নোমান আলী খান
কোরআনে যেভাবে ব্যবসার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে
আমাদের নতুন প্রজন্মের মধ্যে উদ্ভাবনের শক্তি আছে, উদ্যোক্তা হওয়ার সম্ভাবনা আছে, নতুন কিছু শুরু করার যোগ্যতা আছে। কিন্তু তাদের মধ্যে তাড়না নেই, তারা বড় পুঁজিপতি ও সরকারের ওপর ভরসা করে বসে থাকে। তরুণরা সৃজনশীল হয়। আল্লাহ সেটা তাদের মধ্যে দিয়ে রেখেছেন। কিন্তু সেই সৃজনশীলতা যদি ব্যবসায়, প্রকৌশলে, নকশায়, উদ্ভাবনে এবং ভালো কাজে না লাগে, তাহলে সেটা মাদকে গিয়ে লাগবে, বিভিন্ন ধরনের উদ্ভট ও বিপথগামী কাজে গিয়ে লাগবে। সৃজনশীলতাকে কোথাও না কোথাও যেতেই হবে। সঠিক দিকে না গেলে ভুল দিকে যাবে।
আমরা এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে আছি। একদিকে আমরা পুঁজিবাদের ফাঁদে আটকা যেটা একটা ক্যান্সারের মতো। অন্যদিকে আমরা এক ধরনের সমাজতন্ত্রের মধ্যে আটকা যেটা শেষ পর্যন্ত মানব প্রকৃতির বিরুদ্ধে। মানুষ এভাবে চলতে পারে না। এটা বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস বাড়িয়ে দেয়।
এ বিষয়ে কোরআন কী বলে? ইসলাম কী বলে? কোরআনের প্রথম উদ্বেগগুলোর একটি হলো অর্থনীতি। আল্লাহ সবার আগে যে বিষয়গুলো চিহ্নিত করেছেন তার একটি হলো অর্থনৈতিক দুর্নীতি। তাহলে এই সমস্যার সমাধান কী যে সমস্যার মুখোমুখি সারা পৃথিবী আজ দাঁড়িয়ে আছে?
সবার আগে, আল্লাহ এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছেন যেখানে যে কোনো ভাবে অর্থ উপার্জন করা যায় না। কিছু বিষয় হারাম অর্থাৎ সেগুলো দিয়ে অর্থ উপার্জন করা যাবে না। জুয়া দিয়ে অর্থ উপার্জন করা যাবে না। মদ ও মাদক দিয়ে অর্থ উপার্জন করা যাবে না। সুদ দিয়ে অর্থ উপার্জন করা যাবে না। এই জিনিসগুলো সমাজকে ধ্বংস করে, সমাজকে কলুষিত করে তাই এগুলো দিয়ে উপার্জন করা যাবে না। পতিতাবৃত্তি বা এই ধরনের কাজ করে অর্থ উপার্জন করা যাবে না।
এটা হলো প্রথম বাধা। দ্বিতীয় বাধা হলো তুমি তোমার ক্রেতাকে যা খুশি তা বিক্রি করতে পারবে না। আল্লাহ বলেছেন, জাহান্নামের সবচেয়ে কঠিন শাস্তি তাদের জন্য যারা চালাকি করে তাদের ক্রেতাদের ঠকায়, ক্রেতা বুঝতেও পারে না। যেমন দুধ দিলে কিন্তু তাতে ২০ শতাংশ পানি মেশালে ক্রেতা বুঝতে পারে না। অথবা কোনো মোবাইল কোম্পানি বলল বিল ১০০ টাকা, কিন্তু ছোট ছোট অক্ষরে কিছু লিখে বিলটা ১২৫ টাকা বানিয়ে দিল। আল্লাহ এই ধরনের প্রতারণায় বাধা দিয়েছেন। তাই কোনো মুসলমান ব্যবসা করলে সে এই পথে যেতে পারবে না, কারণ সে জাহান্নামে যেতে চায় না।
সম্পদ বৃদ্ধি পেলে আল্লাহ জাকাতের একটি ব্যবস্থা রেখেছেন। কেউ মারা গেলে তার সম্পদ উত্তরাধিকার হিসেবে বিতরণ করার বিধান রেখেছেন। কেউ মারা গেলে কী হয়? তার মেয়ে একটু পায়, ছেলে একটু পায়, স্ত্রী একটু পায়, বাবা পায়, মা পায়, বোন পায়, ভাই পায়। ফলে কেউ যদি বিলিয়নিয়ারও হয়, পরবর্তী প্রজন্মে কেউ আর বিলিয়নিয়ার থাকে না। হয়তো মিলিয়নিয়ার হয়, কিন্তু বিলিয়নিয়ার আর না। আর সেই মিলিয়নিয়াররা যখন মারা যায়, তখন আবার বিতরণ হয়, আবার বিতরণ হয়। ফলে সম্পদ এক জায়গায় আটকে না থেকে বারবার ভেঙে ভেঙে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
নইলে কী হয়? প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এক বা দুই বা তিনটি পরিবার বেশিরভাগ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে। ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এই পশ্চিমা দেশগুলো যারা গণতন্ত্র ও মুক্তবাজারের কথা বলে, মুসলমানদের পশ্চাৎপদ বলে, তৃতীয় বিশ্বকে নিজেদের কাছ থেকে শিখতে বলে, সেই সব দেশেই মাত্র একশটির মতো পরিবার বেশিরভাগ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে। এটা আগেকার মতোই। কোনো পার্থক্য নেই। কারণ তারা সম্পদকে প্রবাহিত হতে দিতে চায় না, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে আটকে রাখতে চায়।
আল্লাহ কোরআনে এই বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, তিনি এমন নীতি নির্ধারণ করেছেন যাতে সম্পদ শুধু ধনীদের মধ্যে ঘুরতে না থাকে। বিলিয়নিয়ার তার ছেলের বিয়ে দেবে আরেক বিলিয়নিয়ারের মেয়ের সাথে, বিলিয়নিয়ারদের পার্টি হবে আর সেই অর্থ কখনো নিচে নামবে না, অন্য কারো কাছে পৌঁছাবে না এই সমস্যা কোরআন ঠিক করতে চেয়েছে।
কিন্তু এর বাইরেও আরও একটি বিষয় আছে যা সাধারণত তুলে ধরা হয় না সেটা সংক্ষেপে বলছি।
পবিত্র কোরআনের সুরা মুজ্জাম্মিলে আল্লাহ বলেছেন, তাহাজ্জুদের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অর্ধেকেরও বেশি রাত নামাজে কাটাতেন। তিনি একা ছিলেন না, সাহাবিদের একটি দলও তাঁর সাথে এতটা নামাজ পড়তেন। পরের আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, মদিনার বাকি মুসলমানদের অর্থাৎ আনসার ও অন্যদের সম্পর্কে আল্লাহ জানেন যে তোমাদের সবার পক্ষে এটা সম্ভব নয়। তাই আল্লাহ একটু সহজ করে দিলেন। কোরআন থেকে যতটুকু পারো পড়ো। অর্ধেক রাত নামাজ না পারলে পাঁচ-দশ মিনিট হলেও নামাজ পড়ো।
এরপর আল্লাহ বললেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ আছে যারা আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায় অর্থাৎ ব্যবসা করে। আগের দিনে মানুষ উটের পিঠে পণ্য চাপিয়ে অন্য গোত্রে যেত, বেচাকেনা করত, আমদানি-রপ্তানি করত। এটাই ছিল তাদের ব্যবসা। আল্লাহ বলছেন, তোমরা ব্যবসায়ী মানুষ, তোমাদের ভ্রমণ করতে হয়, নিরাপত্তার চিন্তা করতে হয়, নতুন জায়গায় যেতে হয়, জীবিকা উপার্জন করতে হয়। এটা কঠিন, তোমাদের পক্ষে তাহাজ্জুদ পড়া সম্ভব নয়। এরপর আল্লাহ তাআলা বলেছেন যুদ্ধের কথা। কেউ যদি যুদ্ধের মাঝখানে থাকে, সেও যুদ্ধ থামিয়ে নামাজ পড়তে পারবে না। এই ব্যাতিক্রমের কথাও আল্লাহ কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কোন ব্যতিক্রমটি তিনি আগে উল্লেখ করলেন? ব্যবসায়ীর কথা।
ইবনে মাসউদ (রা.) এই ব্যাপারে বলেন, মৃত্যু যখন আসবে আর মৃত্যু সবার কাছে আসবেই, আমি শুধু দুই ধরনের মৃত্যু চাই। এক. আল্লাহর পথে শহিদ হিসেবে মৃত্যু। দুই. আমার একটি গাধা আছে, পিঠে পণ্য নিয়ে নতুন কোনো জায়গায় ব্যবসা করতে যাচ্ছি, পথেই মৃত্যু হলো। কারণ আল্লাহ ব্যবসাকে এতটা গুরুত্ব ও সম্মান দিয়েছেন যে আয়াতে জিহাদের আগে ব্যবসার কথা উল্লেখ করেছেন।
পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র নিয়ে এই আলোচনায় এই আয়াতের কথা তুললাম কারণ এই আয়াতে আল্লাহ ভালো ব্যবসার গুরুত্ব ও মূল্য তুলে ধরেছেন।
পৃথিবীতে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসার কোনো অভাব নেই। দুর্নীতিগ্রস্ত ওষুধ শিল্প, দুর্নীতিগ্রস্ত অস্ত্র উৎপাদনকারী, দুর্নীতিগ্রস্ত সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানি, দুর্নীতিগ্রস্ত প্রযুক্তি কোম্পানি, দুর্নীতিগ্রস্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—প্রায় প্রতিটি শিল্পে দুর্নীতি আছে। কিন্তু সমাধান এই শিল্পগুলোকে ধ্বংস করা নয়। সমাধান হলো এগুলোকে সংশোধন করা। যতক্ষণ না তুমি একটি ভালো ও ন্যায়নিষ্ঠ ওষুধ শিল্প গড়তে পারছ, ততক্ষণ দুর্নীতিগ্রস্ত ওষুধ শিল্পকে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। যতক্ষণ না তুমি ভালো ও ন্যায়নিষ্ঠ প্রযুক্তি কোম্পানি গড়তে পারছ, ততক্ষণ খারাপ ও দুর্নীতিগ্রস্ত প্রযুক্তি কোম্পানিকে সরানো যাবে না।
এই কাজ কে করবে? যারা সত্যিকার অর্থে ব্যবসায় নামবে। এই কোটি কোটি টাকার সংগঠন ও কোম্পানিগুলো নিয়ে বসে বসে অভিযোগ করা যায়, আগামী একশ বা দুইশ বছরও অভিযোগ করা যাবে। কিন্তু তাতে কিছু বদলাবে না। আমরা যখন আমাদের নীতি-নৈতিকতা নিয়ে বাজারে প্রতিযোগী হিসেবে নামব, তখন পরিবর্তন আসবে। তাই নতুন প্রজন্মের মুসলমানদের ব্যবসার শক্তি বুঝতে হবে, সম্পদ গড়ার শক্তি বুঝতে হবে।
সূত্র: লেখাটি নোমান আলী খানের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত তার "Why Did Allah Mention Business in the Quran?" শীর্ষক বক্তব্য অবলম্বনে রচিত।
ওএফএফ