সাফা পাহাড় থেকে ঐতিহাসিক আহ্বান

ইসলাম ডেস্ক
ইসলাম ডেস্ক ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:২৫ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
সাফা পর্বত থেকে ঐতিহাসিক আহ্বান ছবি: পিক্সাবে

আহমাদ সাব্বির

নবুওয়াতের সূচনালগ্নে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া হতো অত্যন্ত গোপনে ও সীমিত পরিসরে। প্রথম তিন বছর মহানবী (সা.) নীরবে, সতর্কতার সঙ্গে নিকটাত্মীয় ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মাঝে আল্লাহর একত্ববাদের আহ্বান পৌঁছে দেন। কারণ তৎকালীন মক্কার সমাজ ছিল মূর্তিপূজা, গোত্রীয় অহংকার ও সামাজিক বৈষম্যে পরিপূর্ণ। এমন পরিবেশে প্রকাশ্য দাওয়াত দেওয়া মানে ছিল প্রবল বিরোধিতা ও নির্যাতনের মুখোমুখি হওয়া। কিন্তু ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা কিছু মানুষের ধর্ম নয়; এটি বিশ্বজনীন সত্যের বাণী। তাই নির্ধারিত সময়ে আল্লাহ তাআলার নির্দেশ এলো, তুমি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছো তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করো এবং মুশরিকদের পরোয়া করো না। (সুরা হিজর: ৯৪)

আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে এক সকালে মহানবী (সা.) মক্কার ঐতিহাসিক সাফা পাহাড়ে আরোহণ করেন। আরবদের প্রাচীন প্রথা ছিল—কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা বিপজ্জনক সংবাদ জানাতে হলে কোনো উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে সব গোত্রকে আহ্বান করা। এই সামাজিক রীতিকে অবলম্বন করেই নবীজি (সা.) মক্কাবাসীকে ডাকলেন।

লোকেরা সমবেত হলে তিনি প্রথমেই তাদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রাখলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি আমাকে সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত বলে জানো? সবাই একবাক্যে স্বীকার করল, আপনি ‘আল-আমিন, আপনি কখনো মিথ্যা বলেননি। এরপর তিনি একটি কাল্পনিক উদাহরণ দিলেন, আমি যদি বলি, এই পাহাড়ের পেছনে শত্রুর বাহিনী আক্রমণের জন্য প্রস্তুত, তোমরা কি বিশ্বাস করবে? তারা বলল, আপনি বললে আমরা অবশ্যই বিশ্বাস করবো।

এই স্বীকৃতির পর তিনি প্রকৃত বার্তা তুলে ধরলেন। তিনি বললেন, আমি তোমাদের এক কঠিন শাস্তির পূর্বাভাস দিচ্ছি। তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত করো, তার সঙ্গে কাউকে শরিক করো না।

এই আহ্বান ছিল আরবের বহুদেবতাবাদী সমাজে এক বিপ্লবী ঘোষণা। এতে তাদের ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো কেঁপে উঠল। ফলে সঙ্গে সঙ্গেই বিরোধিতা শুরু হলো।

আবু জাহল ও আবু লাহাব ছিলেন এ বিরোধিতার অগ্রনায়ক। আবু লাহাব তাচ্ছিল্য করে বলেছিলেন, তোমার সর্বনাশ হোক! এ জন্যই কি আমাদের ডেকেছো?

এ ঘটনা প্রমাণ করে, সত্যের ঘোষণা কখনো শত্রুহীন হয় না। বিশেষ করে যখন সেই সত্য মানুষের দীর্ঘদিনের ভ্রান্ত বিশ্বাস ও স্বার্থে আঘাত করে। মক্কার নেতারা বুঝতে পেরেছিল, ইসলামের তাওহিদের শিক্ষা তাদের ক্ষমতা ও আধিপত্যের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেবে। তাই তারা কটুক্তি, বিদ্রূপ, সামাজিক বয়কট ও নির্যাতনের পথ বেছে নেয়।

নবুয়তের পর মহানবী (সা.) মক্কায় মোট তেরো বছর অবস্থান করেন। এই সময়কাল ছিল ধৈর্য, ত্যাগ ও সংগ্রামের যুগ। প্রকাশ্য দাওয়াতের পর নির্যাতন বহুগুণে বেড়ে যায়। তবুও নবীজি (সা.) দাওয়াত থামাননি। বরং মক্কার ভেতরে-বাইরে, গোপনে-প্রকাশ্যে সর্বত্র আল্লাহর বাণী তার বান্দাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সংগ্রাম অব্যাহত রাখেন।

এই সময়ে যারা প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করেন, তারা ইতিহাসে ‘আস-সাবিকুনাল আওয়ালুন’ নামে পরিচিত। তারা বিরূপ পরিবেশে সত্য গ্রহণ করে সাহস ও আত্মত্যাগের নজির স্থাপন করেন।

নারীদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন মহানবীর (সা.) সহধর্মিণী হযরত খাদিজা (রা.)। তিনি শুধু প্রথম বিশ্বাসীই নন, বরং নবীজির কঠিন সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ সহায়ক। পুরুষদের মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) যিনি পরবর্তীতে ইসলামের প্রথম খলিফা হন। শিশুদের মধ্যে হযরত আলী (রা.) এবং দাসদের মধ্যে জায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) প্রথম ইমান আনেন।

এরপর একে একে আরও অনেকেই ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন,

  • বিলাল ইবনে রাবাহ
  • খাব্বাব ইবনে আরত
  • উসমান ইবনে আফফান
  • যুবায়ের ইবনে আওয়াম
  • আবদুর রহমান ইবনে আওফ
  • সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস
  • তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ
  • আবু উবাইদাহ ইবনে জাররাহ
  • আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ
  • জাফর ইবনে আবু তালিব
  • আবু যর গিফারি
  • আম্মার ইবনে ইয়াসির
  • সুমাইয়া বিনতে খাইয়াত

ওএফএফ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।