শিক্ষা, জ্ঞান না পণ্য?

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ০২:০৮ পিএম, ১৭ মে ২০২৬
এআই দিয়ে বানানো ছবি

একটা সময় শিক্ষা ছিল আলোর পথ। শিক্ষক ছিলেন পথপ্রদর্শক, আর জ্ঞান ছিল মুক্তির সোপান। কিন্তু আজ সেই পবিত্র সম্পর্কের ভেতর ঢুকে পড়েছে হিসাব-নিকাশের ঠান্ডা ভাষা। শিক্ষা ক্রমশ জ্ঞানার্জনের প্রক্রিয়া থেকে সরে গিয়ে একটি লেনদেনে পরিণত হচ্ছে, যেখানে মানবিকতা, কৌতূহল ও মূল্যবোধের জায়গা দখল করছে লাভ-ক্ষতির হিসাব।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘দেনা-পাওনা’ গল্পে পরিবারের ভেতরে লেনদেনের যে সূক্ষ্ম মানসিকতা তুলে ধরেছিলেন, তার বিস্তার আজ স্পষ্ট শিক্ষাক্ষেত্রে। কারণ শিক্ষা কেবল পেশাগত প্রস্তুতি নয়; এটি একটি জাতির নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি। সেই ভিত্তিই যখন ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর দাঁড়ায়, তখন পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।

আজকের বাস্তবতায় অনেক শিক্ষার্থীর কাছে শিক্ষা আর জ্ঞান নয়; এটি এক ধরনের বিনিয়োগ। ভর্তি হওয়ার সময়ই তাদের মনে থাকে একটি হিসাব: কত ব্যয়ে কত দ্রুত একটি ডিগ্রি পাওয়া যাবে এবং সেই ডিগ্রি দিয়ে কতটা নিশ্চিত করা যাবে একটি কাঙ্ক্ষিত পেশাগত অবস্থান।

অন্যদিকে, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে শিক্ষার্থী আর ব্যক্তি নয়; তিনি একটি ‘ফি’, একটি ‘সিট’, একটি পরিসংখ্যান। এই দ্বিমুখী লেনদেনের ভেতরে হারিয়ে যায় শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্য, মানুষ গড়া।

এই মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ কোচিং-নির্ভরতা, প্রশ্নফাঁস, এবং সনদ বাণিজ্য। এগুলো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; বরং এক গভীর প্রাতিষ্ঠানিক অসুস্থতার লক্ষণ। ফলে শিক্ষার অনেক ক্ষেত্রই আজ সনদ বিক্রির বাজারে পরিণত হয়েছে, যেখানে একটি জাতির ভবিষ্যৎ ধীরে ধীরে বন্ধক পড়ে যাচ্ছে।

এই প্রবণতা বিশেষভাবে দৃশ্যমান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কোচিং সেন্টার এবং বাধ্যতামূলক প্রাইভেট টিউটরিং ব্যবস্থায়, যেখানে শিক্ষা ক্রমশ একটি পণ্যে পরিণত হয়ে নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে সরবরাহ করা হয়। এখানে লক্ষ্য জ্ঞান নয়, ফলাফল; প্রক্রিয়া নয়, শর্টকাট; সত্য নয়, সাফল্যের বাহ্যিক প্রতিচ্ছবি।

শিক্ষকের ভূমিকাও আজ প্রশ্নের মুখে। তিনি কি আদর্শ নির্মাতা, না সেবাদানকারী? যখন শিক্ষাদান পণ্যে পরিণত হয়, তখন শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কও ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্কে রূপ নেয়। শিক্ষক আর অনুপ্রেরণার উৎস নন; তিনি হয়ে ওঠেন একটি ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’।

বহু দেশে শিক্ষাদানের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, শিক্ষার প্রকৃত শক্তি নিহিত একটি প্রশ্নে, একটি জিজ্ঞাসায়, একটি অনুপ্রেরণায়, যা একটি জীবন বদলে দিতে পারে। কিন্তু একইসঙ্গে দেখা যায়, সেই শক্তি কীভাবে ক্ষীণ হয়ে পড়ে, যখন শিক্ষা কেবল প্রতিযোগিতার অস্ত্রে পরিণত হয়।

এই ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরাও পড়ে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে। তারা জানে, সিস্টেম চায় ফলাফল। তাই তারা শেখে, কীভাবে উত্তর মুখস্থ করতে হয়, কীভাবে পরীক্ষায় নম্বর অর্জন করতে হয়, কীভাবে কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন পেতে হয়। কিন্তু তারা শেখে না, কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে সত্য অনুসন্ধান করতে হয়, কীভাবে একজন সৎ ও দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে উঠতে হয়।

এখানেই ‘দেনা-পাওনা’র রূপকটি নতুনভাবে ফিরে আসে। শিক্ষা আর জ্ঞান নয়; এটি এক প্রাতিষ্ঠানিক চুক্তি:

টাকা দাও → ডিগ্রি নাও → চাকরি পাও।

এই চুক্তির ভেতরে নৈতিকতা, কৌতূহল ও সৃজনশীলতা ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। শিক্ষা যখন পণ্যে পরিণত হয়, তখন একটি জাতি দক্ষ হতে পারে, কিন্তু সৎ হতে পারে না। তারা প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে পারে, কিন্তু ন্যায়বোধ হারায়। প্রতিযোগিতায় জিততে পারে, কিন্তু মানুষ হিসেবে পরাজিত হয়।

একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শ্রেণিকক্ষে। যদি সেই শ্রেণিকক্ষ লেনদেনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তবে সেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎও হয়ে উঠবে অস্থির, বৈষম্যমূলক এবং নৈতিকভাবে শূন্য।

‌‘যে শিক্ষা মানুষের মূল্যবোধ গড়ে তোলে না, তা কেবল দক্ষ শ্রমিক তৈরি করে, মানুষ নয়।’

কিন্তু বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা আরও জটিল। আজকের প্রজন্ম এমন এক সময়ে বড় হচ্ছে, যেখানে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বৈশ্বিক সংস্কৃতি একসঙ্গে তাদের মনন, মনোযোগ, সম্পর্ক এবং শেখার ধরনকে বদলে দিচ্ছে। ফলে শিক্ষা নিয়ে অতীতের নৈতিক স্মৃতিচারণ যথেষ্ট নয়; বরং সেই অভিজ্ঞতাকে ভবিষ্যতের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

আজকের পৃথিবীতে তথ্য আর বিরল নয়। একটি মোবাইল ফোনেই পাওয়া যায় হাজারো তথ্য, অসংখ্য উত্তর, অসীম ডেটা। কিন্তু তথ্যের সহজলভ্যতা জ্ঞান সৃষ্টি করে না। বরং এই সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে তথ্য যাচাই, মনোযোগ ধরে রাখা, এবং সত্য ও বিভ্রান্তির মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা। তাই আগামী পৃথিবীতে শুধু মুখস্থবিদ্যা দিয়ে টিকে থাকা সম্ভব নয়। প্রয়োজন বিশ্লেষণ ক্ষমতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা, মানসিক স্থিতি, নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা এবং মানবিক বোধ।

বিশ্বের প্রথমসারির দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা এখন কেবল পরীক্ষাভিত্তিক সাফল্যের ওপর নির্ভর করছে না। তারা শিক্ষাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। কারণ তারা বুঝেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানুষকে যন্ত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হবে না; বরং মানুষকে এমন গুণাবলি অর্জন করতে হবে, যা যন্ত্র কখনো পূর্ণভাবে ধারণ করতে পারবে না, যেমন সহানুভূতি, নৈতিকতা, কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা এবং মানবিক নেতৃত্ব।

ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থা এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সেখানে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত পরীক্ষার চাপ কমিয়ে শেখার আনন্দ, সহযোগিতামূলক শিক্ষা, সমস্যা সমাধান এবং বাস্তব জীবনের দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

শিক্ষককে শুধু পাঠদানকারী নয়, বরং জাতি নির্মাণের অন্যতম প্রধান দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়। ফলে শিক্ষকতা সেখানে একটি উচ্চ মর্যাদার পেশা। শিক্ষক হওয়ার জন্য প্রয়োজন কঠোর প্রশিক্ষণ, গবেষণামূলক দক্ষতা এবং গভীর সামাজিক দায়বদ্ধতা।

সিঙ্গাপুর দেখিয়েছে, কীভাবে একটি ছোট রাষ্ট্রও শিক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নেতৃত্ব দিতে পারে। কিন্তু তারা শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতার ওপর নির্ভর করেনি। তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় চরিত্র গঠন, শৃঙ্খলা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং জাতীয় চেতনার ওপর সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কারণ তারা উপলব্ধি করেছে, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ যদি নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে তা সমাজে বৈষম্য, মানসিক বিচ্ছিন্নতা এবং অমানবিক প্রতিযোগিতা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

জাপানের শিক্ষাব্যবস্থা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। সেখানে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় দায়িত্ববোধ, পরিচ্ছন্নতা, সময়ানুবর্তিতা, পারস্পরিক সম্মান এবং সামাজিক আচরণ। অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করে। এটি কেবল পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা নয়; বরং এটি সম্মিলিত দায়িত্ববোধ, শ্রমের মর্যাদা এবং সামাজিক শৃঙ্খলার একটি গভীর অনুশীলন। ফলে শিক্ষা সেখানে কেবল পেশাগত প্রস্তুতি নয়; নাগরিক চরিত্র গঠনেরও একটি প্রক্রিয়া।

এস্তোনিয়া ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রে বিশ্বে নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। তারা প্রযুক্তিকে শুধু যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেনি; বরং ডিজিটাল নাগরিকত্ব, তথ্য যাচাই, অনলাইন নিরাপত্তা এবং সমালোচনামূলক চিন্তাকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ করেছে। কারণ আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় বিপদ শুধু তথ্যের অভাব নয়; বরং ভুল তথ্য, বিভ্রান্তি এবং অ্যালগরিদমনির্ভর মানসিক নিয়ন্ত্রণ।

বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি এখনো কেবল মুখস্থবিদ্যা, নম্বর, সনদ এবং চাকরিমুখী প্রতিযোগিতার ভেতর সীমাবদ্ধ থাকবে? না কি আমরা এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলব, যেখানে প্রযুক্তি ও মানবিকতা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক হবে?

কারণ আগামী পৃথিবীতে সবচেয়ে মূল্যবান হবে সেই মানুষ, যে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে, কিন্তু প্রযুক্তির দাস হবে না। যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নেবে, কিন্তু নিজের বিবেক, বিচারবোধ এবং মানবিক অবস্থান হারাবে না। যে বৈশ্বিক নাগরিক হবে, কিন্তু নিজের সংস্কৃতি, ভাষা এবং সামাজিক শিকড় ভুলে যাবে না।

বাংলাদেশে এখন প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, বাস্তবভিত্তিক এবং ভবিষ্যতমুখী জাতীয় শিক্ষানীতি, যেখানে শিক্ষাকে কেবল অর্থনৈতিক উৎপাদনের মাধ্যম হিসেবে দেখা হবে না। শিক্ষাকে দেখতে হবে একটি সভ্যতা নির্মাণের প্রক্রিয়া হিসেবে।

সেই শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তি থাকবে, কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর অন্ধ নির্ভরতা থাকবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থাকবে, কিন্তু মানবিক বিচারবোধের বিকল্প হিসেবে নয়। প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু মানবিক ধ্বংসের বিনিময়ে নয়। সাফল্য থাকবে, কিন্তু সততা বিসর্জন দিয়ে নয়।

শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করলে তারা হয়তো চাকরি পাবে, কিন্তু জীবনকে বুঝতে শিখবে না। তারা হয়তো দক্ষ কর্মী হবে, কিন্তু দায়িত্বশীল নাগরিক হবে না। তাই এখন প্রয়োজন এমন শিক্ষা, যা মানুষকে শেখাবে কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়, কীভাবে মতভেদ থাকা সত্ত্বেও সহনশীল থাকতে হয়, কীভাবে প্রযুক্তির ভেতর থেকেও মানবিকতা রক্ষা করতে হয় এবং কীভাবে একজন সৎ ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে সমাজে অবদান রাখতে হয়।

কারণ একটি জাতির প্রকৃত শক্তি শুধু তার অর্থনীতি, অবকাঠামো বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে নয়; তার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় সেই শ্রেণিকক্ষে, যেখানে আগামী প্রজন্ম গড়ে ওঠে।

যদি সেই শ্রেণিকক্ষ সনদ বিক্রির বাজারে পরিণত হয়, তবে রাষ্ট্র দক্ষ শ্রমিক পাবে, কিন্তু হারাবে বিবেকবান মানুষ। আর যদি সেই শ্রেণিকক্ষ জ্ঞান, প্রযুক্তি, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এবং মানবিকতার মিলনস্থলে পরিণত হয়, তবে সেই শিক্ষাই একটি জাতিকে শুধু উন্নত নয়, সত্যিকার অর্থে সভ্য করে তুলতে পারে।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।
[email protected]

এমআরএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]