যে ঘটনায় ইসলাম গ্রহণ করলেন ওসমান ইবনে তালহা

ধর্ম ডেস্ক
ধর্ম ডেস্ক ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:০৫ এএম, ১৩ নভেম্বর ২০১৯

কী সে কথা? যে কথায় ইসলাম গ্রহণের আগ্রহ জন্মেছিল ওসমান ইবনে তালহার হৃদয়ে। বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যে কথা, গুণ ও আদর্শে ওসমানের হৃদয়ে আশ্চর্যজনক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত যে গুণের প্রতিক্রিয়ায় ইসলাম গ্রহণ করলেন ওসমান ইবনে তালহা।

কী সে ঘটনা? কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে ইসলাম গ্রহণের ঘটনা ঘটেছিল। আসুন জেনে নেয়া যাক প্রিয় নবির জীবনী থেকে ওসমানের ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি-

কাবা শরিফ মহান আল্লাহর ঘর। যুগে যুগে এ ঘরের জিম্মাদারি পালন করেছেন রাজা বাদশাহসহ অনেক বংশ-গোত্রের লোকেরা। সে সময়ও কাবা ঘরের যে কোনো দায়িত্ব পালনকে সম্মান ও মর্যাদার কাজ মনে করা হতো।

প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়ত লাভের সময়কালে হাজিদের জমজমের পানি পান করানোর দায়িত্ব পালন করতেন হজরত আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু।

কাবা ঘরের অনেক কাজের দায়িত্ব ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অভিভাবক ও চাচা আবু তালিবের ওপর।

সে সময় কাবা শরিফের চাবির দায়িত্ব পালন করতেন ওসমান ইবনে তালহা। তখনও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। সে সময় সপ্তাহে ২ দিন (প্রত্যেক সোম ও বৃহস্পতিবার) কাবা শরিফের দরজা খুলে দেয়া হতো। আর এ দুই দিন লোকেরা কাবা ঘরে প্রবেশ করার সৌভাগ্য লাভ করতো।

হিজরতের আগের কথা। ওসমানের ইসলাম গ্রহণের আগে একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কয়েকজন সাহাবা নিয়ে কাবা শরিফে প্রবেশ করতে চাইলেন। ওসমান বিশ্বনবি ও তার সাহাবাদের কাবা ঘরে প্রবেশ করতে দিলেন না।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবা ঘরে প্রবেশে চাবি না পাওয়াকে অপমান মনে করে ওসমানের ওপর রাগ করেননি। আবার নিজ বংশ আভিজাত্যের প্রভাব খাটিয়ে জোর করে কাবা ঘরে প্রবেশও করেননি। এমনকি প্রবেশের চেষ্টাও করেননি।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে ওসমানের সে বাধা মেনে ফিরে গেলেন। যাওয়ার সময় বললেন-
‘ওসমান! একদিন তুমি কাবা শরিফের এ চাবি আমার হাতে দেখতে পাবে। আমি তখন যাকে ইচ্ছা তাকে এ চাবিটা দেব।’

বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ কথার জবাবে ওসমান বললেন-
‘এমন দিন যদি আসে তাহলে সেটা হবে কুরাইশ বংশের অপমান ও অপদস্থ হওয়ার দিন।’

ওসমানের কথার জবাবে ধীরস্থির ও দরজা কণ্ঠে তার হৃদয়ে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়া সে কথাটি বিশ্বনবি এভাবে বললেন-
‘হে ওসমান! ‘না, না’, বরং যে দিন আমার হাতে কাবা চাবি আসবে সেদিন কুরাইশ বংশ হবে যথার্থ সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। তারা সেদিনই পাবে মুক্তির প্রকৃত স্বাদ।’

হজরত ওসমানের প্রতিক্রিয়া
বিশ্বনবি কাবা ঘরে প্রবেশ করতে পারলেন না। আবার ওসমানের কথায় ক্ষেপেও গেলেন না। জোর করে কাবা ঘরে প্রবেশের চেষ্টাও করলেন না। এমনকি বংশ আভিজাত্যের ভাবও দেখালেন না। বরং ওসমানের বাধাকেই মেনে নিলেন।

আবার ওসমানের তির্যক কথার বিরূপ মন্তব্য না করে কুরাইশ বংশের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধির ভবিষ্যৎ বাণী শোনালেন। তার মনে এক আশ্চর্যজনক প্রতিক্রিয়া তৈরি হলো-
‘তার মনে এ বিশ্বাস জন্মে গেলো যে, মুহাম্মাদ যা বলেছেন তা অবশ্যই ঘটবে। ওই মুহূর্তেই তিনি ইসলাম গ্রহণের সংকল্প গ্রহণ করে ফেললেন। শুধু ঘোষণার বাকি ছিল।’

এদিকে ওসমানের বংশের লোকেরা জানতে পারলেন যে, ওসমান ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এ সংবাদে ওসমানের বংশের লোকেরা তাকে কঠিন ভৎসনা করলে লাগলো। যে কারণে ইসলাম গ্রহণ করলো না ওসমান।

অবশেষে কাবা ঘরে না ঢুকেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতৃপ্ত হৃদয়ে মদিনায় হিজরত করলেন। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর কাবা ঘরের প্রবেশের সে সুবর্ণ সময় ঘনিয়ে এলো। তখনও কাবার চাবির দায়িত্বে ছিল ওসমান ইবনে তালহা।

বিশ্বনবির কাবা ঘরে প্রবেশ
মক্কা বিজয়ের দিন বিশ্বনবি কাবা চত্ত্বরে আসলেন। ওসমান ইবনে তালহার কাছে চাবি চাইলেন। তখনও ওসমান ইসলাম গ্রহণ করেনি।

ওসমান কাবা ঘরের বরকতময় সে চাবি বিশ্বনবির হাতে তুলে দিলেন। চাবি নিয়ে বিশ্বনবি নিজ হাতে কাবা শরিফের দরজা খুললেন এবং ভেতরে গেলেন। প্রিয় কাবার ভেতরে তিনি ২ রাকাআত নামাজ আদায় করলেন।

এ সময় কাবা শরিফের বাইরে অপেক্ষমান সাহাবারা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবা শরিফ থেকে বের হলেন।
কাবার চাবি হস্তান্তর
সীমাহীন কৌতুহল নিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাসের দিকে সবার দৃষ্টি। আজ কে পাবে পবিত্র কাবা চাবি। কাকে দেয়া হয়ে এ সম্মানজনক দায়িত্ব?

হজরত আব্বাস ও আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে শুরু করে অনেকেই সেখানে উপস্থিত। তাঁরা উভয়ে বিশ্বনবির কাছে এ দায়িত্ব লাভের আবেদনও করেছিল।

কিন্তু না, সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বনবি ডাক দিলেন, কোথায় ওসমান ইবনে তালহা? ভিড় ঠেলে ওসমান ইবনে তালহা সামনে এগিয়ে আসলেন। বিশ্বনবি ওসমান ইবনে তালহার হাতে কাবা শরিফের চাবি দিয়ে বললেন-
‘এখন থেকে কেয়ামত পর্যন্ত কাবা শরিফের এ চাবি তোমার বংশধরদের হাতেই থাকবে। তোমাদের হাত থেকে এ চাবি কেউ ছিনিয়ে নিতে চাইলে সে হবে জালিম ও অত্যাচারী।’

বিশ্বনবির হাত থেকে চাবি নিয়ে ওসমান ইবনে তালহা চলে যাচ্ছিলেন। বিশ্বনবি তাকে ডাকলেন আর বললেন-
‘মনে আছে কি সেদিনের কথা? আমি যা বলেছিলাম তা-ই হলো না? একদিন এ চাবি আমার হাতে দেখতে পাবে। যে দিন আমার হাতে কাবা চাবি আসবে সেদিন কুরাইশ বংশ হবে যথার্থ সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। তারা সেদিনই পাবে মুক্তির প্রকৃত স্বাদ।’

ওসমান ইবনে তালহার মনে পড়ে গেলো হিজরতের আগের সব ঘটনা। এসব ভাবতে ভাবতে বিশ্বাসের আলোয় ভরে ওঠলো ওসমান ইবনে তালহার মন। হৃদয়ে গভীর থেকে তিনি বলে ওঠলেন-
‘নিঃসন্দেহে আপনার কথার পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়েছে। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি- আপনিই আল্লাহর রাসুল…।’

এ ছিল বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুপম চরিত্র। যে চরিত্রে ছিল ধৈর্য। যে চরিত্রে ছিল না কোনো বংশ-গোত্রীয় অহংকার। ছিলনা ঝগড়া কিংবা কটু কথা। ছিল না কোনো রাগ। ছিল শান্তি আর শান্তি। আবার ক্ষমতা লাভের পরও ছিল না কোনো ক্ষমতার দম্ভ।

কাবা চাবি না পাওয়ার সামান্যতম ব্যথা-বেদনাও ছিল না তার হৃদয়ে। একান্ত অনাবিল প্রশান্ত হৃদয়েই তিনি সেদিন ডেকে ছিলেন- হে ওসমান! আজ থেকে আজীবন এ চারি দায়িত্বও তোমার।

মানবজাতির জন্য কতই না তুলনাহীন উত্তম চরিত্র ও গুণের শিক্ষা রেখে গেলেন । যুগের পর যুগ যে শিক্ষায় আলোকিত হবে মুমিন হৃদয়।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উত্তম চরিত্রগুলো দান করুন। বিশ্বনবির আদর্শ পালন ও বাস্তবায়নের তাওফিক দান করুন। আমিন।

এমএমএস/জেআইএম