ইসলামী চেতনা পুনর্জাগরণে অগ্রদূত কাজী নজরুল

রাকিব হাসান রাফি
রাকিব হাসান রাফি রাকিব হাসান রাফি , স্লোভেনিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৬:০৯ পিএম, ১২ মে ২০২১

বিগত বছরগুলোর মতো এবারও আমাদের সকলের দুয়ারে কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর। আর প্রত্যেক বছর ঈদ-উল-ফিতর আসতে না আসতে বাংলার শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে আবালবৃদ্ধবনিতা পর্যন্ত সকলের অন্তরে বেজে উঠে সেই বিখ্যাত গান:-

‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমামি তাগিদ।’

ঘুরে ফিরে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই সৃষ্টিশীল রচনাগুলো যেনও বছরের এ সময়ে বারবার আমাদের মাঝে ফিরে আসে। আর এটিই হচ্ছে কবি কাজী নজরুল ইসলামের অনন্যতা, বাংলা সাহিত্যে জগতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যদি হন মধ্য গগণের সূর্য, তবে কবি কাজী নজরুল ইসলাম হচ্ছেন সে গগণের উজ্জ্বলতম ধূমকেতু।

আজকের থেকে ঠিক একশো বছর আগেরকার কথা, পুরো ভারতবর্ষ তখন ঔপনিবেশিক শাসনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত। তুলনামূলকভাবে ভারতের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষের তুলনায় বাঙালি ও বিহারি মুসলমানেরা ছিলেন সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেক পিছিয়ে।

উডের ডেসপ্যাচ প্রস্তাব অনুযায়ী উনিশ শতকের মধ্যভাগে সমগ্র ভারতবর্ষে প্রতীচ্যের দেশগুলোর অনুকরণে নতুন এক শিক্ষা-ব্যবস্থা প্রণয়ন করা হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন নতুন এ শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি প্রথমদিকে উপমহাদেশের মুসলমানদের অনাগ্রহই মূলত তাদেরকে পশ্চাৎপদ করে তোলে।

তবে বাঙালি ও বিহারি মুসলমানদের ইতিহাস ছিল কিছুটা ভিন্ন। এর একটি বড় কারণ হতে পারে ১৭৯৩ সালে কর্নওয়ালিস প্রশাসন কর্তৃক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সরকারের জারি করা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা। প্রথমত বাংলার মানুষের মূল পেশা ছিল কৃষিকাজ।

বলা হয়ে থাকে, ভারতবর্ষের অন্যান্য স্থানের তুলনায় বাংলার ভূমি ছিল অধিক উর্বর এবং কৃষিকাজের জন্য উপযোগী। ১৭৫৭ সালের ২৩ শে জুন পলাশী যুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভের নিকট নবাব সিরাজউদ্দৌলার সেনাবাহিনীর পরাজয় এ উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনের ভিত প্রতিষ্ঠিত করে।

ধীরে ধীরে ব্রিটিশদে হাত ধরে ইউরোপীয় কায়দায় এ অঞ্চল শিল্পের বিকাশ শুরু হয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথার ফলে বাংলায় যে ভূস্বামী শ্রেণী গড়ে উঠে তাদের বেশিরভাগই ছিলেন হিন্দু ধর্মালম্বী। অন্যদিকে মুসলমানেরা ছিলেন অপেক্ষাকৃতভাবে কম অবস্থাসম্পন্ন এবং তারা কৃষিকাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

এ কারণে ঊনবিংশ শতাব্দীতেই রণজিৎ সিংয়ের বিরুদ্ধে যখন সৈয়দ আহমদ বেরলভী যুদ্ধের ঘোষণা দেন তখন বাংলা ও বিহার থেকে অসংখ্য মুসলিম ধর্মপ্রাণ মানুষ ছুটে যান তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে। বাংলা ও বিহার ছাড়া ভারতের অন্যান্য অংশের মুসলমানদের কাছে বেরলভীর সে আন্দোলন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি কেননা তারা অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে এ দুই অঞ্চলের মুসলমানদের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল।

১৯০৫ সালে তাই পূর্ববঙ্গ ও আসামকে একত্র করে ব্রিটিশ সরকার নতুন প্রদেশ গঠনের ঘোষণা দেন তখন সেটি বাংলার মুসলমানদের বিরাট অংশের মাঝে বাড়তি আনন্দ সৃষ্টি করেছিল। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা করা হলে তাদের অনেকের মাঝে নতুন করে হতাশা সৃষ্টি হয়।

অন্যদিকে বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ববঙ্গে শিক্ষার যে জোয়ার এসেছিল, তাতে অচিরেই ঢাকাতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা অবধারিত ছিল। বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে সে সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়। ১৯১২ সালের ২১শে জানুয়ারি ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফরে আসেন।

এই সফরকালে ঢাকার কিছু নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি তার সাথে সাক্ষাৎ করে বঙ্গভঙ্গ রদের কারণে তাদের ক্ষতির কথা জানান। এই ক্ষতি পূরণের লক্ষ্যে ঘোষণা দেন যে তিনি সরকারের কাছে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সুপারিশ করবেন। তবে হিন্দু ভূস্বামীদের একটি বড় অংশ ছিলেন ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে।

অন্যদিকে প্ৰথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের পরাজয় পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের মুসলমানদের মতো বাংলার মুসলিম সম্প্রদায়ের মাঝেও ব্যাপক হতাশার সৃষ্টি করে। সে সময়কার সুন্নী মুসলমানদের মাঝে খেলাফত ছিল পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের প্রতীক এবং আধুনিক তুরস্কের সাংস্কৃতিক নগরী ইস্তাম্বুল ছিলো তাদের এ খেলাফতের প্রাণভূমি।

কিন্তু ১৯২৩ সালে আধুনিক তুরস্ক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে মোস্তফা কামাল খেলাফত ব্যবস্থাকে রহিত করে দেন। কথিত আছে, খেলাফতি ব্যবস্থাকে সমুন্নত রাখার মোস্তফা কামালের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন সৈয়দ আমির আলী ও ইসমাঈলি সম্প্রদায়ের নেতা আগা খান কিন্তু মোস্তফা কামাল তাঁদের সাথে দেখা করেননি।

মোস্তফা কামাল সরাসরি তাদেরকে উত্তর দিয়েছিলেন, খেলাফত হচ্ছে সুন্নী মুসলিমদের বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের প্রতীক। সৈয়দ আমির আলী ও ইসমাঈলি সম্প্রদায়ের নেতা আগা খানের উভয়েই ছিলেন শিয়া মতাদর্শের অনুসারী। তাছাড়া তখন যেহেতু মক্কা ও মদিনার শাসনভার তুরস্কের হাতে আর ন্যস্ত ছিল না তাই মোস্তফা কামালও খেলাফতি শাসনব্যবস্থাকে অক্ষুণ্ণ রাখার পক্ষে ছিলেন না।

সুতরাং ইতিহাসের এ সময়টি সমগ্র বিশ্বের মুসলমান তো বটেই বাঙালি মুসলমানদের জন্য ছিল অত্যন্ত ক্রান্তিকালীন একটি সময়। তাই তাদের মাঝে মানসিকভাবে এক ধরনের শূন্যতাবোধ কাজ করত। ঠিক এ সময়ই আবির্ভাব ঘটে কবি কাজী নজরুল ইসলামের। তার রচিত সেই বিখ্যাত কবিতা থেকে যদি কয়েকটি লাইন আমরা স্মরণ করি:-

‘বাজিছে দামামা বাঁধরে আমামা
শির উঁচু করি মুসলমান।
দাওয়াত এসেছে নয়া যমানার
ভাঙ্গা কেল্লায় ওড়ে নিশান।’

অর্থাৎ বাংলার মুসমানদের মাঝে তিনি যেনও নতুনভাবে এক রেনেসাঁর জন্ম দিয়েছেন। তিনি তার নিপুণ সাহিত্যের আঁচড়ে বঙ্গীয় মুসলিমদের মাঝে পুনঃজাগরণের ডাক দিয়েছেন। হারিয়ে যাওয়া ইসলামী আচার, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে নতুনভাবে তিনি তার লেখনীতে ফুঁটিয়ে তুলেছেন।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্থপতি বলা হলেও পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছিলেন বঙ্গীয় মুসলমানেরা। কেননা পাকিস্তানের পাঞ্জাব, সিন্ধু কিংবা উত্তর-পশ্চিম সীমান্তপ্রদেশ থেকে শুরু করে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে যারা মুসলমান ছিলেন তারা সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেক অগ্রসর ছিলেন।

শিক্ষাক্ষেত্রেও তারা যথেষ্ট অগ্রসর ছিলেন। অবিভক্ত পাঞ্জাবে মুসলিম, শিখ এবং হিন্দু তিন সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন এবং তাদের প্রত্যেকে ছিলেন একে-অপরের সমকক্ষ। তাই ভারত ভেঙে নতুন রাষ্ট্র গঠনের পেছনে বাঙালি মুসলমানদের মাঝে যে ধরনের অধ্যবসায় পরিলক্ষিত হয়েছিল ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মুসলমানদের মাঝে তেমনটি ছিল না বললে চলে।

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ থেকে আলাদা হয়ে পাকিস্তান নামক যে রাষ্ট্রের সূচনা হয় এবং পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে পৃথক হয়ে বাংলাদেশ নামক যে রাষ্ট্রের জন্ম হয় তার নিভৃত কারিগর হিসেবে কাজী নজরুল ইসলামকে স্বীকৃতি দিলেও ভুল কিছু হবে না। বরং জাতীয় কবির মর্যাদাপ্রাপ্তি যেনও তার সৃষ্টিশীল কর্মের সামান্য স্বীকৃতিমাত্র।

দারিদ্র্যের তাড়নায় হয়তোবা তিনি খুব বেশি পড়াশোনার সুযোগ পাননি তবে তিনি ছিলেন একজন স্বশিক্ষিত ব্যক্তিত্ব। তাছাড়া আর্থিক দুরবস্থার কারণে তার সাহিত্যচর্চার পথ তেমন একটা মসৃণ ছিল না। আরবি, ফার্সি ও উর্দু থেকে শুরু করে ইংরেজিতেও তার পারদর্শিতা ছিল লক্ষ্য করার মত।

যা তার সাহিত্যচর্চায় বাড়তি মাত্রা দান করেছে। বিভিন্ন ভাষার শব্দমালার সংমিশ্রণে তিনি নতুন নতুন অনেক সুরের সৃষ্টি করেছেন। সব মিলিয়ে তিনি প্রায় ৩০০টির মতো সঙ্গীত রচনা করেছেন, বিশ্বে কোনো কবি এককভাবে তার মতো এতো সঙ্গীত রচনা করতে পারেনি।

ত্রিভূবনের প্রিয় মোহাম্মদ থেকে শুরু করে শোন শোন ইয়া ইলাহী কিংবা হেরা হতে হেলে দুলে নূরানী তনু ও কে আসে হায় মতো বাংলা সাহিত্যের বেশিরভাগ বিখ্যাত হামদ, নাত ও গজল এককভাবে তারই রচনা করা। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদকে (সঃ) স্মরণ করে তার লেখা:-

‘তৌহিদের মুর্শিদ আমার মুহাম্মদের নাম
মুর্শিদ মুহাম্মদের নাম
ওই নাম জপলেই বুঝতে পারি খোদাই কালাম
মুর্শিদ মুহাম্মদের নাম।’

কিংবা

‘রাসূলের অপমানে যদি না কাঁদে তোর মন,
মুসলিম নয় মুনাফিক তুই, রাসূলের দুশমন।"

বাংলার মুসলামনদের মাঝে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও ইসলামী মূল্যবোধ পুনরুদ্ধারে এভাবে তিনি কাজ করে গিয়েছেন। তবে ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। এজন্য হামদ, নাত ও গজল রচনার পাশাপাশি শ্যামা সঙ্গীত রচনায়ও তিনি ছিলেন যশস্বী।

বিংশ শতাব্দীতে ভারতবর্ষে তাই যখন হিন্দু এবং মুসলমান এ দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে অসহিষ্ণুতা রীতিমতো যখন এক বিপর্যয়ের রূপ নিলো সে সময়ে তিনি লিখেছেন:-

‘মোরা এক বৃন্তে দু’টি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।
মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।।
এক সে আকাশ মায়ের কোলে
যেন রবি শশী দোলে,
এক রক্ত বুকের তলে, এক সে নাড়ির টান।।
এক সে দেশের খাই গো হাওয়া, এক সে দেশের জল,
এক সে মায়ের বক্ষে ফলাই একই ফুল ও ফল।
এক সে দেশের মাটিতে পাই
কেউ গোরে কেউ শ্মাশানে ঠাঁই
এক ভাষাতে মা’কে ডাকি, এক সুরে গাই গান।।’

এমনকি সে যুগেও তিনি তার সন্তানদের নাম রেখেছিলেন কাজী সব্যসাচী, কৃষ্ণ মুহাম্মদ, কাজী অনিরুদ্ধ এবং অরিন্দম খালেদ। অন্যদিকে প্রেমিক কবি হিসেবেও নজরুল ঠাঁই করে নিয়েছেন কোটি কোটি যুগলের হৃদয়ে। তার রচিত একটি বিখ্যাত প্রেমের কবিতা:-

‘তোমারে পড়িছে মনে
আজি নীপ-বালিকার ভীরু-শিহরণে,
যুথিকার অশ্রুসিক্ত ছলছল মুখে
কেতকী-বধূর অবগুন্ঠিত ও বুকে-
তোমারে পড়িছে মনে।
হয়তো তেমনি আজি দূর বাতায়নে
ঝিলিমিলি-তলে
ম্লান লুলিত অঞ্ছলে
চাহিয়া বসিয়া আছ একা,
বারে বারে মুছে যায় আঁখি-জল-লেখা।
বারে বারে নিভে যায় শিয়রেরে বাতি,
তুমি জাগ, জাগে সাথে বরষার রাতি।’

কবি কাজী নজরুল ইসলামের আরও একটি দিক বিশেষভাবে আলোচনা করা প্রয়োজন, আর সেটি হচ্ছে তার রাজনৈতিক দর্শন। বাংলা সাহিত্যে তিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবেও পরিচিত। বাংলাভাষী মানুষের কাছে তাই তিনি এক বিদ্রোহের প্রতীকরূপে সমাদৃত।

তবে সে বিদ্রোহ নিতান্তভাবে অন্য সকল বিদ্রোহ থেকে প্রকৃতিগত দিক আলাদা। এ বিদ্রোহের পেছনে নেই কোনো অভিলক্ষ্য। কেবলমাত্র নিপীড়িত মানুষের উদ্দেশ্যে ধ্বনিত হয়েছে এ বিদ্রোহ। সুকান্ত ভট্টাচার্য কিংবা রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহও বিদ্রোহের কবিতা রচনা করেছেন তবে তাদের প্রত্যেকের বিদ্রোহ ছিলো মার্কসবাদী চিন্তাধারার নিরিখে প্রতিফলিত, এদিক থেকে নজরুল ছিলেন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এবং তার বিদ্রোহী চেতনাকে কোনও ধরনের রাজনৈতিক আদর্শ দিয়ে কখনও ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।

সমাজের সকল বৈষম্যের মূলে তিনি কুঠারাঘাত করেছেন নিম্নের দুই চরণের মাধ্যমে:-

‘গাহি সাম্যের গান-
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান!’

পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। নিখিল ভারতে স্বাধীনতাকামী মানুষের মাঝে প্রথম স্বাধীনতার বীজ বোপিত হয়েছিলো তার লেখনীর মাধ্যমে এমনটি দাবি করলেও ভুল হবে না। সত্যি কথা বলতে গেলে ১৯২০ সালের ১২ জুলাই নবযুগ নামক একটি সান্ধ্য দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হতে শুরু করে।

অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন শেরে-বাংলা এ.কে. ফজলুল হক। এই পত্রিকার মাধ্যমেই নজরুল নিয়মিত সাংবাদিকতা শুরু করেন। ওই বছরই এই পত্রিকায় ‘মুহাজিরীন হত্যার জন্য দায়ী কে’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেন যার জন্য পত্রিকার জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয়। নজরুল ব্রিটিশ সরকারের জনরোষে পতিত হন এবং রাষ্ট্রদোহিতার অভিযোগে তাকে কারারুদ্ধ করা হয়। স্বাধীনতাকামী মানুষের উদ্দেশ্যে তার লেখা:-

‘কারার ঐ লৌহকপাট,
ভেঙ্গে ফেল, কর রে লোপাট,
রক্ত-জমাট
শিকল পূজার পাষাণ-বেদী।
ওরে ও তরুণ ঈশান!
বাজা তোর প্রলয় বিষাণ!
ধ্বংস নিশান
উড়ুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদি।’

বস্তুতপক্ষে বলতে গেলে কাজী নজরুল ইসলাম যখন সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কলম ধরে দখলদার শ্বেতাঙ্গ ভগবানের বুকে পদচিহ্ন এঁকে দিয়ে ‘সেই দিন হবো শান্ত’ লেখেন সেটিই ভারতের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার ডাক। তাই নজরুলকে ছাড়া এ ভারতবর্ষের স্বাধীনতাকে কল্পনা করা কখনও সম্ভব নয়।

বাস্তবিক অর্থে বলতে গেলে বিদ্যাশিক্ষার ডিগ্রি থাকলেও জ্ঞানের কোনো ডিগ্রি নেই। জ্ঞান যেমনিভাবে ডিগ্রিবিহীন ঠিক তেমনি সীমাহীন। কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের সকলের মাঝে এ নির্মম বাস্তবতাকে চোখে আঙুল দিয়ে তুলে ধরেছেন। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাই তিনি খুব বেশি দূর অগ্রসর হতে না পারলেও বাংলা সাহিত্যকে একাই তিনি নিজ হাতে অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছেন।

শব্দ চয়ন থেকে শুরু করে বর্ণনার ভঙ্গি পর্যন্ত বিভিন্নক্ষেত্রে তিনি অসামান্য পান্ডিত্য দেখিয়েছেন। মাত্র ৪২ বছর বয়সে তিনি মস্তিষ্কের এক দুরারোগ্য ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত হন, তার সাহিত্যচর্চায় ছেদ পড়ে এবং তিনি ধীরে ধীরে তার বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। সত্যিকথা বলতে গেলে তার সাহিত্যচর্চার সময় ছিলো বিশ থেকে চব্বিশ বছরের মতো যেটা নিতান্ত কম বলতে হবে।

সংক্ষিপ্ত এ সময়টুকুতেও তাকে দারিদ্র্যের সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছে। তারপরেও তিনি তার লেখনীর দ্বারা গোটা বাঙালির হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছেন। দুর্ভাগ্যবশতঃ কবি কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা এখনও যথার্থভাবে মূল্যায়ন করতে পারিনি। দুখু মিঞা আমাদের মাঝে এখনও অনেকটা অনাদরে রয়ে গিয়েছেন, কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে আরও অধিক গবেষণার প্রয়োজন।

পাশাপাশি তার সৃজনশীল রচনাগুলোকে ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, স্প্যানিশসহ বিদেশি বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করা প্রয়োজন। সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী, কাজী নজরুল ইসলাম এবং সৈয়দ ফররুখ আহমেদ এ ত্রয়ীর জন্ম না হলে বাংলার মুসলমানেরা আজও অন্ধকারাচ্ছন্ন থেকে যেতো।

একইসাথে কাজী নজরুল ইসলাম না থাকলে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের যাঁতাকল থেকে সত্যিকার অর্থে আমরা কতোটুকু মুক্ত হতে পারতাম সে প্রশ্নও তোলার সুযোগ রয়েছে। তাই নজরুল চর্চা থেকে সরে আসা মনে মনন জগতকে আবারও সেই ঔপনিবেশিক দাসত্বের দিকে ঠেলে দেওয়া।

একই সাথে বাঙালি ও মুসলমান হিসেবে আমাদের যে গৌরবাজ্জ্বল সোনালী অতীত রয়েছে সেটিও বিলীন হয়ে যাবে আমাদের মনোজগত থেকে যদি না আমরা তার সৃষ্টিকর্মকে যথার্থভাবে তুলে ধরতে না পারি।

তাই নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে আমাদেরকে গুরুত্ব সহকারে কবি কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিশীল কর্মের প্রতি যত্নবান হতে হবে এবং সেগুলোকে সংরক্ষণের পাশাপাশি বিশ্ব দরবারেও যাতে আমরা তার রচনাকে ছড়িয়ে দিতে পারি সে ব্যাপারেও আমাদেরকে তৎপর হতে হবে।

এমআরএম/জিকেএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]