লাইলাতুল বরাতের ফজিলত ও কিছু কথা
মুসলিম উম্মাহর ঐতিহ্য হচ্ছে সকল প্রকার ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানাদি পালনে সবাই একনিষ্ঠ থাকা। সব ভেদাভেদ ভুলে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সবাই থাকে এক কাতারে। কারো মধ্যে কোনো দ্বিধা দ্বন্দ্ব থাকে না। এটা আল্লাহ প্রদত্ত এক ঐক্যের বন্ধন। ইসলাম শ্রেষ্ঠ জীবন ব্যবস্থা তার জলন্ত প্রমাণ। ধর্মীয় ইবাদত-বন্দেগী তথা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে লাইলাতুল বরাত অন্যতম।
মুসলিম সমাজে শাবান মাস ও লাইলাতুল বরাত নিয়ে যদিও বাড়াবাড়ি অবস্থা, তথাপিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস অনুযায়ী লাইলাতুল বরাতের গুরুত্ব অত্যাধিক। এই রজনীতে ইবাদত-বন্দেগীর ব্যাপারে অসংখ্য দলীল প্রমাণ রয়েছে।
ইসলাম ভারসাম্যতার দ্বীন তথা জীবনব্যবস্থা বিধায় আমরা সহিহ হাদীস মোতাবেক সঠিকভাবে লাইলাতুল বারাতের রাত্রিতে ইবাদত-বন্দেগীতে নিজেদেরকে নিয়োজিত করে আল্লাহর নৈকট্য হাসিলে ব্রতী হব ইনশাআল্লাহ।
লাইলাতুল বরাতের ফজিলত
১৫ শাবানের ফজিলত ও করণীয় সম্পর্কে আল্লাহর প্রিয় হাবীব রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অসংখ্য হাদীস রয়েছে। তার থেকে কয়েকটি-
হযরত মুআয ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে (শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে) সৃষ্টির দিকে (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতিত আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’
সতর্ক বানী :
এই হাদীস দ্বারা প্রমাণ হয় যে, এ রাতে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে রহমত ও মাগফেরাতের দ্বার উন্মুক্ত হয়। কিন্তু শিরকী কাজ কর্মে লিপ্ত ব্যক্তি এবং অন্যের ব্যাপারে হিংসা-বিদ্বেষ পোষনকারী মানুষ এই ব্যাপক রহমত ও সাধারণ ক্ষমা থেকেও বঞ্চিত থাকে। আল্লাহ আমাদেরকে এই শ্রেণীর মানুষ থেকে রক্ষা করুন।
যখন কোনো বিশেষ সময়ের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে রহমত ও মাগফেরাতের ঘোষণা হয় তখন তার অর্থই এই হয় যে, এই সময়ে এমন সব নেক আমলের ব্যাপারে যত্নবান হতে হবে যাতে আল্লাহর রহমত ও মাগফেরাতের উপযুক্ত হওয়া যায় এবং মানুষ আল্লাহর রহমত ও মাগফেরাত হতে বঞ্চিত না হয়।
এই রাতের আমল :
হাদীস শরীফের নির্দেশনা অনুযায়ী এই রাতে কী কী আমল করা যায়, এ ব্যাপারে হাদীসে এসেছে-
হযরত আলা ইবনুল হারিস রহমাতুল্লাহি আলাই থেকে বর্ণিত হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাতে নামাজে দাঁড়ান এবং এত দীর্ঘ সেজদা করেন যে, আমার ধারনা হলো তিনি হয়ত মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ল। যখন তিনি সেজদা থেকে উঠলেন এবং নামাজ শেষ করলেন তখন আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আয়েশা অথবা বলেছেন, ও হুমাইরা, তোমার কি এই আশংকা হয়েছে যে, আল্লাহর রাসুল তোমার হক নষ্ট করবেন? আমি উত্তরে বললাম, না, ইয়া রাসুলুল্লাহ। আপনার দীর্ঘ সেজদা থেকে আমার আশংকা হয়েছিল, আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন কিনা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি জান এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই ভালো জানেন। রাসুল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন ইরশাদ করেন-
এটা হল অর্ধ-শাবানের রাত। (শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখের দিবাগত রাত।) আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে তাঁর বান্দার প্রতি মনোযোগ দেন এবং ক্ষমা প্রার্থণাকারীদের ক্ষমা করেন এবং অনুগ্রহপ্রার্থীদের প্রতি অনুগ্রহ করেন আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের ছেড়ে দেন তাদের অবস্থাতেই। (শুয়াবুল ইমান, বাইহাকী)
এই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে-
১. দীর্ঘ নফল নামাজ পড়া, যাতে সেজদাও দীর্ঘ হবে।
২. কুরআনুল কারীম তেলাওয়াত করা।
৩. দরুদ শরীফ পড়া
৪. ইসতেগফার পড়া
৫. দুআ করা;
৬. রাতের কিছু সময় ঘুমানো (এমন যেন না হয় যে, সারা রাতের দীর্ঘ ইবাদতের ফলে ক্লান্তিতে ফজরের নামাজ জামাআতের সাথে পড়া থেকে বঞ্চিত হতে হয়।)
৭. পর দিন রোযা রাখা
সুনানে ইবনে মাজায় বর্ণিত হয়েছে-
হযরত আলী ইবনে আবু তালেব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “পনের শাবানের রাতে (চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত) যখন আসে তখন তোমরা এ রাতটি ইবাদত-বন্দেগীতে কাটাও এবং দিনের বেলায় রোযা রাখ। কেননা, এ রাতে সুর্যাস্তের পর আল্লাহ তাআলা প্রথম আসমানে আসেন এবং বলেন, কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করে দিব। আছে কি কোনো রিযিকপ্রার্থী? আমি তাকে রিযিক দিব। এভাবে সুবহে সাদিক পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা ডাকতে থাকেন।” (সুনানে ইবনে মাজাহ)
তাছাড়া প্রতি আরবী মাসের ১৩,১৪,১৫ তারিখ তথা ইয়ামে বীজের রোযা রাখার বিষয়টি সহিহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। আর শাবান মাসের এ দিনটি আইয়ামে বীজের দিনের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত। রাসুল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আইয়ামে বীজের রোযা রাখতেন।
সতর্ক বানী :
তবে মনে রাখতে হবে, অনেক অনির্ভরযোগ্য ওযীফার বই-পুস্তকে নামাজের যে নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন লেখা আছে অর্থাৎ এত রাকায়াত হতে হবে, প্রতি রাকায়াতে এই সুরা এত বার পড়তে হবে; এগুলো ঠিক নয়, হাদীস শরীফে এসব নেই। এগুলো মানুষের মনগড়া পন্থা।
সুতরাং আমরা সবাই উপরোক্ত আমলগুলে করে লাইলাতুল বরাতের ফজিলত, বরকত ও মাগফেরাত লাভ করতে সচেষ্ট হব। সকল প্রকার রুসুম রেওয়াজ তথা, হালুয়া-রুটি, খিচুরি-শিরনী, পথ-ঘাট, মসজিদ, বাড়িঘর সাজানো ও আতশবাজি থেকে বিরত থাকবো। তবে লাইলাতুল বরাতের উপলক্ষ মনে না করে মিসকিনদের মাঝে হালুয়া রুটি বিতরণ করা যাবে।
তাছাড়া এই দোয়াতে রমজানের পূর্ব পর্যন্ত করতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশেষ নির্দেশ আছে-
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা বা-রাকলানা-ফি- রাজাবা ওয়া শা’বান ওয়া বাল্লিগনা- রামাদা-ন।
অর্থ: হে আল্লাহ! তুমি আমাদের জন্য রজব ও শা’বান মাসে বরকত দাও এবং আমাদেরকে রমযান পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দাও।
অর্থাৎ আমাদের নেক হায়াত দান কর, যাতে আমরা রমযান মাস পেয়ে রমযানের বরকত লাভ করতে পারি।
আল্লাহ আমাদের উক্ত আমলগুলো ঠিক ঠিকভাবে আদায় করার তৌফিক দান করুন আমীন। ছুম্মা আমীন।
তথ্যসূত্র : সুনানে ইবজে মাজাহ, বাইহাকী ফি শুয়াবুল ইমান।
সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আজীম ওয়া বিহামদিহি আসতাগফিরুকা ওয়া আতুবু ইলাইকা।
জাগো নিউজ ২৪ ডটকমের সঙ্গে থাকুন। গুরুত্বপূর্ণ দোয়া শিখে আমল করুন। কুরআন-হাদীস মোতাবেক আমলী জিন্দেগী যাপন করুন।
এইচএন/এমএস