লাইলাতুল কদরে ক্ষমা লাভের ২ শর্ত

ইসলাম ডেস্ক
ইসলাম ডেস্ক ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩:০৫ পিএম, ১২ মার্চ ২০২৬
লাইলাতুল কদরে ক্ষমা লাভের শর্ত ছবি: ফ্রিপিক

ইলিয়াস মশহুদ

ইবাদতের বসন্তকাল হচ্ছে রমজান মাস। রাসুল (সা.) তার মদিনার জীবনে প্রায় প্রতি বছর রমজানের শেষ ১০ দিন নিয়মিত ইতেকাফ করেছেন। আর এই দশকেই রয়েছে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম ও মহিমান্বিত একটি রজনী; যাকে লাইলাতুল কদর বলা হয়।

লাইলাতুল কদর বা মহিমান্বিত রজনী হলো উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এক অনন্য, অতুলনীয় এবং সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার। এই একটিমাত্র রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও বেশি সাওয়াব অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়। আল্লাহ তাআলা তার কালামে পাকে এই রাতের মর্যাদা বর্ণনা করেছেন।

এই রাতে ইবাদতের মাধ্যমে গুনাহ মাফের বিষয়ে নবীজিও (সা.) নিশ্চিত আশ্বাস দিয়েছেন। সুতরাং এই রাত হলো ইবাদতের পাশাপাশি পাপ মোচন, ভাগ্য পরিবর্তন ও আল্লাহর নৈকট্যলাভের এক বিশেষ সুযোগ। এই সুযোগের সদ্‌ব্যবহার যারা করে, তারাই প্রকৃত বুদ্ধিমান।

লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিমে একটি পূর্ণাঙ্গ সুরা নাজিল করেছেন, যা ‘সুরা কদর’ নামে পারিচিত। এই সুরায় কদরের রাতের মহিমা ও ফজিলত সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, নিশ্চয়ই আমি এটিকে (কোরআনকে) নাজিল করেছি লাইলাতুল কদরে। আর কিসে তোমাকে জানাবে লাইলাতুল কদর কী? (সুরা কদর: ১, ২)

এ দুই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা প্রশ্ন ও উত্তর উভয় মাধ্যমেই লাইলাতুল কদরের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরেছেন।

তারপর আল্লাহ তাআলা বলেন, লাইলাতুল কদর হলো হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। (সুরা কদর: ৩)

অর্থাৎ লাইলাতুল কদরের ইবাদত হাজার বছরের ইবাদতের চেয়েও বেশি মূল্যবান।

তারপর আল্লাহ তাআলা বলেন, এই রাতে ফেরেশতাগণ ও জিবরাইল তাদের রবের অনুমতিক্রমে সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে অবতরণ করেন। এই রাত পুরোপুরি শান্তি, যা ফজরের উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। (সুরা কদর, আয়াত: ৪-৫)

অর্থাৎ এই রাতে আল্লাহর বহু ফেরেশতা এবং জিবরাইল (আ.) মানুষের কল্যাণের জন্য জমিনে অবতরণ করেন এবং রাতটি শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে আসে।

কুরআনের এসব বর্ণনা হাদিসে বর্ণিত ফজিলতসমূহকে আরও শক্তিশালী করে এবং প্রমাণ করে যে, লাইলাতুল কদর সত্যিই উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য এক অনন্য উপহার। যেমন, এই রাতের ইবাদতের ফজিলত সম্পর্কে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ইমানদার অবস্থায় একনিষ্ঠতার সঙ্গে লাইলাতুল কদরে ইবাদত করে, আল্লাহ তায়ালা তার অতীতের গুনাহ ক্ষমা করে দেন। (সহিহ বুখারি: ১৯০১)

অর্থাৎ লাইলাতুল কদরে আল্লাহ তাআলার ক্ষমা পাওয়ার জন্য নবীজি (সা.) এই হাদিসে দুটি শর্ত উল্লেখ করেছেন:

১. ইমান-আকিদা সঠিক হতে হবে

নবীজি (সা.) প্রথম শর্ত হিসেবে বলেছেন, ইবাদতকারীকে ‘মুমিন’ হতে হবে। এর অর্থ হলো, তার আকিদা বা ধর্মীয় বিশ্বাস অবশ্যই সঠিক হতে হবে। শিরক বা অন্যান্য অপবিশ্বাস কারো অন্তরে থাকলে সে লাইলাতুল কদরের বরকত থেকে বঞ্চিতই থাকবে। 

২. একনিষ্ঠতা ও নিয়ত বিশুদ্ধ হতে হবে

দ্বিতীয় শর্ত হলো ‘ইহতিসাব’, যার অর্থ হলো ইবাদতকারীর নিয়ত সঠিক এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একনিষ্ঠ হতে হবে। যদি নিয়তের মধ্যে রিয়া, লোকদেখানো বা পার্থিব কোনো উদ্দেশ্য এসে যায়, তবে সারা রাত জেগে ইবাদত করা কোনো কাজে আসবে না। ইবাদতের উদ্দেশ্য কেবল আল্লাহর নৈকট্য লাভ হতে হবে।

উল্লেখ্য, উপর্যুক্ত হাদিসে এবং অনুরূপ অন্যান্য হাদিসে যে ইবাদতের ফলে গুনাহ মাফ হওয়ার কথা বলা হয়েছে, তার দ্বারা সাধারণত সগিরা বা ছোট গুনাহ উদ্দেশ্য। কবিরা গুনাহ মাফ করানোর জন্য আলাদাভাবে আন্তরিক তাওবা ও ইসতেগফার করতে হবে।

হুকুকুল ইবাদ বা মানুষের অধিকার সম্পর্কিত গুনাহ মাফ পেতে হলে অবশ্যই তাদের হক আদায় করে দিতে হবে, অথবা যে কোনো উপায়ে তাদের থেকে ক্ষমা করিয়ে নিতে হবে। শুধু নফল ইবাদত দ্বারা হুকুকুল ইবাদ সম্পর্কিত গুনাহ কখনও মাফ হবে না।

এই শর্তগুলো যদি আমরা পূরণ করি, তবেই লাইলাতুল কদরের পূর্ণ ফজিলত আমরা লাভ করব।

লাইলাতুল কদরের বিশেষ দোয়া

লাইলাতুল কদরে ক্ষমা চাওয়ার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি, তাই নবীজি (সা.) এ রাতে আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা চেয়ে পড়ার জন্য একটি বিশেষ দোয়া শিখিয়েছেন। দোয়াটি হলো:

اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّى

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুওউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নী

অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে পছন্দ করেন। কাজেই হে দয়াময়, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৭৪)

রমজানের কোন রাতটি লাইলাতুল কদর?

নবীজি (সা.) লাইলাতুল কদর নির্দিষ্ট করে দেননি, তবে তার উম্মতকে এই বরকতময় রাত সন্ধান করার জন্য সুনির্দিষ্ট পথ দেখিয়েছেন। আম্মাজান আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত নবীজি (সা.) বলেছেন, তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ করো (অর্থাৎ ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখের রাত)। (সহিহ বুখারি: ২০১৭)

ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবীজির (সা.) কতিপয় সাহাবিকে স্বপ্নের মাধ্যমে রমজানের শেষের সাত রাতে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়। এটা শুনে নবীজি (সা.) বললেন, আমাকেও তোমাদের অনুরূপ স্বপ্ন দেখানো হয়েছে। (তোমাদের দেখা ও আমার দেখা) শেষ সাত দিনের ক্ষেত্রে মিলে গেছে। অতএব, যে ব্যক্তি এর সন্ধান প্রত্যাশী, সে যেন শেষ সাত রাতে সন্ধান করে। (সহিহ মুসলিম: ১১৬৫)

উবাদা ইবনে সামেত (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে আছে; তিনি বলেন, একবার নবীজি (সা.) আমাদেরকে লাইলাতুল কদরের (নির্দিষ্ট তারিখ) অবহিত করার জন্য বের হয়েছিলেন। তখন দুজন মুসলিম ঝগড়া করছিল। তা দেখে তিনি বললেন, আমি তোমাদেরকে লাইলাতুল কদরের সংবাদ দিতে বের হয়েছিলাম, তখন অমুক অমুক ঝগড়া করছিল, ফলে তার (নির্দিষ্ট তারিখের) পরিচয় হারিয়ে যায়। সম্ভবত এর মধ্যে তোমাদের জন্য কল্যাণ নিহিত রয়েছে। (সহিহ বুখারি: ২০২৩)

ওএফএফ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।