বড় পীর আবদুল কাদের জিলানীর (রহ.) প্রেরণাদায়ী জীবন

আহমাদ সাব্বির
আহমাদ সাব্বির আহমাদ সাব্বির , আলেম, লেখক ও অনুবাদক
প্রকাশিত: ০৬:১০ পিএম, ০৪ এপ্রিল ২০২৬
আবদুল কাদের জিলানীর মাজার ছবি: সংগৃহীত

ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু মনীষীর আবির্ভাব ঘটেছে, যারা কেবল ধর্মীয় জ্ঞানচর্চায় সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং মানবজীবনের অন্তঃস্থলে প্রবেশ করে নৈতিকতা, প্রেম, করুণা ও সত্যের আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন। হজরত সৈয়দ আবু মোহাম্মদ আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) নিঃসন্দেহে সেই বিরল শ্রেণির সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বদের একজন। তার সাধনা ও শিক্ষা মাটির মানুষকে মহিমান্বিত করেছে, মানবজীবনকে দিয়েছে নৈতিক দৃঢ়তা ও আধ্যাত্মিক উচ্চতা।

আবদুল কাদের জিলানীর ব্যক্তিত্বকে ঘিরে অগণিত অলৌকিক কাহিনি ও ভক্তিনির্ভর কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। এসব বর্ণনার আড়ালে তার প্রকৃত ঐতিহাসিক ও চিন্তাশীল সত্তাকে অনুধাবন করা সহজ নয়। কেউ তাকে একটি সুফি তরিকার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দেখেছেন, কেউ তার ‘কারামত’-এর দিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে তিনি ছিলেন একজন সমাজসংস্কারক, নীতিবাদী চিন্তাবিদ, শুদ্ধাচারী আলেম ও মানবকল্যাণে নিবেদিত আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। বিখ্যাত সুফি-দার্শনিক ইবনে আরাবী তাকে ‘কুতুব’—অর্থাৎ জাতির নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অক্ষবিন্দু—হিসেবে অভিহিত করেছেন।

হিজরি ষষ্ঠ শতকে মুসলিম বিশ্ব এক গভীর অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। একদিকে রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার লড়াই, অন্যদিকে ধর্মীয় জীবনেও নৈতিক শূন্যতা ও ভণ্ডামি ছড়িয়ে পড়েছিল। বাগদাদ তখন আব্বাসী খিলাফতের রাজধানী—বৈভব ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হলেও একই সঙ্গে দুর্নীতি, বিলাসিতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের ভয়াবহ আখড়া। খলিফা থেকে সাধারণ মানুষ—অধিকাংশের জীবনেই ধর্ম ও নৈতিকতার বাস্তব প্রয়োগ অনুপস্থিত ছিল। এই সংকটময় সময়ে আবদুল কাদের জিলানীর আবির্ভাব মুসলিম সমাজে এক নবজাগরণের সূচনা করে।

তিনি বাগদাদের ‘বাবুল হালবা’ এলাকায় প্রকাশ্যে খুতবা দেওয়া শুরু করেন। তার ভাষা ছিল দৃপ্ত, স্পষ্ট ও নির্ভীক। তিনি খলিফা, কাজী, গভর্নর, ধনী ব্যবসায়ী ও তথাকথিত ধর্মব্যবসায়ী—কারও অন্যায় ও দুর্নীতিকে রেয়াত করেননি। শুরুতে তার শ্রোতা ছিল হাতে গোনা কয়েকজন; কিন্তু তার সত্যনিষ্ঠ ও হৃদয়স্পর্শী বক্তব্য অল্প সময়েই মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেয়। এক সময় তার মজলিসে সত্তর হাজারেরও বেশি মানুষের সমাগম ঘটত, এমন কি খলিফা ও উজিররাও তার নসিহত শোনার জন্য উপস্থিত হতেন।

হযরত আবদুল কাদের জিলানী ৪৭০ হিজরি (১০৭৭ খ্রি.) সালে ইরানের জিলান অঞ্চলের নায়ক নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মভূমির নামানুসারেই তিনি ‘জিলানী’ উপাধিতে পরিচিত হন। পিতৃকুল ও মাতৃকুল—উভয় দিক থেকেই তিনি নবীজির (সা.) বংশধর ছিলেন। তার পিতা আবু সালেহ ছিলেন একজন আলেম ও পরহেজগার ব্যক্তি, আর মাতা ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক ও দৃঢ়চরিত্রের অধিকারী। পারিবারিক পরিবেশেই তার চরিত্রে সত্যবাদিতা, আত্মসংযম ও আল্লাহভীতি গভীরভাবে প্রোথিত হয়।

শৈশবকাল থেকেই আবদুল কাদের ছিলেন শান্ত, বিনয়ী ও জ্ঞানানুরাগী। স্থানীয় মাদ্রাসায় আরবি, ফারসি, কোরআন ও প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের পর মাত্র আঠারো বছর বয়সে তিনি উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে বাগদাদে গমন করেন। সেখানে নিজামিয়া মাদ্রাসায় তিনি তাফসির, হাদিস, ফিকহ, উসুল, দর্শন ও ইতিহাসে অসাধারণ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। এই যাত্রাপথেই তার জীবনের এক স্মরণীয় ঘটনা ঘটে—যা তার সত্যনিষ্ঠা ও মাতৃভক্তির অনন্য দৃষ্টান্ত। দস্যুদের হাতে আক্রান্ত হয়ে সব হারানোর পরও তিনি মায়ের দেওয়া উপদেশ ভঙ্গ না করে সত্যের কথা স্বীকার করেন। এই অকৃত্রিম সত্যবাদিতা দস্যুদের হৃদয় পরিবর্তন করে এবং তারা সৎপথে ফিরে আসে।

যদিও তিনি পুঁথিগত বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন, তবুও তার প্রকৃত আকর্ষণ ছিল মারেফত বা অন্তর্দৃষ্টি-ভিত্তিক আধ্যাত্মিক জ্ঞানের প্রতি। তিনি বাগদাদের সুফি সাধকদের সান্নিধ্যে এসে তাসাউফের গভীর তাৎপর্য অনুধাবন করেন। শেষ পর্যন্ত কঠোর সাধনার পথ বেছে নিয়ে তিনি দীর্ঘ পঁচিশ বছর নির্জনবাসে কাটান—ইবাদত, সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করেন মানবকল্যাণের মহান দায়িত্বের জন্য।

৫২১ হিজরিতে তিনি পুনরায় লোকসমাজে ফিরে এসে প্রকাশ্যে ধর্মপ্রচার শুরু করেন। তার খুতবায় ইসলাম নতুন প্রাণ পায়—মানুষ ধর্মকে আর কেবল আনুষ্ঠানিক বিধান হিসেবে নয়, বরং জীবনের নৈতিক দিশারি হিসেবে উপলব্ধি করতে শেখে। এই কারণেই তাকে ‘মহিউদ্দিন’—অর্থাৎ ইসলামের পুনর্জাগরণকারী—উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তার মানবিক আচরণ, ত্যাগী জীবন ও সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি তাকে ‘গাউসুল আজম’ হিসেবে খ্যাত করে তোলে।

আবদুল কাদের জিলানীর শিক্ষা ছিল গভীরভাবে মানবমুখী। তিনি কেবল নামাজ-রোজার আনুষ্ঠানিকতায় আবদ্ধ ধর্মচর্চার কঠোর সমালোচনা করেন। তার মতে, ইবাদত তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের চরিত্র গঠন করে এবং আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছানোর পথ প্রশস্ত করে। দুনিয়াবী লোভ, ক্ষমতার ভয় ও খ্যাতির আকাঙ্ক্ষাকে তিনি ইমানের প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেন। সমাজে সাম্য ও ন্যায়ের পক্ষে তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা দেন—আপনি প্রাচুর্যের অধিকারী হওয়ার পরও আপনার পাশের মানুষ ক্ষুধার্ত থাকলে তা আপনার ইমানকে অপূর্ণ করে তোলে।

তিনি অলস অদৃষ্টবাদিতা প্রত্যাখ্যান করে কর্মমুখী জীবনদর্শনের কথা বলেন। মানুষের কর্তব্য নিজ দায়িত্ব পালন করা; ফলাফলের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিতে হবে—এটাই ছিল তার শিক্ষা।

জীবনের শেষভাগেও তিনি কঠোর সাধনা ও মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। প্রায় একানব্বই বছর বয়সে ৫৬১ হিজরিতে তার ইন্তেকাল হয়। তার ওফাতের পর তার শিষ্যরা ‘কাদেরিয়া তরিকা’ গড়ে তোলেন, যা আজও মুসলিম বিশ্বে সক্রিয়। ‘ফুতুহুল গায়েব’, ‘ফাতহুর রাব্বানি’ ও ‘কাসিদাতুল গাওসিয়া’সহ তার রচনাবলি মানবতার কল্যাণে চিরকালীন পথনির্দেশ হয়ে আছে।

আবদুল কাদের জিলানী কেবল একজন সুফি সাধক নন—তিনি ছিলেন মানবমুক্তির এক উজ্জ্বল প্রতীক। তার সাধনা মানুষের হৃদয়কে আলোকিত করেছে, সমাজকে দিয়েছে ন্যায় ও করুণার শিক্ষা। তাই বহু যুগ পেরিয়েও তার বাণী আজও মানবতার উত্তরাধিকার হয়ে বেঁচে আছে।

ওএফএফ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।