লন্ডনের বুকে এক টুকরো বাংলাদেশ, আলতাব আলী পার্কে শহীদ মিনার
লন্ডনের ব্যস্ত নগর জীবনের নিরন্তর কোলাহল, মানুষের অবিরাম ছুটে চলা আর বহু সংস্কৃতির উজ্জ্বল সহাবস্থানের মাঝখানে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে এক গভীর আবেগের প্রতীক—শহীদ মিনার আলতাব আলী পার্কের এই স্মৃতিস্তম্ভ কেবল স্থাপত্যের সৌন্দর্য নয়; এটি ভাষা, পরিচয় ও আত্মত্যাগের এক চিরন্তন দলিল।
শীতল সকালের ধূসর কুয়াশা হোক কিংবা সন্ধ্যার ম্লান আলো—শহীদ মিনারের শুভ্র স্তম্ভ গুলো যেন নীরব অথচ দৃপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করে একুশের অমর আহ্বান। প্রবাসের মাটিতে দাঁড়িয়ে এই মিনার মনে করিয়ে দেয় সেই রক্তস্নাত ইতিহাস, যখন মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করেছিলেন অমর শহীদরা। ভৌগোলিক দূরত্ব যতই দীর্ঘ হোক, অনুভূতির দূরত্ব সেখানে শূন্য—কারণ ভাষা মানেই আত্মা, ভাষা মানেই অস্তিত্বের শিকড়।

এই পার্কের নামেই জড়িয়ে আছে আরেকটি মর্মস্পর্শী ইতিহাস। আলতাব আলী নামের—এক তরুণ, যার নির্মম হত্যাকাণ্ড ব্রিটেনে বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করেছিল। তার নামাঙ্কিত এই পার্ক আজ প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে স্মৃতি, প্রতিবাদ ও সম্মিলিত গৌরবের প্রতীক। ইতিহাস যেন এখানে প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়ে দেয়—অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চারণই মানবিক সাহসের সর্বোচ্চ প্রকাশ।
প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি এলে এই প্রাঙ্গণ রূপ নেয় আবেগের এক অনন্য সমাবেশে। Tower Hamlets-এর শীতল ভোরে, কনকনে বাতাস উপেক্ষা করে মানুষ আসে ফুল হাতে। কেউ নীরবে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন, কেউ চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু লুকিয়ে রাখেন। সেই মুহূর্তে প্রজন্মের সীমানা মুছে যায়—এক অদৃশ্য বন্ধনে জড়িয়ে পড়ে সবাই, ভাষার বন্ধনে, শেকড়ের বন্ধনে।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের তরুণদের কাছে এই শহীদ মিনার নিছক ইতিহাসের পাঠশালা নয়; এটি তাদের পরিচয়ের আয়না। এখানে দাঁড়িয়ে তারা উপলব্ধি করে—মাতৃভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা ও উত্তরাধিকারের দীপ্ত প্রতীক। তাদের শিকড় Bangladesh-এর মাটিতে প্রোথিত, আর সেই শিকড়ের শক্তি ভাষার ভালোবাসায় দৃঢ়।
লন্ডনের হৃদয়ে স্থির এই শহীদ মিনার তাই এক অনন্য প্রতীক—দূরত্ব অতিক্রম করা আবেগের, স্মৃতিকে জীবন্ত রাখার দায়বদ্ধতার। এটি প্রমাণ করে, ভাষার চেতনা কখনও সীমান্তে আবদ্ধ থাকে না। যেখানে বাঙালির হৃদস্পন্দন, সেখানেই একুশের চিরজাগ্রত স্পন্দন।
শহীদ মিনারের সাদা স্তম্ভগুলো আজও নীরবে বলে যায়—ভাষা বেঁচে থাকুক, স্মৃতি বেঁচে থাকুক, আত্মত্যাগ অমর হোক।
এমআরএম