আল্লাহর ওলিদের কেরামত, কিছু আশ্চর্য ঘটনা
আল্লাহর ওলি কারা?
আল্লাহর ওলি তারাই যারা মুমিন ও মুত্তাকী। প্রত্যেক মুমিন ও পরহেজগার ব্যক্তিই তার ইমান ও তাকওয়ার পরিমাণ অনুযায়ী আল্লাহর ওলি। আল্লাহ তাআলা বলেন, শুনে রেখো, আল্লাহর বন্ধুদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না; যারা ইমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য সুসংবাদ রয়েছে পার্থিব জীবনে ও পরকালে। (সুরা ইউনুস: ৬২-৬৪)। ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন, এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিচ্ছেন যে, তাঁর ওলি বা বন্ধু হলেন তারাই যারা ইমান এনেছে এবং আল্লাহ তাআলার নির্দেশ অনুযায়ী তাকওয়া অবলম্বন করে।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলির সঙ্গে শত্রুতা করবে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিচ্ছি। (সহিহ বুখারি) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে হাজার (রহ.) বলেন, আল্লাহর ওলি বলে সেই ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে যিনি আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন, তাঁর আনুগত্যে অবিচল এবং তাঁর ইবাদতে একনিষ্ঠ।
মুজিজা ও কেরামতের মধ্যে পার্থক্য
মুজিজা হলো নবুয়্যত ও রেসালাতের অলৌকিক নিদর্শন যার মাধ্যমে অনেক সময় অবিশ্বাসীদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে কেরামত হলো আল্লাহর ওলিদের থেকে প্রকাশিত অলৌকিক ঘটনা, যা চ্যালেঞ্জের উদ্দেশ্যে নয় বরং আল্লাহ তাআলা তাদের সম্মানার্থে এ ঘটনাগুলো ঘটিয়ে থাকেন। ইবনে উসাইমিন (রহ.) বলেন, কেরামত হলো এমন অলৌকিক ঘটনা, যা আল্লাহ তাআলা কোনো ওলির হাতে তার সমর্থন, সাহায্য, অবিচলতা অথবা দ্বীনের বিজয়ের জন্য প্রকাশ করেন।
আল্লাহর ওলিদের কেরামত সত্য হওয়ার বিষয়টি উম্মতের পূর্বসূরিদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আলেমরা কোরআন ও সুন্নাহর বহু দলিলের ওপর ভিত্তি করে কেরামত সত্য হওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছেন। কোরআন ও সুন্নাহ থেকে কিছু দলিল আমরা এখানে উল্লেখ করছি।
কোরআনে বর্ণিত কেরামত
আল্লাহ তাআলা মারিয়ামের (আ.) ঘটনায় বলেন, যখনই জাকারিয়া মেহরাবে তার কাছে প্রবেশ করতেন, তখনই তার কাছে খাবার দেখতে পেতেন। তিনি বললেন, হে মারিয়াম! তোমার কাছে এসব কোথা থেকে এলো? মারিয়াম বললেন, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে। নিশ্চয়ই আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমিত রিজিক দান করেন। (সুরা আলে ইমরান: ৩৭)
জাকারিয়া (আ.) মারিয়ামের (আ.) কাছে গেলে এমন সব ফল দেখতে পেতেন যা তখন বাজারে বা অন্য কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। এটা ছিল মারিয়ামের (আ.) কেরামত।
নবী ইবরাহিমের (সা.) এর স্ত্রী সারার ঘটনায় আল্লাহ তাআলা বলেন, আর তার স্ত্রী দাঁড়ানো ছিল, সে হেসে উঠল। তখন আমি তাকে সুসংবাদ দিলাম ইসহাকের ও ইসহাকের পরে ইয়াকুবের। সে বলল, হায়, কী আশ্চর্য! আমি সন্তান প্রসব করব, অথচ আমি বৃদ্ধা, আর এ আমার স্বামীও বৃদ্ধ! তারা বলল, আল্লাহর সিদ্ধান্তে তুমি আশ্চর্য হচ্ছ? হে নবী পরিবার, তোমাদের ওপর রয়েছে আল্লাহর রহমত ও বরকত। নিশ্চয় তিনি প্রশংসিত সম্মানিত। (সুরা হুদ: ৭১-৭৩)
এই ঘটনায় অতি বৃদ্ধা অবস্থায়ও সারার (আ.) সন্তান হওয়া ছিল তার কেরামত।
আসহাবে কাহাফের ঘটনায় আল্লাহ তাআলা বলেন, তুমি কি মনে কর, গুহা ও রাকীমের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর? (সুরা কাহাফ: ৯)
এরপর তিনি তাদের ইমান, হেদায়েত ও অবিচলতার বর্ণনা দিয়ে বলেন, আমি তোমার কাছে তাদের সঠিক বৃত্তান্ত বর্ণনা করছি: তারা ছিল কয়েকজন যুবক, তারা তাদের রবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিল এবং আমি তাদের সৎ পথে চলার শক্তি বৃদ্ধি করেছিলাম। আর তাদের অন্তর মযবুত করে দিয়েছিলাম যখন তারা (মুশরিক রাজা ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে) দাঁড়িয়ে গেল তখন বলল, আমাদের প্রতিপালক তো তিনিই যিনি আসমানসমূহ জমিনের প্রতিপালক। আমরা কখনো তাঁকে ত্যাগ করে অন্য কোনো ইলাহকে ডাকব না। যদি আমরা ডাকি তাহলে মহা অপরাধের কথাই বলা হবে। (সুরা কাহাফ: ১৩, ১৪)
তারপর বহু কালের জন্য আল্লাহ তাআলা তাদের ঘুমন্ত রাখেন। আল্লাহ বলেন, আমি গুহায় তাদের ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে দিলাম অনেক বছরের জন্য। (সুরা কাহাফ: ১১)
এই ঘটনায় আসহাবে কাহাফের বহুকাল ধরে লোকচক্ষুর অন্তরালে ঘুমন্ত থাকা ছিল তাদের কেরামত।
সাহাবি ও তাবেঈদের কেরামত
আল্লাহ তাআলা তাঁর ওলিদের বিভিন্ন কেরামত ও ফজিলত দিয়ে সম্মানিত করেন। নবীদের পরে আল্লাহর শ্রেষ্ঠ অলি হলেন নবীজির (সা.) সাহাবিগণ। সীরাত ও ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে সাহাবি ও তাদের অনুসারী তাবেঈগণের অসংখ্য কেরামতের ঘটনা রয়েছে।
আনাস বিন মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আব্বাদ ইবনে বিশর ও উসাইদ বিন হুযাইর (রা.) এক অন্ধকার রাতে রাসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দরবার থেকে বের হন। হঠাৎ তারা লক্ষ করলেন তাদের লাঠি আলো দিয়ে পথ চলতে সাহায্য করছে। প্রথমে তাদের একজনের লাঠি আলো দিচ্ছিল। তারপর যখন তারা আলাদা হয়ে যান, তখন প্রত্যেকের লাঠি আলো দিতে শুরু করে! (সহিহ বুখারি: ৪৬৫)
শফিউর রহমান মোবারকপুরী (রহ.) তুহফাতুল আহওয়াযী গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, ইমরান ইবনে হুসাইন (রা.) সাহাবিদের মধ্যে অন্যতম আলেম ছিলেন এবং ফেরেশতারা তাকে সালাম দিতেন। তিনি আরও বর্ণনা করেছেন, সালমান ও আবু দারদা (রা.) যখন এক পাত্রে খাবার খাচ্ছিলেন, তখন সেই পাত্র বা পাত্রের খাবার তাসবিহ পাঠ করেছিল। তিনি আরও বর্ণনা করেছেন, খুবাইব ইবনে আদি (রা.) যখন মক্কায় বন্দি ছিলেন, তখন তাকে এমন আঙ্গুর খেতে দেখা যেত যা তখন মক্কায় পাওয়া যেত না।
আবু মুসলিম আল-খাওলানি (রহ.) সম্পর্কে ইমাম জাহাবী (রহ.) ও ইবনে আসাকির (রহ.) বলেন, তিনি তাবেঈদের সরদার ও যুগের শ্রেষ্ঠ জাহেদ ছিলেন। নবীজির জীবনেই ইসলাম গ্রহণ করেন কিন্তু নবীজির (সা.) সাক্ষাত পাননি। ইয়েমেনে তখন ভণ্ড নবী আসওয়াদ আনসির আবির্ভাব ঘটে, সে আবু মুসলিমকে ধরে এক বিশাল অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করে, কিন্তু আগুন তার কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। আসওয়াদের সঙ্গীরা তাকে বললো, এই লোককে তাড়িয়ে দিন, নইলে আপনার অনুসারীরা বিভ্রান্ত হয়ে যাবে। তিনি যখন মদিনায় এলেন, তখন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) তাকে দেখে জড়িয়ে ধরলেন ও কাঁদলেন। এরপর তাকে আবু বকরের (রা.) পাশে বসিয়ে বললেন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে মুহাম্মদের (সা.) উম্মতের মধ্যে এমন একজনকে না দেখিয়ে মৃত্যু দেননি যার সাথে ইবরাহিম খলিলের মতো আচরণ করা হয়েছে।
কেরামতের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি
আল্লাহর ওলিদের মর্যাদা ও কেরামত নিয়ে অনেকের মধ্যে বাড়াবাড়ি আছে। তারা কেরামতের নামে আল্লাহর ওলিদের মর্যাদাকে আল্লাহর স্তরে নিয়ে গেছেন। তারা দাবি করেন, ওলিরা গায়েব জানেন বা অদৃশ্য থেকে সাহায্য করতে পারেন। এভাবে তারা শিরকে লিপ্ত হয়েছে। অনেকে আবার কেরামতকে পুরোপুরি অস্বীকার করেন। কোরআন ও সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত কেরামতগুলোকেও তারা অস্বীকার করেন। এটাও সঠিক অবস্থান নয়।
সঠিক অবস্থান হলো মধ্যপন্থা যা আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের অবস্থান। আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআত কোরআন ও সুন্নাহ সমর্থিত কেরামতকে বিশ্বাস করে, কিন্তু ওলিদের নিয়ে বাড়াবাড়ি করে না। জাদুটোনা বা ভণ্ডামিকে কেরামত বলে গণ্য করে না।
কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটলেই কাউকে ওলি বলা যাবে না যতক্ষণ না তার আমল কোরআন ও সুন্নাহর সাথে মিলবে। ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) ইউনুস ইবনে আব্দুল আ'লা (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, ইমাম শাফেঈ (রহ.) বলেছেন, যদি কাউকে পানির ওপর দিয়ে হাঁটতে বা আকাশে উড়তে দেখ, তবুও তার কাজ কোরআন-সুন্নাহর মানদণ্ডে বিচার না করে তাকে গ্রহণ করো না।
কেরামতের বিষয়ে আমাদের কর্তব্য হলো মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। জেনে রাখা দরকার, আল্লাহর সব ওলির ক্ষেত্রে কেরামত প্রকাশ পাওয়া জরুরি নয়; অর্থাৎ ওলায়াত বা আল্লাহর বন্ধুত্বের সঙ্গে কেরামত প্রকাশ পাওয়ার কোনো অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক নেই। সবচেয়ে বড় কথা হলো, সর্বোত্তম কেরামত হলো আল্লাহর দ্বীনের ওপর 'ইস্তেকামাত' বা অবিচল থাকা এবং রাসুলের (সা.) সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা।
ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, কেরামতের চূড়ান্ত সীমা হলো ইস্তেকামাত বা দ্বীনের ওপর অবিচলতা। আল্লাহ কোনো বান্দাকে তাঁর প্রিয় ও সন্তোষজনক কাজে সাহায্য করা এবং তাঁর নৈকট্য বৃদ্ধি করার চেয়ে বড় কোনো কেরামতে সম্মানিত করেননি।
সূত্র: ইসলাম ওয়েব
ওএফএফ