বিখ্যাত ৪ নেতার স্মৃতিধন্য যে মসজিদ

ধর্ম ডেস্ক
ধর্ম ডেস্ক ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২:৫৮ পিএম, ১৬ জুন ২০২১

ঐতিহ্যবাহী হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ। জনমুখে খ্যাতির শীর্ষে থাকা মসজিদগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ থানা সদরের ঐতিহ্যবাহী হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ। ১০৩ বছরের পুরোনো ২৮ হাজার ৪০৫ বর্গফুটের এ বিশাল মসজিদে নামাজ পড়তে এবং এর ভেতরের নকশা ও ১২৮ ফুটের সুউচ্চ মিনার দেখতে প্রতিনিয়ত ভিড় লেগেই থাকে। ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদে নামাজ পড়েছিলেন- শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু, ভাসানীসহ অনেক বরেণ্য আউলিয়ারাও।

দৃষ্টিনন্দন ঐতিহাসিক হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ। কুমিল্লাহ-চাঁদপুর মহাসড়ক সংলগ্ন হাজীগঞ্জ বাজারের প্রাণকেন্দ্রে ১৯১৮ সালে নির্মিত মসজিদটির স্থাপনাশৈলী এখনও মানুষকে বিমোহিত করে চলেছে। ১৩২৫ বাংলা সনে হাজিগঞ্জের স্থানীয় হাজি আহমাদ আলী পাটোয়ারি মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করে বিপুর পরিমাণ সম্পত্তি ওয়াকফ্ করেন।

চাঁদপুর জেলা শহরের ২০ কিলোমিটার পূর্বে কুমিল্লা-চাঁদপুর মহাসড়কের পাশে অবস্থিত মসজিদটি মুসলিম স্থাপত্য শিল্পেরও অনন্য নিদর্শন। সুউচ্চ মিনার ও দ্বিতল মসজিদটির ভেতর-বাইরের কারুকাজ সবার নজর কাড়ে।

মসজিদ নির্মাণের আগে প্রতিষ্ঠা ও মোতাওয়াল্লি হাজী আহমাদ আলী পাটোয়ারী নিজেই এ স্থাপনার পুরো নকশাটা তৈরি করেন। তার নিজস্ব চিন্তার ফসলে সহযোগিতা করেছিলেন তৎকালীন শিল্পী আব্দুর রহমান ওস্তাগার। মসজিদ নির্মাণকাজে কোনও প্রকৌশলীর পরামর্শ নেননি মোতাওয়াল্লি হাজি আহমাদ আলী পাটোয়ারী।

বর্তমানে হাজি আহমাদ আলী পাটোয়ারীর ওয়াকফ্ সম্পত্তিতে গড়ে ওঠেছে হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ কমপ্লেক্স। মসজিদ পরিচালনায় সভাপতি- উপজেলা নির্বাহী কর্মর্তাসহ আছেন ৯ সদস্যের উপদেষ্টা কমিটি।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ঐতিহাসিক হাজীগঞ্জ বড় মসজিদে জুমআর নামাজের আজান ও ইকামতের উদ্বোধন উপলক্ষ্যে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ চারজন মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ মসজিদে নামাজ পড়েছেন। এছাড়াও জাতীয় নেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীসহ আরও অনেকেই এ মসজিদে নামাজ পড়েছিলেন।

মসজিদ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
মসজিদ সম্পর্কে জানা যায়, ১১৭৫ থেকে ১২০০ বাংলা সালে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে আরবদেশ থেকে হাজী মকিমউদ্দিন রাহমাতুল্লাহি আলাইহি নামে একজন বুজুর্গ হাজীগঞ্জে আসেন। বর্তমান বড় মসজিদের মেহরাবসংলগ্ন উঁচু ভূমিতে স্থানে তিনি পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেন। হাজী মকিমউদ্দিন ছিলেন স্থানীয়দের কাছে শ্রদ্ধাভাজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব।

হাজি মকিমউদ্দিন রাহমাতুল্লাহি আলাইহির বংশধর হাজি মনিরুদ্দিন ওরফে মনাই হাজি’র নাতি ছিলেন মোতাওয়াল্লী আহমাদ আলী পাটওয়ারী। তিনি ১৩২৫ থেকে ১৩৩০ বাংলা সালের দিকে হাজি মকিমউদ্দিন রাহমাতুল্লাহির বসতি বর্তমান মেহরাবের পাশে প্রথমে একচালা খড়ের ইবাদতখানা তৈরি করেন। তারপর খড় ও গোলপাতা দিয়ে তৈরি করেন দোচালা মসজিদ।

পাকা মসজিদের ভিত্তিস্থাপন
১৩৩৭ বাংলা সালের ১৭ আশ্বিন হাজী আহমাদ আলী পাটোয়ারীর ইচ্ছা ও চেষ্টায় হজরত মাওলানা আবুল ফারাহ জৈনপুরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি পাকা মসজিদের ভিত্তিস্থাপন করেন।

ঐতিহাসিক এ মসজিদটি ৩ ভাগে নির্মিত হয়। মেহরাবসহ মসজিদের প্রথম অংশটি ৪ হাজার ৭৮৪ বর্গফুট। মাঝের অংশটি ১৩ হাজার ৬ বর্গফুট। আর বারান্দা বা সুউচ্চ মিনারসহ তৃতীয় অংশটি ১ হাজার ৬১৫ বর্গফুট। ১৯ হাজার ৪০৫ বর্গফুটের মসজিদসহ সর্বমোট আয়তন ২৮ হাজার ৪০৫ বর্গফুট।

মসজিদের অলংকরণ ও অবকাঠামো
শুরুতে ঐতিহাসিক এ মসজিদের ভেতরের প্রথম অংশের মেহরাবসংলগ্ন দেওয়ালে হজরত মাওলানা আবুল ফারাহ জৈনপুরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি চুন-সুরকি কেটে কারুকাজের মাঝে সুরা ইয়াসিন ও সুরা জুমআ নিজ হাতে লেখেন বলেও জানা যায়। পরবর্তীতে মসজিদটি সংস্কারের সময় সেগুলো উঠিয়ে ফেলা হয়।
সে সময় মেহরাব তৈরিতে কাচের ঝাড়ের টুকরো নিখুঁতভাবে কেটে মনোরম ফুলের ঝাড়ের নকশা করা হয়েছিল। মসজিদের মাঝের অংশটি রয়েছে আকর্ষণীয় ৭৭টি পিলার। ঝিনুকের মোজাইক দিয়ে ফ্লোর নির্মিত। মসজিদের পূর্ব পাশের তৃতীয় অংশে রয়েছে তিনটি বিশাল গম্বুজসহ সুউচ্চ মিনার।

মসজিদে মিনার ও গম্বুজ
১৯৫৩ সালে এ মসজিদের সুউচ্চ মিনারটি নির্মাণ করা হয়। ১২৮ ফুট উচ্চতার মিনারটি দেখতেও সুন্দর ও নিখুঁত। এর চুড়ায় ওঠাতে মিনারের ভেতরে তৈরি করা হয় সিঁড়ি। সব বয়সের সক্ষম মানুষ যা বেয়ে উপরে ওঠে পুরো থানার দৃশ্য দেখে আবেগে আপ্লুত হয়।

ওই একই সময়ে নির্মিত হয় মসজিদের পূর্ব পাশের দেওয়াল ও একাধিক একাধিক কারুকাজে সাজানো ফটক। ফটকগুলোতে পবিত্র কালেমা শরিফ খচিত চীনা বাসনের টুকরো দিয়ে তৈরি ফুলের ঝাড়ের মতো সাজানো হয়।

সুউচ্চ মিনারের পাশে ৩টি বড় গম্বুজও পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কারণ গম্বুজের গায়ে বসানো হয়েথে পাথরের তৈরি অসংখ্য তারকা। সুউচ্চ মিনারসহ বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত ৪৬টি মাইকে প্রচারিত হয় প্রতি ওয়াক্তের আজান।

মসজিদ কমপ্লেক্স ও কার্যক্রম
ঐতিহাসিক হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ কমপ্লেক্সের আওতায় রয়েছে একাধিক আবাসিক অনাবাসিক প্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে অন্যতম হলো-
১. হাজীগঞ্জ আহমাদিয়া কামিল মাদরাসা।
২. মুনিরিয়া নুরানি মাদরাসা।
৩. ফোরকানিয়া মাদরাসা।
৪. ইয়াতিমখানা।
৫. লিল্লাহবোডিং।
৬. নিরবচ্ছিন্ন প্রশস্ত অজুখানা।
৭. ওয়াজ-মাহফিল ও ধর্মীয় আলোচনার জন্য উন্মুক্ত বিশাল আঙিনা।
৮. মুসল্লিদের জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা।
৯. রমজানে রোজাদারদের জন্য ইফতার ও ইতেকাফের সুব্যবস্থা।
১০. মসজিদের স্থায়ী আয়ের উৎস হিসেবে রয়েছে- মার্কেট ও দোকান।
১১. মসজিদ কমপ্লেক্সের সেবাদানকারী সদস্যের সংখ্যা প্রায় ১৭০ জন।
এছাড়াও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পর্যাপ্ত আলো ও বাতাসের ব্যবস্থা, উন্নয়ন ও দুর্যোগে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক কার্যক্রমেও সাধ্যমত আর্থিক সহযোগিতা করা হয়।

ঐতিহাসিক হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ কমপ্লেক্সের সভাপতি থানা নির্বাহী কর্মকর্তা হলেও বরাবরে মতো মসজিদের মোতাওয়াল্লী আছেন হাজি মো. আলমগীর কবির পাটোয়ারী।

প্রতিষ্ঠাতা মোতাওয়াল্লী হাজি আহমাদ আলী পাটওয়ারীর মৃত্যুর পর থাকে তার বংশধররাই এ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তার মৃত্যু পর দায়িত্ব পালন করেন তার তৃতীয় ছেলে মো. মনিরুজ্জামান পাটওয়ারী এবং তার মৃত্যুর পর মোতওয়াল্লির দায়িত্ব নেন বড় ছেলে হাজি মো. আলমগীর কবির পাটওয়ারী।

মহামারি করোনার এ সময়েও কমেনি হাজিগঞ্জ বড় মসজিদ দেখতে আসা উৎসুক মুসল্লিদের ভিড়। তবে সরকারঘোষিত স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মসজিদ পরিচালনা কমিটি নামাজ ও অন্যান্য কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন।

এমএমএস/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]