মধ্যযুগে মুসলিম সভ্যতায় আলো জ্বেলেছিলেন যারা

ইসলাম ডেস্ক
ইসলাম ডেস্ক ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩:১৫ পিএম, ০২ জানুয়ারি ২০২৬
মধ্যযুগে মুসলিম সভ্যতায় আলো জ্বেলেছিলেন যারা ছবি: ফ্রিপিক

হুমায়ুন আহমেদ নাইম

ইতিহাসের পাতায় মধ্যযুগ এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের সাক্ষী। যখন ইউরোপ রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর এক গভীর সংকটে নিমজ্জিত ছিল; যা ইতিহাসে 'অন্ধকার যুগ' হিসেবে পরিচিত ঠিক সেই সময়েই পৃথিবীর অন্য প্রান্তে সোনাালি আলোয় মশাল জ্বেলেছিল মুসলিম সভ্যতা।

যখন ইউরোপে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা অবরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলো এবং সমাজ ছিল কুসংস্কারে পরিপূর্ণ, তখন বাগদাদ, কর্ডোবা ও কায়রোর মতো শহরগুলো হয়ে উঠেছিল বিশ্ব সভ্যতার আলোকবর্তিকা। একদিকে ইউরোপের লাইব্রেরিগুলো যখন ধূলাবালিতে ঢাকা পড়ছিল, অন্যদিকে মুসলিম বিজ্ঞানীরা গ্রিক, পারস্য ও ভারতীয় জ্ঞানকে একত্রিত করে গড়ে তুলছিলেন আধুনিক বিজ্ঞানের মজবুত ভিত্তি। ইউরোপের বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, সাহিত্য যখন মুখ থুবড়ে পড়ে, তখন ত্রানকর্তা হিসেবে ছিলেন তৎকালীন মুসলিম মনীষীরাই। এখানে তেমন কয়েজন মুসলিম মনীষীর কথা তুলে ধরছি।

আল-জাজারি

১২ শতকে তার যান্ত্রিক সৃষ্টিগুলোকে ইসলামী স্বর্ণযুগের সবচেয়ে বিস্ময়কর যান্ত্রিক সৃষ্টি হিসাবে গণ্য করা হয়। তার উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার গুলো ছিল পানি দ্বারা চালিত ঘড়ি, হাত-ধোয়ার যন্ত্র যেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে যন্ত্রটির ব্যবহারকারীকে সাবান ও তোয়ালে সরবরাহ করত । এ ছাড়া তার আর একটি আবিষ্কার যেটিকে প্রাচীন কালের রোবট হিসেবে গন্য করা হয়, সেটি ছিল ওয়াইন সরবরাহকারি একটি মেয়ে রোবট।

১২০৬ সালে তিনি তার সকল সৃষ্টিকর্মগুলো একটি গ্রন্থ (কিতাব ফি মারিফাতিল হিয়ালিল হানদাসিয়্যাহ) আকারে সংকলন করেন। গ্রন্থটি ছিলো তার সকল আবিষ্কার এর তত্ত্ব এবং ব্যবহারিক প্রয়োগের এর সংক্ষিপ্ত বিবরন। বিট্রিশ প্রকৌশলী ও ইসলামিক ঐতিহাসিক ডোনাল্ড আর হিল এই বইটি প্রসঙ্গে বলেছেন, `আল-জাজারির সৃষ্টিকর্মগুলো বাদ দিয়ে আধুনিক প্রকৌশল বিদ্যার ইতিহাস রচনা করা সম্ভব নয়। কিতাব ফি মারিফাতিল হিয়ালিল হানদাসিয়্যাহ গ্রন্থটি প্রকৌশল বিদ্যার এক ঐতিহাসিক সংযোজন। বইটিতে আল-জাজারির উদ্ভাবিত পঞ্চাশটি ডিভাইসের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। তাকে রোবটিক্স এবং স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের জনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।’

ইবনে আল-হায়সাম

তিনি দর্শনানুভূতির ব্যাখ্যার সর্বপ্রথম প্রমাণ দেন যে আলো কোনো বস্তু থেকে প্রতিফলিত হয়ে চোখে আসে বলেই সেই বস্তুটি দৃশ্যমান হয়। এছাড়াও তিনি দেখান যে দর্শনানুভূতির কেন্দ্র চোখে নয়, বরং মস্তিষ্কে। তাঁর এই তত্ত্বের অনুপ্রেরণা আসে গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের কাছ থেকে।

তিনি আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অন্যতম প্রাচীন প্রবক্তা। তার মতে তত্ত্ব ও অনুমান অবশ্যই পরীক্ষণের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে। রেনেসাঁর পণ্ডিতদের পাঁচ শতাব্দী পূর্বেই তিনি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেন। এজন্য তাকে বিশ্বের ‘প্রথম সত্যিকারের বিজ্ঞানী’ বলা হয়। তার ধারণা থেকেই ক্যামেরা ও সিনেমার আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে।

ফরাসি ইতিহাসবিদ আবুল হাসান বায়হাকি তাঁকে ‘দ্বিতীয় টলেমি’ এবং জন পেকহ্যাম তাঁকে ‘দ্য ফিজিসিস্ট’ নামে অভিহিত করেন।

ইবনে ফিরনাস

তিনি আল-মাকাতা নামক জলঘড়ির নকশা করেন। স্বচ্ছ কাচ নির্মাণের জন্য যন্ত্রের নকশাও প্রণয়ন করেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানের জন্য প্ল্যানিস্ফিয়ার নামক যন্ত্র ও পাঠের উপযোগী লেন্স প্রস্তুত করেন। গ্রহ-নক্ষত্রের ঘূর্ণন প্রদর্শনের জন্য কার্যকর মডেলও তিনি তৈরি করেন।

তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ছিল পাথরের স্ফটিক কাটার প্রক্রিয়া। এর ফলে স্পেন কোয়ার্টজ কাটার জন্য মিশরের উপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্তি পায়। 

তিনি আকাশে উড়ার প্রচেষ্টার জন্যও পরিচিত। বলা হয় তিনি একজোড়া পাখার সাহায্যে আকাশে উড়েছিলেন। এই ধারণার উপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে বিমান তৈরি হয়।

আবুল কাশেম আল-যাহরাভি

তিনি শল্যচিকিৎসার ওপর ৩০ খণ্ডের বিশাল বিশ্বকোষ লিখেন। তিনি ক্যাটগাট (পশুর অন্ত্র থেকে তৈরি সুতা) ব্যবহার করে শরীরের অভ্যন্তরীণ সেলাই এবং প্রায় ২০০টিরও বেশি অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম আবিষ্কার করেন। তাকে শল্য চিকিৎসার জনকও বলা হয়।

মধ্যযুগ থেকে রেনেসাঁ পর্যন্ত ইউরোপের সার্জনদের জন্য তার বই ছিল প্রধান নির্দেশিকা। আধুনিক সার্জারিতে তার আবিষ্কৃত অনেক সরঞ্জাম আজও ব্যবহৃত হয়।

মরিয়াম আল-আস্ত্রোলোবি

তিনি একজন দক্ষ 'অ্যাস্ট্রোল্যাব' বা শ্বেতসার নির্মাতা ছিলেন। এটি ছিল এমন এক জটিল যন্ত্র যা দিয়ে সহজেই সময় গণনা, তারার অবস্থান এবং অক্ষাংশ নির্ধারণ করা যেত।

মহাকাশ বিজ্ঞান বা নেভিগেশনে যেমন: ঘড়ি, স্যাটেলাইট, কম্প্যাস ইত্যাদি আবিষ্কারে তার গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তার তৈরি যন্ত্রের মাধ্যমেই তৎকালীন সময়ে সমুদ্রযাত্রা ও সময় নির্ধারণ নিখুঁত হয়েছিল।

আল-খাওয়ারেজমী

তাকে বীজগণিতের জনক বলা হয়। তিনি গণিতের নতুন শাখা 'আল-জাবর' বা বীজগণিত উদ্ভাবন করেন। তার নাম থেকেই আধুনিক 'অ্যালগরিদম' শব্দটির উৎপত্তি। তিনি হিন্দু-আরবি সংখ্যা পদ্ধতি ও শূন্যের ব্যবহারকে জনপ্রিয় করেন।

কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং উচ্চতর গণিত আজ যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, আল-খাওয়ারেজমীর অ্যালগরিদম ও বীজগণিত ছাড়া তা সম্ভব হতো না।

ইবনে সিনা

তার বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-কানুন ফিত-তিব্ব' চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে অত্যন্ত প্রভাবশালী গ্রন্থ। তিনি কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা, মানসিক রোগের চিকিৎসা এবং সংক্রামক রোগ নিয়ে গবেষণা করেন।

১৭শ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপের প্রধান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তার লিখিত বই প্রধান পাঠ্যবই হিসেবে পড়ানো হতো। তাকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রধান পথপ্রদর্শক গণ্য করা হয়।

জাবির ইবনে হাইয়ান

তাকে রসায়ন শাস্ত্রের জনক বলা হয়। তিনি রসায়নকে জাদুবিদ্যা থেকে বিজ্ঞানে রূপান্তর করেন। তিনি পরিস্রাবণ, ঊর্ধ্বপাতন এবং কেলাসন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এ ছাড়া সালফিউরিক ও নাইট্রিক অ্যাসিডের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিকের সংশ্লেষণ করেন।

ল্যাবরেটরিতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পদ্ধতি তিনিই প্রথম জনপ্রিয় করেন, যা ছাড়া আধুনিক রসায়ন চর্চা সম্ভব হতো না।

ওএফএফ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।