তাবলিগের কাজ সম্পর্কে আলেমদের বক্তব্য ও ৯ ঘোষণা

ধর্ম ডেস্ক
ধর্ম ডেস্ক ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:৩৯ এএম, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

দাওয়াতে দ্বীনের কাজকে সঠিক পন্থায় আঞ্জাম দেয়ার লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা দ্বন্দ্ব সংকট মোকাবেলায় এবং আলেমদের অবস্থান স্পষ্ট করতে গতকাল এক ওয়াজাহাতি জোড় অনুষ্ঠিত হয়।

মিরপুর ১২-এর ঐতিহাসিক হারুন মোল্লা মাঠে বাংলাদেশের শীর্ষ আলেম ও কাকরাইল মারকাজের শুরা সদস্য ও মুরব্বিরা এ জোড়ের আয়োজন করে। এ জোড়ের বয়ানে আলেমরাসহ স্থানীয় সংসদ সদস্য তাবলিগের দাওয়াতি কাজের চিন্তা-চেতনাসহ করণীয় বিষয়ে বয়ান ও বক্তব্য পেশ করেন।

আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী
ওলামা‌য়ে কেরামের সা‌থে তাবলিগের সব কাজ কর‌তে অনু‌রোধ ক‌রে‌ছেন আল্লামা আহমদ শফী। জোড়ে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা আহমদ শফী (দা.বা.)-এর উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তিনি অসুস্থ থাকায় আজকের জোড়ে উপস্থিত হতে পারেননি।

ওলামায়ে কেরাম হলেন সমা‌জের রাহবার, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওলামা‌দের আনুগত্য কর‌তে বলেছেন। ইঞ্জিনিয়ারদের মতানুসারে চলতে বলেননি। আলেমসমাজ নবী‌গণের ওয়ারিস ও যু‌গের পথ প্রদর্শক, এটা কুরআন ও হা‌দিস দ্বারা প্রমা‌ণিত।

তিনি বলেন, যারা সাদ সাহেবের এতাআতের দাবি করছে, তারা আসলে তার পূজা করছে। আমি এটাকে ব্যক্তিপূজা বলব। এমন ব্যক্তিপূজা ইসলাম সমর্থন করে না। আপনারা কাজ করে যান, কারো কথা শোনার দরকার নেই। ওরা হাতাহাতি করলেও আপনারা হাতাহাতি করবেন না।

মাওলানা ইয়াহইয়া মাহমুদ
তাবলিগ দাওয়াতি কাজের বিষয়ে আমি দেওবন্দের চিন্তা দর্শনের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। এক সেকেন্ডের জন্যও মাওলানা সাদের বিতর্কিত বক্তব্যকে সাপোর্ট করিনি, করতে পারিও না।

আমি সবসময় মাওলানা সাদের বিতর্কিত বক্তব্যের ঘরোয়া সমাধান চেয়ে আসছি। আমি চেয়েছি তাবলিগের কাজে উম্মতের মধ্যে মিল মহব্বত থাকুক। বিভক্তি তৈরি না হোক।

আলেম-ওলামা তাবলিগের মঙ্গলকামী, হিতাকাঙ্ক্ষী। তাদের মতামতই শরিয়তের সব বিষয় চূড়ান্ত বলে বিবেচিত। তবুও তারা তাবলিগের চলমান সঙ্কট বিষয়ে আরও শান্তিপূর্ণ ও সহনশীলভাবে মতামত দিবেন। আমি তাবলিগ বিষয়ে আলেম ও আওয়ামের মাঝে কোনো কোনো সংঘাত চাই না।

মাওলানা সাদের বিতর্কিত বক্তব্যের সংশোধন অবশ্যই প্রয়োজন। তবে পক্ষ-বিপক্ষ বক্তব্যের কারণে উম্মতের মধ্যে যাতে ফাঁটল তৈরি না হয় সে দিকে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা জরুরি। এ কথা আমে আগেও বলেছি এখনও বলছি।

তাবলিগ ৬ উসুলের ওপর চলে আসছে এখনো সেভাবেই চলা উচিত এবং এর মধ্যে আমরা কোনো বিভাজন দেখতে চাই না। মুরব্বিরা আগে যেভাবে তাবলিগ পরিচালনা করেছেন এখনও সেভাবেই তা ঠিক রাখবেন বলেও আমি মনে করি।

আসলামুল হক আসলাম, এমপি
তাবলিগের চলমান সংকটে সাধারণ জনগণকে ওলামায়ে কেরামের পরামর্শে চলার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা ১৪ আসনের এমপি আসলামুল হক আসলাম বলেন, অসুখ হলে যেমন রোগী ডাক্তারের কাছে যায়, ছাত্র শিক্ষা নিতে শিক্ষকের কাছে যায়, তেমনিভাবে বর্তমান তাবলিগের চলমান সংকটে সাধারণ জনগণের উচিত আলেম-ওলামাদের পরামর্শে চলা।

তিনি আরো বলেন, আমি আমার এলাকার ১৪৪ টি মস‌জি‌দের ইমাম‌দের পরামর্শ নিয়েছি। আমি বিশৃঙ্খলাকারী গ্রুপ‌কে বোঝা‌নোর জন্য ইমাম‌দের নি‌র্দেশ দিয়ে‌ছি। বলেছি আপনারা আলেমদের সা‌থে বসুন। তাবলী‌গে বিশৃংখলাকারীদের স‌ঙ্গে সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই।

আলহাজ ইলিয়াস মোল্লাহ এমপি
তাবলিগের কাজে সব সময় আলেমদের পা‌শে থাকার অ‌ঙ্গীকার ক‌রে‌ ঢাকা-১৬ আসনের (মিরপুর) এমপি আলহাজ ইলিয়াস মোল্লাহ বলেছেন, আমরা আলেমদের সাথে আছি, থাকবো।

আমরা সবসময় শান্তির পক্ষে। (তাবলিগ) কাকরাইল মস‌জিদকে দুই ভাগ করতে দেয়া যাবে না, ইজতেমাও দুই ভাগ হবে না। এসময় তিনি আল্লাহ এবং তার রাসুলের বিরুদ্ধাচারণকারীদের কঠোর হুঁশিয়ারি দেন।

এছাড়াও জোড়ে আরো বক্তব্য দেন কাকরাইল মারকাজের শুরা সদস্য মাওলানা যুবাইর আহমদ, জামিয়া রাহমানিয়ার প্রিন্সিপাল মাওলানা মাহফুজুল হক, আরজাবাদ মাদরাসার পরিচালক মাওলানা বাহাউদ্দিন যাকারিয়া, শাইখ জাকারিয়অ রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদ, কাপাশিয়ার পীর অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান, শাইখুল হাদীস মাওলানা সা‌জিদুর রহমান, উত্তরা আল মানহাল মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা কেফায়েতুল্লাহ আজহারী, ট‌ঙ্গি দারুল উলুম মাদরাসার প্রিন্সিপাল মুফতি মাসউদুল করিম প্রমুখ।

জোড় থেকে ৯ টি ঘোষণা সম্মলিত একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। আর তাহলো-
১। জমহুর উলামায়ে কেরাম একমত হয়েছেন তিনটি মৌলিক কারণে
ক. কুরআন ও হাদীসের মনগড়া ব্যাখ্যা।

খ. তাবলীগের গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে তাবলীগ ব্যতীত দ্বীনের অন্যান্য মেহনতকে যথা দ্বীনি শিক্ষা ও তাসাউফ ইত্যাদিকে হেয় প্রতিপন্ন করা।

গ. পূর্ববর্তী তিন হযরতজীর উসূল ও কর্মপন্থা থেকে সরে যাওয়ার কারণে বর্তমানে মাওলানা সা’দ সাহেবকে অনুসরণ করা সম্পূর্ণভাবে বর্জনীয় ও নিষিদ্ধ।।

২। মাওলানা সাদ সাহেব হযরত মাওলানা এনামুল হাসান রহ. এর রেখে যাওয়া শুরায়ী নেযামকে উপেক্ষা করে নিজেই নিজেকে আমির দাবি করেছেন, যা শরীয়ত বিরোধী। তাই তার কোন সিদ্ধান্ত এবং ফায়সালা বা নির্দেশ কাকরাইল মারকাজ তথা বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করা যাবে না।।

৩। দারুল উলুম দেওবন্দ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, মাওলানা সাদ সাহেব আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মতাদর্শ থেকে সরে গিয়ে নতুন কোনো ফেরকা গঠনের অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে বালাদেশের কোনো জামাত বা ব্যক্তিকে নিজামুদ্দিনে পাঠানো বা যাওয়া মুনাসিব হবে না। অনুরুপভাবে নিজামুদ্দিন থেকে আগত কোনো জামাতকে কোন জেলায়/থানা/ইউনিয়নে কাজ করার সুযোগ দেওয়া যাবে না।

৪. মাওলানা ইলিয়াস রহ. মাওলানা ইউসুফ রহ. ও হযরত মাওলানা এনামুল হাসান রহ এর বাতলানো পদ্ধতিতে তাবলিগের কাজ সারা দুনিয়ায় সমাদৃত ও গৃহীত হয়েছে।
তাই বাংলাদেশে এই তিন হজরতের পদ্ধতিতে এবং ওলামাদের তত্ত্বাবধানে তাবলিগের কাজ পরিচালিত হবে। নতুন কোনো পদ্ধতি চালু করা যাবে না। কাকরাইল ও টঙ্গী ময়দান এবং জেলা মারকাজসহ সকল মারকাজ এই নীতিতেই পরিচালিত হবে।

৫। কাকরাইল মসজিদের যে সকল শুরা সদস্য আমরণ মাওলানা সাদ সাহেবের ভ্রান্ত আকীদা অনুসরণের শরীয়ত পরিপন্থী হলফ নামা করেছেন, তারা শুরাসদস্য থাকার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছেন। অতএব তাদেরকে তাবলীগের কাজে শুরা ও ফায়সাল না রাখার আহ্বান জানানো যাচ্ছে।

৬। ২০১৮ ইং সনের বিশ্ব ইজতেমার পূর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়ের সভাপতিত্বে ত্রিপক্ষীয় তথা-
কাকরাইলের আহলে শুরা, শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখার জোর আহ্বান জানানো যাচ্ছে।

সিদ্ধান্তগুলো হলো-
ক) মাওলানা সাদ সাহেব দারুল উলুম দেওবন্দের সাথে মতপার্থক্য দূর করতঃ দারুল উলুম দেওবন্দের আস্থা অর্জন না করা পর্যন্ত বাংলাদেশে আসতে পারবেন না।

খ) নিজামুদ্দীনের যে সকল আকাবির উলামায়ে কেরাম মাওলানা সাদ সাহেবের সাথে দ্বিমত পোষণ করে মারকাহ ত্যাগ করে চলে গেছেন, তাদের সাথে সমস্যা নিরসন করে একসাথে বাংলাদেশে আসবেন; একা আসবেন না।

৭। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশ ও জাতির শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার্থে উল্লেখিত বিষয় দুটির সমাধান না হওয়া পর্যন্ত মাওলানা সা’দ সাহেবের কোনো পরামর্শ ও নির্দেশনা তাবলিগের সাথী ভাইরা এদেশে চালানোর চেষ্টা করবেন না; বরং এদেশের দাওয়াত ও তাবলিগের মেহনত কাকরাইল মারকাজের মুরুব্বিদের পরামর্শক্রমেই চলবে।

৮। এবারের পাঁচ দিনের জোড় ৭,৮,৯,১০,১১ ডিসেম্বর ২০১৮ইং অনুষ্ঠিত হবে। ২০১৮ এর টঙ্গী ইজতেমায় সরকারের সাথে পরামর্শক্রমে আগামী ২০১৯ইং এর টঙ্গী ইজতেমার জন্য নির্ধারিত তারিখ প্রথম পর্ব ১৮,১৯,২০ জানুয়ারী ও দ্বিতীয় পর্ব ২৫,২৬,২৭ জানুয়ারীর সাথে আজকের মজমা ঐকমত্য পোষণ করছে।

৯। ২০১৯ সালের ইজতেমার আগে ও পরে কোনো জেলাওয়ারী ইজতেমা হবে না। উপরোক্ত ঘোষণাসমূহ যথাযথ বাস্তবায়নে এবং বর্তমানে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলারোধে সরকারের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করা হচ্ছে।
এ জোড়ে আলেমদের বয়ানে একটি বিষয় সুস্পষ্ট ভাষায় ওঠে এসেছে যে, তাবলিগ জামাতের বয়ান, আমল, তালিম, মশওয়ারা কোনো কিছুতেই আমির নিযুক্ত নেই। এমনকি বিশ্ব ইজতেমায় কে বয়ান করবেন আর কে ইমামতি ও মুনাজাত করবেন তাও নির্ধারণ করা থাকে না।

তারা বলেন, তাবলিগে এখন একটিই মাত্র সমস্যা মাওলানা সাদ। তার বিভ্রান্তি, দীনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বক্তব্য বাদ দিলেই তাবলিগ আগের অবস্থানে চলে আসতো। কিন্তু সেটা তিনি না করে পুরো তাবলিগ জামাতকে দ্বিখন্ডিত করে দিলেন।

বক্তারা আরও বলেন, উলামায়ে কেরাম তাবলিগের কোনো মজমা বা মারকাজ দখলে নিতে চায় না, তারা চায় তাবলিগ ও দীনি কাজ চলুক প্রশ্নহীন ভাবে। ইখলাস পরিপন্থী কিছু যেন এ কাজে না প্রবেশ করে।

বাংলাদেশের শীর্ষ ওলামায়ে কেরাম তাবলিগ জামাতের চলমান পরিস্থিতিতে তাদের অবস্থান ও কর্মসূচি সুস্পষ্ট করার লক্ষ্যে রাজধানীর মিরপুরের ঐতিহাসিক হারুন মোল্লাহ ঈদগাহ মাঠে মিলিত হয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে বয়ান পেশ করেন।

উল্লেখ্য যে, দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজের আমির মাওলানা সাদ কান্ধলভির বিভ্রান্তিমূলক মন্তব্যের জেরে বিশ্বব্যাপী আলেম-ওলামাদের মাঝে দ্বীনি অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মাওলানা সাদ কান্ধলভিকে দাওয়াতে দ্বীনের পথে রুজু করতে দেওবন্দসহ বিশ্ব আলেম-ওলামাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই।

বাংলাদেশে মাওলানা সাদ সাহেবের অনুসরনের তাবলিগের কিছু লোক কাজ করে চলছে। যার ফলে কাকরাইলসহ দেশের বিভিণ্ন মারকাজে কাজের ক্ষেত্রে কিছু সংকট তৈরি হয়েছে।

যেহেতু যুগ যুগ ধরে ৬ উসুলের মাধ্যমে চলে আসছে দাওয়াতে দ্বীনের মেহনতি সংগঠন তাবলিগ জামাত। হঠাৎ করেই দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজের আমির মাওলানা সাদ কান্ধলভি বিতর্কিত নসিহত ও মন্তব্য এবং নিজেকে আমির দাবি করে বসা। যার প্রেক্ষিতে শুরু হয় তাবলিগের চলমান দ্বন্দ্ব ও সংকট।

তাই তাবলিগ জামাতের দাওয়াতে দ্বীনের কাজকে গতিশীল ও তরান্বিত করতে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় ৫টি নির্দেশনা দিয়ে একটি পরিপত্র জারি করে। আবার কারণ উল্লেখ ছাড়াই ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় তাদের জারি করা পরিপত্র এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্থগিত করে।

হারুন মোল্লা মাঠ থেকে আলেম ঘোষণা হলো ৬ উসুলের মাধ্যমেই আগের মতো দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ চলবে। থাকবে আলেমদের সঠিক দিন নির্দেশনা।

এমএমএস/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]