মানুষের মর্যাদা, দায়িত্ব ও জীবনের লক্ষ্য
আহমাদ সাব্বির
মানুষ আল্লাহ তায়ালার এক বিশেষ ও মর্যাদাবান সৃষ্টি। কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে মানুষকে বলা হয়েছে আশরাফুল মাখলুকাত—সৃষ্টির সেরা। আল্লাহ মানুষকে এমন কিছু গুণ ও বৈশিষ্ট্য দান করেছেন, যা অন্য কোনো সৃষ্টি লাভ করেনি। মানুষ চিন্তা করতে পারে, বিশ্লেষণ করতে পারে, উদ্ভাবন করতে পারে, ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে এবং নিজের মনের ভাব স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো মানুষকে শুধু অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করেনি; বরং তাকে দায়িত্বশীল এক সত্তায় পরিণত করেছে।
মানুষের জীবনযাত্রার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মানুষের জীবন ক্রমাগত পরিবর্তন ও বিকাশের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। এক সময় যে মানুষ অন্ধকারে বাস করত, আজ সে বিদ্যুতের আলোয় পৃথিবীকে আলোকিত করেছে। এক সময় যোগাযোগ ছিল দুরূহ ও সময়সাপেক্ষ, আজ আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে মুহূর্তেই দূরদেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছে। অথচ পশু-পাখির জীবনযাত্রায় হাজার বছরেও তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। বাঘ-সিংহ আজও বনে-জঙ্গলেই বাস করে, যেমনটি তারা শত শত বছর আগে করত। এই পার্থক্য প্রমাণ করে—মানুষের মধ্যে এমন কিছু যোগ্যতা রয়েছে, যা আল্লাহ বিশেষভাবে শুধুু মানুষকে দান করেছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই গুণ ও যোগ্যতাগুলো কি দায়িত্বহীন? আল্লাহ কি মানুষকে এসব দিয়েই ছেড়ে দিয়েছেন? বাস্তব জীবনের একটি সাধারণ উদাহরণ থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। কেউ যখন একটি সম্মানজনক পদ লাভ করে, তখন সেই পদের সঙ্গে দায়িত্বও আসে। দায়িত্ব পালন না করলে সেই পদ তার সম্মানের কারণ না হয়ে লাঞ্ছনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক তেমনি, আল্লাহ মানুষকে যে মর্যাদা ও ক্ষমতা দিয়েছেন, তা নিছক গর্বের বিষয় নয়; বরং এর সঙ্গে গভীর দায়িত্ব ও কর্তব্য জড়িত রয়েছে।
কোরআন মাজিদে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, তিনি মানুষকে “সর্বোত্তম গঠনে” সৃষ্টি করেছেন। মুফাসসিরগণের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এটি শুধু দৈহিক সৌন্দর্যের কথা নয়; বরং মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক উৎকর্ষতার কথাও বোঝায়। কিন্তু এই মানুষ যদি তার সৃষ্টিকর্তাকে না চেনে, জীবনের উদ্দেশ্য না বোঝে অথবা জেনেশুনেও আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়, তবে তার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। কোরআন স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে—এমন মানুষকে আল্লাহ “হীনদের হীনতম স্তরে” নামিয়ে দেবেন। তবে যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, তাদের জন্য রয়েছে অবিরাম পুরস্কার।
মানুষ ও পশুর মধ্যে এখানেই মৌলিক পার্থক্য। পশু-পাখি মৃত্যুর পর হিসাবের মুখোমুখি হবে না; কিন্তু মানুষকে তার প্রতিটি কাজের জবাব দিতে হবে। যদি মানুষের আখিরাতের পরিণতি শাস্তি হয়, তবে সে পশু-পাখির চেয়েও অধম অবস্থায় পৌঁছবে। কারণ, পশুদের যে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি, সেই দায়িত্ব মানুষ পেয়েছিল—কিন্তু সে তা পালন করেনি।
মানুষের জীবন শুরু হয় চরম অসহায়ত্ব দিয়ে। মাতৃগর্ভ থেকে জন্মের সময় মানুষ কিছুই জানে না, কিছুই বোঝে না। ধীরে ধীরে তার মধ্যে শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, চিন্তাশক্তি ও হৃদয়ের অনুভূতি বিকশিত হয়। এই বিকাশ কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। কোরআন ঘোষণা করে—আল্লাহই মানুষকে এই গুণগুলো দান করেছেন, যাতে মানুষ কৃতজ্ঞ হয়। অর্থাৎ, মানুষের সৃষ্টি ও বিকাশের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর শোকর আদায় করা এবং তাঁর আনুগত্যে জীবন যাপন করা।
কোরআন মানুষকে তার পরিচয় ও জীবনের উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়। মানুষের পরিচয়—সে আল্লাহর সৃষ্টি, আল্লাহর বান্দা। আর তার জীবনের উদ্দেশ্য—আল্লাহর ইবাদত, তাঁর বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা এবং দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা অর্জন করা। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, সমাজ ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো এই সত্যকে সামনে আনে না। আমাদের অনেক কিছু শেখানো হয়, কিন্তু শেখানো হয় না যে—আমরা কারা, কেন এসেছি, কোথায় যাব।
আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা মানুষের সামনে এমন এক চিন্তাধারা উপস্থাপন করেছে, যেখানে পার্থিব ভোগই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। “খাও, দাও, ভোগ করো”—এই দর্শন আমাদের জীবনবোধকে গ্রাস করেছে। ফলে মানুষ তার প্রকৃত উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে পশুসম জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। অথচ মানুষ পৃথিবীতে এসেছে আল্লাহর খলিফা হিসেবে—ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য, আল্লাহর বিধান অনুযায়ী নিজেকে ও সমাজকে পরিচালনা করার জন্য।
এই প্রেক্ষাপটে কোরআন ও সুন্নাহর গুরুত্ব অপরিসীম। কোরআন নাজিল হয়েছে মানুষকে হিদায়াত দেওয়ার জন্য—সঠিক পথের সন্ধান দেওয়ার জন্য। সুরা ফাতেহায় আল্লাহ আমাদের শেখান প্রতিদিন এই দোয়া করতে—“আমাদের সরল পথে পরিচালিত করুন।” এই দোয়া প্রমাণ করে যে, হেদায়াত ছাড়া মানুষের কোনো গুণই তাকে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। যেমন—ভুল পথে চলা কাফেলা যত পরিশ্রমই করুক, সে কখনো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না।
কোরআন তিন শ্রেণির মানুষের কথা উল্লেখ করেছে—একদল যাদের ওপর আল্লাহর নেয়ামত বর্ষিত হয়েছে, আর দুইদল যারা পথভ্রষ্ট বা আল্লাহর গজবে পতিত। আমাদের প্রার্থনা হলো—আমরা যেন প্রথম দলের অন্তর্ভুক্ত হই। তারা হলেন নবী-রাসূলগণ, সাহাবায়ে কেরাম, শহীদ ও সৎকর্মশীল মানুষ। তাদের পথ অনুসরণ করলেই জীবনের সার্থকতা পাওয়া সম্ভব।
ওএফএফ