কোন দিকে যাবে আগামীর বাংলাদেশ?

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ১১:৫৬ এএম, ১১ মার্চ ২০২৬
রহমান মৃধা

আদর্শ সমাজে নেতৃত্ব নির্ধারিত হওয়ার কথা মানুষের যোগ্যতা, সততা এবং চরিত্রের ভিত্তিতে। কিন্তু বাস্তবতা প্রায়ই ভিন্ন ছবি তুলে ধরে। বাংলাদেশেও বহু ক্ষেত্রে ক্ষমতার পথ তৈরি হয় যোগ্যতার মাধ্যমে নয়, বরং বংশপরিচয়ের মাধ্যমে। এটি কেবল রাজনৈতিক সমস্যা নয়; এটি সামাজিক ও নৈতিক সংকট, যার প্রভাব প্রজন্মের ভবিষ্যতের ওপর গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়।

ইতিহাসের ছায়া: জন্ম বনাম যোগ্যতা

মানবসভ্যতার ইতিহাস দেখায়, জন্মপরিচয়কে সামাজিক মর্যাদার মূল ভিত্তি বানানোর প্রবণতা নতুন নয়। প্রাচীন ভারতে বর্ণব্যবস্থা প্রথমে পেশাভিত্তিক দক্ষতা সংরক্ষণের ধারণা থেকে গড়ে উঠেছিল। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র, প্রতিটি বর্ণ সমাজে কাজের বণ্টন নিশ্চিত করেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পেশা হয়ে গেলো জন্মনির্ভর, জন্ম হয়ে গেলো ভাগ্যনির্ধারক। সামাজিক গতিশীলতা থেমে গেল, নিম্নবর্ণের মানুষের অগ্রগতির পথ সংকুচিত হলো।

দক্ষিণ এশিয়ার বহু মানুষ সামাজিক মর্যাদা ও সমতার আশায় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ইসলামের শিক্ষা, মানুষে মানুষে সমতা, একটি নতুন মুক্তির পথ দেখিয়েছিল। তবে ধর্মীয় পরিবর্তনও সমাজের গভীর বৈষম্য মুছে দিতে পারেনি। কারণ বৈষম্য কেবল ধর্মীয় নয়; সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেও প্রোথিত থাকে।

উপনিবেশিক যুগে ব্রিটিশ শাসন বিদ্যমান বিভাজনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। বিভক্ত সমাজ শাসন করা সহজ। প্রশাসনিক সুবিধা, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিনিধিত্বে বৈষম্য, সবই তাদের নীতি বাস্তবায়নের অংশ ছিল। এই প্রভাব আজও আমাদের রাজনীতি, প্রশাসন ও সামাজিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত।

স্বাধীনতা এবং সীমিত পরিবর্তন

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব বাংলার মানুষ দ্রুতই উপলব্ধি করে যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে তাদের স্থান সীমিত। ভাষা, বাজেট, সামরিক ও প্রশাসনিক প্রতিনিধিত্বে বৈষম্য স্পষ্ট। দীর্ঘ অবিচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের চূড়ান্ত রূপ ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীন বাংলাদেশ জন্ম নেয় সমতা, মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রত্যাশা নিয়ে।

কিন্তু স্বাধীনতার পরও সমাজ সম্পূর্ণভাবে বৈষম্যমুক্ত হতে পারেনি। রাজনৈতিক বংশতন্ত্র ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নেতৃত্ব পারিবারিক উত্তরাধিকারের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হচ্ছে, দলীয় কাঠামো দুর্বল হচ্ছে, সমালোচনার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। এর সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, স্বজনপ্রীতি এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ যুক্ত হয়েছে। ফলে সমাজের বিভিন্ন পেশায়ও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়—আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা ব্যবসায়ীর সন্তান একই পেশায় প্রবেশ করছে। দরিদ্র পরিবারের প্রতিভাবান সন্তানরা সমান সুযোগ না পেলে সামাজিক গতিশীলতা স্থবির হয়ে যায়।

নতুন প্রজন্মের ভূমিকা

বাংলাদেশের তরুণরা ইতিহাসের সবচেয়ে তথ্যসচেতন প্রজন্ম। তারা জানে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মেধা কীভাবে মূল্যায়িত হয়, প্রতিযোগিতা কীভাবে কাজ করে এবং উদ্ভাবন কীভাবে জাতিকে এগিয়ে নেয়। কিন্তু যদি তারা এমন কাঠামোর মুখোমুখি হয় যেখানে পরিচয় মেধার চেয়ে বড়, তবে হতাশা এবং মনোবলহীনতা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক।

এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত দিক আছে। আমি নিজে বাংলাদেশি সত্ত্বেও বিশ্ব নাগরিকত্বের যোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছি। সেই সুযোগ ও সক্ষমতার ফলে আমার সন্তানরা বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশের অবস্থানকে স্বীকৃতি দিচ্ছে তাদের কর্মের মাধ্যমে। এটি নতুন প্রজন্মের জন্য এক বিরাট অনুপ্রেরণা। তারা দেখছে, জন্ম কোথায় বা পরিচয় কেমন, তা নয়; কাজ, মেধা এবং নৈতিকতা সত্যিকারের পরিচয় নির্ধারণ করে।

প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক শিক্ষা

গভীর বিশ্লেষণ দেখায়, যে সমাজ যোগ্যতা, সততা ও দক্ষতাকে মূল্য দেয়, সেই সমাজ দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল, উদ্ভাবনী এবং গণতান্ত্রিক হয়। যে সমাজ বংশপরিচয়কে বড় করে, সেখানে গণতন্ত্র ধীরে ধীরে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। নেতৃত্ব যদি জনগণের আস্থার দায়িত্ব না হয়ে পারিবারিক উত্তরাধিকারে পরিণত হয়, তবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সংকুচিত হয়।

তবে প্রজন্মের সক্রিয়তা ও নৈতিক কর্মের মাধ্যমে পরিবর্তন সম্ভব। শক্তিশালী দলীয় কাঠামো, স্বচ্ছ প্রার্থী বাছাই, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এবং সমান সুযোগ, এই কাঠামোগত সংস্কার তরুণদের নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ দেবে।

চূড়ান্ত প্রশ্ন

আজকের প্রশ্ন সরল, কিন্তু গভীরতা অসীম: একটি দেশের ভবিষ্যৎ কি নির্ধারিত হবে মানুষের ডিএনএ দিয়ে, নাকি তার যোগ্যতা, সততা ও চরিত্র দিয়ে?

বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম এই প্রশ্নের উত্তর শুধু লিখবে না। তারা তাদের কর্ম, উদ্ভাবন এবং নৈতিক সাহস দিয়ে সেটি বাস্তবায়ন করবে। এবং তখন দেখবে, বাংলাদেশ পরিবারতন্ত্রে সীমাবদ্ধ নয়, নাগরিকত্বে এবং রাষ্ট্রচিন্তায় উন্মুক্ত, যেখানে মেধা, সততা এবং প্রজ্ঞাই নেতৃত্ব নির্ধারণ করবে।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
[email protected]

এমআরএম/এমএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]