জুমুআয় ‘বইবোঝাই গাধা’র যে রূপকটি এসেছে, তা অজ্ঞতার বিরুদ্ধে নয়, বরং শিক্ষিত মানুষের নৈতিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে এক গভীর সতর্কবার্তা। যারা জ্ঞানের ভার বহন করে, কিন্তু সেই জ্ঞানের নৈতিক দায়, মানবিকতা ও সত্যবোধ নিজেদের জীবনে ধারণ করে না, তাদের কথাই এখানে বলা হয়েছে। আজকের বাংলাদেশে এই রূপকটি কেবল ধর্মীয় উপমা নয়, এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও সমাজ বাস্তবতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।
সব ধর্মেই এই একই বার্তা উচ্চারিত হয়েছে। খ্রিস্টধর্মে যিশু ফরিসীদের বলেছেন সাদা কাপড়ে মোড়া কবর, বাইরে জ্ঞান ও ধার্মিকতার প্রদর্শন, ভেতরে ন্যায়বিচার ও মানবিকতার শূন্যতা। হিন্দুধর্মের গীতায় বলা হয়েছে, কেবল তথ্যভিত্তিক জ্ঞান নয়, প্রকৃত প্রজ্ঞা আসে ধীর সাধনা ও নিঃস্বার্থ কর্ম থেকে। বৌদ্ধধর্ম মুখস্থ বিদ্যাকে বিপজ্জনক বলে মনে করে, যদি তা করুণা ও সহানুভূতি না বাড়ায়। সব ধর্মের বক্তব্য এক জায়গায় এসে মিলে যায়। নৈতিকতা ছাড়া জ্ঞান মানুষকে আলোকিত করে না, বরং তাকে আরও আত্মকেন্দ্রিক ও নিষ্ঠুর করে তোলে।
এই বাস্তবতা আজ বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজে ভয়াবহভাবে দৃশ্যমান। স্বাধীনতার পর আমরা ডিগ্রি, সার্টিফিকেট ও টাইটেলের এক বিশাল শ্রেণি তৈরি করেছি। কিন্তু সেই শিক্ষার সঙ্গে মানবিকতা, বিবেক ও নৈতিক সাহস সমানভাবে বেড়েছে কি না, সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান রূপটি দেখতে হবে। এক সময় পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক শিক্ষা ছিল ধীরগতির। শিক্ষার্থীরা বই পড়ে, শিক্ষককে শুনে, বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে বিষয় বুঝত। এই ধীর গতির মধ্যেই গড়ে উঠত মনোযোগ, ধৈর্য, শ্রদ্ধাবোধ এবং মানবিক সম্পর্ক। শিক্ষক ছিলেন শুধু তথ্যদাতা নন, নৈতিক আদর্শের বাহকও।
প্রযুক্তির কল্যাণে সেই ধীরগতির শিক্ষা এখন দ্রুতগতির হয়ে উঠেছে। তথ্য পাওয়া সহজ হয়েছে, শেখার গতি বেড়েছে, কিন্তু গভীরতা কমেছে। শিক্ষার্থীরা এখন দ্রুত স্ক্রল করে, দ্রুত দেখে, দ্রুত ভুলে যায়। পাঠ্যপুস্তকের যে স্লোমোশন শেখা ছিল, তা আজ অনেক ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক বা বিরক্তিকর বলে মনে হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে যে মানবিক সংযোগ ছিল, তা প্রযুক্তিনির্ভরতায় ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে।
এখানেই বড় বিপদটি লুকিয়ে আছে। শিক্ষা যদি শুধু দ্রুত তথ্য গ্রহণে সীমাবদ্ধ হয়, আর মানবিক ও নৈতিক শিক্ষা পিছিয়ে পড়ে, তাহলে আমরা বই বোঝাই গাধার নতুন প্রজন্ম তৈরি করি। হাতে মোবাইল, মাথায় তথ্য, কিন্তু হৃদয়ে বিবেক নেই।
এই মানবিক শূন্যতার ফল আজ স্পষ্ট। দুর্নীতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। শিক্ষিত মানুষই দুর্নীতির কৌশল জানে, ফাঁকফোকর বোঝে, নিয়ম ভাঙার ভাষা তৈরি করে। যখন মানবিক শিক্ষা দুর্বল হয়, তখন প্রযুক্তি ও জ্ঞান অন্যায়ের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ঠিক এখানেই ধর্মীয় সতর্কবাণী বাস্তবে রূপ নেয়।
এর অর্থ এই নয় যে মোবাইল ফোন বা ডিজিটাল প্রযুক্তি নিষিদ্ধ করতে হবে। হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা কোনো সমাধান নয়। সমস্যার মূল প্রযুক্তি নয়, সমস্যার মূল হলো প্রযুক্তিকে মানবিক ও নৈতিক কাঠামোর বাইরে ব্যবহার করা।
বাস্তবতা হলো, মোবাইল ফোন পাঠ্যপুস্তকের বিকল্প হতে পারে না, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় নয়। পাঠ্যপুস্তক জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী সাজানো একটি চিন্তাশীল জ্ঞানভিত্তিক দলিল। গবেষণায় দেখা গেছে, মুদ্রিত পাঠ্যপুস্তক শিশুদের গভীর পাঠ, মনোযোগ ও দীর্ঘমেয়াদি শেখায় বেশি কার্যকর। স্ক্রিনভিত্তিক পাঠ দ্রুত হলেও তা ভাসা ভাসা থেকে যায়।
একই সঙ্গে এটাও সত্য, পাঠ্যপুস্তকের সঙ্গে মানসম্মত ডিজিটাল কনটেন্ট যুক্ত হলে শেখার ফল ভালো হয়। ভিডিও, অ্যানিমেশন, কুইজ ও ইন্টারঅ্যাকটিভ অনুশীলন জটিল বিষয় বুঝতে সাহায্য করে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযুক্তি বড় সহায়ক। কিন্তু সিদ্ধান্ত পরিষ্কার হওয়া দরকার। পাঠ্যপুস্তক থাকবে শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু, প্রযুক্তি থাকবে সহায়ক মাধ্যম।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষা নীতিতে মানবিক ও নৈতিক শিক্ষাকে আবার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা। প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, শিক্ষককে কেবল স্ক্রিনের অপারেটরে পরিণত করলে চলবে না। শিক্ষার্থীকে শুধু দ্রুত শেখার প্রতিযোগিতায় ঠেলে দিলে চলবে না। শিক্ষা মানে মানুষ হওয়া শেখা, শুধু দক্ষতা অর্জন নয়।
‘বইবোঝাই গাধা’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বই কাগজে হোক বা স্ক্রিনে, আসল প্রশ্ন একটাই। সেই জ্ঞান কি আমাদের আরও সৎ, দয়ালু ও দায়িত্বশীল মানুষ বানাচ্ছে, নাকি কেবল আরও চতুর দুর্নীতিবাজ তৈরি করছে।
ধর্ম ও নৈতিকতার দৃষ্টিতে একটি সৎ হৃদয়, একটি মানবিক মন, হাজারো ডিভাইস ও অসংখ্য বইয়ের চেয়েও বেশি মূল্যবান। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা কোন শিক্ষাকে বেছে নিচ্ছি তার ওপর।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
[email protected]
এমআরএম