জেনা-ব্যভিচার প্রতিরোধে ‘দৃষ্টি ও জিহ্বা’ নিয়ন্ত্রণের ভূমিকা

ইসলাম ডেস্ক ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩:৪০ পিএম, ১৩ অক্টোবর ২০২১

চোখের দেখা আর মুখের কথাকে জেনা-ব্যভিচার সংঘটিত হওয়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ কারণেই জেনা-ব্যভিচার প্রতিরোধে দৃষ্টি ও জিহ্বার নিয়ন্ত্রণকে খুবই জরুরি বলেছেন বিশ্বনবি। কেননা যৌনাঙ্গ ছাড়া মানুষের এ দুইটি অঙ্গের মাধ্যমেই জেনা-ব্যভিচারের সূত্রপাত হয়। এ সম্পর্কে ইসলামের দিকনির্দেশনা কী?

মানুষের দুইটি অঙ্গ ‘চোখ ও জিহ্বা’ খুবই স্পর্শকাতর। যৌনাঙ্গ ব্যতিত ব্যভিচার সংঘটিত হতে এ দুই অঙ্গের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এ প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে-

হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা বনি আদমের জন্য জেনার (ব্যভিচারের) একটা অংশ নির্ধারিত রেখেছেন। সে তাতে অবশ্যই জড়িত হবে। চোখের জেনা হলো দেখা; জিহ্বার জেনা হলো কথা বলা, কুপ্রবৃত্তি কামনা ও খাহেশ (আসক্তি) সৃষ্টি করা এবং যৌনাঙ্গ তা সত্য অথবা মিথ্যা প্রমাণ করে।’ (বুখারি, মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ)

হাদিসের ব্যাখ্যা

১. আল্লামা খাত্তাবি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি লিখেছেন- ‘দেখা ও কথা বলাকে জেনা বলার কারণ এই যে, দুটোই হচ্ছে প্রকৃত জেনা-ব্যভিচারের ভূমিকা। জেনার মূল কাজ শুরু হওয়ার আগের স্তর। কেননা দৃষ্টি হচ্ছে মনের গোপন জগতের উদ্বোধক, জিহ্বা হচ্ছে বাণীবাহক আর যৌনাঙ্গ হচ্ছে বাস্তবায়নের হাতিয়ার- সত্য প্রমাণকারী।’ (মাআলিমুস সুনান)

২. আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি লিখেছেন- ‘দৃষ্টিই হয় যৌন লালসা উদ্বোধক, পয়গামবাহক। কাজেই এ দৃষ্টির নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণ মূলত যৌনাঙ্গেরই সংরক্ষণ। যে ব্যক্তি দৃষ্টিকে অবাধ, উন্মুক্ত ও সর্বগামী করে সে নিজেকে নৈতিক পতন ও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। নৈতিকতার ক্ষেত্রে মানুষ যত বিপদ ও পদস্খলনেই নিপতিত হয়, দৃষ্টিই হচ্ছে এসব কিছুর মূল কারণ।

কেননা দৃষ্টিই প্রথমত আকর্ষণ জাগায়; আর আকর্ষণই মানুষকে চিন্তা-বিভ্রমে নিমজ্জিত করে।  এ চিন্তাই মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করে যৌন লালসার উত্তেজনা। যৌন উত্তেজনা ইচ্ছা শক্তিকে উদ্বুদ্ধ করে আর ইচ্ছা ও প্রবৃত্তি শক্তিশালী হয়ে দৃঢ় সংকল্পে পরিণত হয়। এ দৃঢ় সংকল্প অধিকতর শক্তি অর্জন করে বাস্তবে (জেনা-ব্যভিচারের) ঘটনা সংঘটিত করে। আর বাস্তবে যখন কোনো বাধাই থাকে না; তখন এ (জেনা-ব্যভিচারের) বাস্তব অবস্থার সম্মুখীন হয় মানুষ। তখন এ থেকে ফিরে থাকার কোনো উপায় থাকে না।’ (আল-জাওয়াব আল-কাফী)

অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টির কুফল

অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টির কুফল সম্পর্কে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদিসে পাকে সতর্কবার্তা ঘোষণা করেছেন এভাবে-

১. النظرة سهم مسموم من سهام ابليس

‘অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টিই ইবলিসের (শয়তানের) বিষাক্ত বাণ বিশেষ।’ (মুসনাদ আশ-শিহাব)

২. আল্লামা ইবনে কাসির রাহমাতুল্লাহি আলাইহি লিখেছেন-

النظرة سهم سم إلى القلب

‘দৃষ্টি হচ্ছে এমন একটি তীর, যা মানুষের হৃদয়ে বিষের উদ্রেক করে।’ (ইবনে কাসির)

জেনা-ব্যভিচার রোধে নির্দেশ

জেনা –ব্যভিচার প্রতিরোধে অনিয়ন্ত্রি দৃষ্টি চালনা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশেষ কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তাহলো-

১. দৃষ্টি নীচু করার নির্দেশ

غًضُّوا أَبْصَارَكُمْ وَاحْفَظُوْا فُرُوْجَكُمْ

‘তোমাদের দৃষ্টিকে নীচু কর, নিয়ন্ত্রণ কর এবং তোমাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত কর।’ (মুজামুল কাবির, মাজমুআ ফাতাওয়া)

কেননা দৃষ্টির নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে লজ্জাস্থান হেফাজতের একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। কেননা দৃষ্টির অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে জেনা-ব্যভিচার। অর্থাৎ দৃষ্টি নিয়ন্ত্রিত হলেই লজ্জাস্থানের সংরক্ষণ সম্ভব। অন্যথায় তাকে নিঃসন্দেহে চরম নৈতিক অধঃপতন জেনা-ব্যভিচারে নিমজ্জিত হতে হবে। এ কারণেই প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দৃষ্টি নীচু করার সঙ্গে সঙ্গে যৌনাঙ্গের হেফাজতের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

২. দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ

হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে লক্ষ্য করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এভাবে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন-

يا علي! لا تتبع النظرة النظرة فإن لك الأولى وليست لك الآخرة

‘হে আলি! কোনো পরস্ত্রীর প্রতি একবার দৃষ্টি পড়লে পুনরায় তার দিকে চোখ তুলে তাকাবে না। কেননা তোমার জন্য প্রথম দৃষ্টিই ক্ষমার যোগ্য; দ্বিতীয়বার দেখা নয়।’ (আবূ দাউদ)

দ্বিতীয়বার না তাকানোর কারণ সুস্পষ্ট। আকস্মিকভাবে কারো প্রতি চোখ পড়ে গেলে আর ইচ্ছাকৃতভাবে কারো প্রতি তাকানো এককথা নয়। প্রথমবার যে চোখ কারো উপর পড়ে গেছে, তার মূলে ব্যক্তির ইচ্ছার বিশেষ কোনো যোগ থাকে না কিন্তু একবার দেখার পর পুনরায় তাকে দেখার বিষয়টি অবশ্যই ইচ্ছাক্রমেই হয়।

এ জন্যেই প্রথমবারের দেখায় কোনো দোষ হবে না; তা ক্ষমার যোগ্য। আর দ্বিতীয়বার তার দিকে চোখ তুলে তাকানো ক্ষমার অযোগ্য। কেননা দ্বিতীয়বারের দৃষ্টির পেছনে মানুষের মনের কলুষতা ও লালসা কিংবা কুপ্রবৃত্তির উত্তেজনা থাকাই স্বাভাবিক। আর এ ধরনের দৃষ্টি দিয়ে পরনারী বা স্ত্রীকে দেখা সুস্পষ্ট হারাম।

এমনটি ভাবার সুযোগ নেই যে,

পরনারী বা স্ত্রীকে একবার দেখা জায়েয এবং এখানে তার অনুমতি দেয়া হচ্ছে। প্রকৃত বিষয়টি হলো- পরনারী বা স্ত্রীর দিকে তাকানোই হারাম তথা নিষিদ্ধ। অনিচ্ছাকৃতভাবে যদি পরনারী বা স্ত্রীর প্রতি দৃষ্টি পড়ে যায় তবে দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেওয়ার নেওয়া। দৃষ্টি নীচু করে চলাফেরা করারই কোরআন-সুন্নাহ ও ইসলামের দিকনির্দেশনা।

হঠাৎ দৃষ্টি পড়লে করণীয়

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হল- পরস্ত্রীর প্রতি আকস্মিক দৃষ্টি পড়া সম্পর্কে আপনার হুকুম কী?

তিনি বললেন- اصرف بصرك ‘তোমার চোখ অন্যদিকে ফিরিয়ে নাও।’ (আবু দাউদ)

সুতরাং প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তির কাজ হচ্ছে, পরনারী বা স্ত্রীকে দেখার অপরাধ বা গুনাহ থেকে নিজেকে পবিত্র রাখা। আকস্মিক নিতান্তই অনিচ্ছা সত্ত্বেও যদি কারো প্রতি দৃষ্টি পড়ে যায়, তবে সঙ্গে সঙ্গেই দৃষ্টি নীচু রাখা অথবা অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়াই হচ্ছে ঈমানদার ব্যক্তির কাজ।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে জেনা-ব্যভিচার প্রতিরোধে চোখ ও জিহ্বার হেফাজত করার তাওফিক দান করুন। কোরআন-সুন্নাহর দিকনির্দেশনা অনুযায়ী মানুষের এ দুইটি অঙ্গের হেফাজত করার মাধ্যমে নিজেদের জেনা-ব্যভিচারের মারাত্মক অপরাধ ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

এমএমএস/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]