অবিশ্বাসীদের মুখে রাসুলের (সা.) সত্যবাদিতার গল্প

ধর্ম ডেস্ক
ধর্ম ডেস্ক ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:৪৬ পিএম, ০৩ জুলাই ২০২১

সত্যবাদিতার দিশারী, বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত হজরত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া  সাল্লাম। তাঁর সত্যবাদিতা দুনিয়াজুড়ে যুগে যুগে সব মানুষের জন্য অনন্য দৃষ্টান্ত। কেমন ছিল তাঁর সত্যবাদিতা। অবিশ্বাসীরাও তাঁকে প্রচণ্ড সত্যবাদী হিসেবে জানতেন। হাদিসের বিখ্যাত গ্রন্থ বুখারির চমৎকার দুইটি হৃদয়গ্রাহী বর্ণনা তুলে ধরা হলো-

১. সম্রাট হিরাক্লিয়াসের সাথে আবু সুফিয়ানের কথোপকথন

মক্কার কুরাইশদের নেতা আবু সুফিয়ান। তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। বিশ্বনবির নবুয়তের শুরুর দিকে তিনি ব্যবসার উদ্দেশে শাম দেশে গিয়েছিলেন। শাম ছিল বাইজেন্টাইন সম্রাজ্যের অধীন। দেশটির সম্রাট হিরাক্লিয়াস সে সময়টিতে শামে অবস্থান করছিলেন। বিশ্বনবি হজরত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়তের ঘোষণা ও আগমণের ঘটনা সম্রাটের কাছে পৌঁছেছিল।

ইমাম বুখারি রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ বুখারিতে হিরাক্লিয়াসের সাথে আবু সুফিয়ানের সাক্ষাৎ ও কথোপকথনের বিখ্যাত ঘটনাটি এভাবে বর্ণনা করেছেন-

সম্রাট হিরাক্লিয়াস নবুয়ত ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমণের বিষয়টি সম্পর্কে আরও কিছু জানতে চাচ্ছিলেন। সে কারণে আরবদের কেউ শামে আছে কিনা তা সন্ধান করতে বললেন,কাউকে পেলে তাকে সম্রাটের কাছে নিয়ে আসার কথা বললেন। যার কাছ থেকে সম্রাট আরবের নবী সম্পর্কে কিছু জানতে পারবে।

কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান শামে ছিলেন, তাকে হিরাক্লিয়াসের সামনে হাজির করা হল। হিরাক্লিয়াস তাকে বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে অনেকগুলো প্রশ্ন করলেন। এর মধ্যে একটি প্রশ্ন ছিল-

‘তিনি (আরবের নবি) নবুয়তের দাবি করার আগে তোমরা কি কখনো তাকে মিথ্যাকথার কারণে অভিযুক্ত  করেছ?’

আবু সুফিয়ান বলেন, আমি উত্তরে বললাম,-‘না, এমন অভিজ্ঞতা আমাদের কখনো হয়নি; আমরা কখনো তাকে মিথ্যাবাদিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করতে পারিনি।’

সম্রাট হিরাক্লিয়াসের ঘোষণা-

হিরাক্লিয়াস যে বিষয়গুলো জানতে চেয়েছিলেন সে সম্পর্কে আবু সুফিয়ানের উত্তর শোনার পর তিনি নিজেই একে একে সেই প্রশ্ন ও উত্তরগুলো বিশ্লেষণ করেছেন। সত্যবাদিতা সংক্রান্ত প্রশ্নের ব্যাপারে সম্রাট হিরাক্লিয়াস বললেন, ‘আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি-

‘তোমরা কি তাঁকে নবুয়ত দাবির আগে মিথ্যাবাদিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করতে পেরেছ? তুমি বলেছ, অভিযুক্ত করতে পারনি। এ থেকে আমি বুঝতে পেরেছি- তিনি সত্য নবি। কারণ যে ব্যক্তি মানুষের ব্যাপারে মিথ্যা বলেন না, তিনি আল্লাহর ব্যাপারেও মিথ্যা বলতে পারেন না।’ (পুরো কথোপকথনটি সহিহ বুখারির ৭নং হাদিসে বর্ণিত হয়েছে)

বিশ্বনবির সত্যবাদিতাসহ নবুয়তের সত্যতার ব্যাপারে এটি হচ্ছে এমন এক ব্যক্তির সাক্ষ্য, যিনি ওই সময় পর্যন্ত তাঁর প্রাণের দুশমন ছিলেন এবং তার মর্যাদাহানির সুযোগ খুঁজছিলেন।

২. হজরত সাদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহু ও আবু জেহেলের ঘটনা

বিশ্বনবির সত্যতার আরেকটি চমৎকার ঘটনাও ইমাম বুখারি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি সংকলন করেছেন। তাহলো-

আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাত্র মদিনায় হিজরত করে এসেছেন। বদরের যুদ্ধের আগে তখন উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। সে সময়টিতে মদিনার নেতৃস্থানীয় আনসারি সাহাবি হজরত সাদ ইবনে মুয়াজ রাদিয়াল্লাহু আনহু ওমরার উদ্দেশ্যে মক্কায় গেলেন। হজরত সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর মক্কা-মদিনার মাঝে আগে থেকেই যোগাযোগ ছিল, আসা-যাওয়া ছিল, তাদের মাঝে পরিচয়ও ছিল।

হজরত সাদ ইবনে মুয়াজ রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন মক্কায় যেতেন তখন মক্কার সরদার উমাইয়া ইবনে খালফের বাড়িতে মেহমান হতেন। উমাইয়া ইবনে খালফ যখন ব্যবসার উদ্দেশ্যে শামের দিকে যেত, তখন মদিনায় এলে হজরত সাদ ইবনে মুয়াজ রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর বাড়িতে মেহমান হত। জাহেলি যুগ থেকেই এটা ছিল।

বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের ওই সময়ে হজরত  সাদ ইবনে মুয়াজ রাদিয়াল্লাহু আনহু ওমরার উদ্দেশ্যে মক্কায় গিয়েছেন। কাবা শরিফ তাওয়াফ করতে হবে। কিন্তু কাবা চত্বরে গিয়ে তাওয়াফ করবেন কীভাবে? তাঁরা মদিনার মুসলিম! মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুহাজির সাহাবায়ে কেরামকে তারা আশ্রয় দিয়েছেন। মক্কার অবিশ্বাসী নেতাদের চোখে তো এরা বড় অপরাধী!

উমাইয়া ইবনে খালফের পরামর্শ

উমাইয়া ইবনে খালাফ বলল, অপেক্ষা করুন, দুপুরবেলায় প্রখর রৌদ্রের কারণে লোকজন কাবার চত্বরে থাকে না, নিজ নিজ ঘরে থাকে। ওই সময় কাবা চত্বর ফাঁকা থাকে। তখন আপনি গিয়ে তাওয়াফ করে আসবেন।

হজরত সাদ ইবনে মুয়াজ রাদিয়াল্লাহু আনহু সে পরামর্শেই দুপুরবেলা তাওয়াফ করতে বের হলেন। গিয়েছেন নিরিবিলি তাওয়াফ করবার জন্য, তাওয়াফ করছেন, এমতাবস্থায় দেখা হয়ে গেল একেবারে আবু জেহেলের সঙ্গে।

হজরত সাদ ইবনে মুয়াজ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে দেখে আবু জেহেল বলে উঠল-‘কে রে এখানে কাবার তাওয়াফ করে?

হজরত সাদ ইবনে মুয়াজ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন- ‘আমি সাদ।’

আবু জেহেল উত্তেজিত হয়ে বলল, বাহ! কী নিরাপদে কা‘বা শরিফের তাওয়াফ করছ! অথচ তোমরা মদিনার লোকেরা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও তার সঙ্গীদের আশ্রয় দিয়েছ!’

এভাবে হজরত সাদের সঙ্গে আবু জেহেলের তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়ে গেল। এ সময় উমাইয়া ইবনে খালফ স‘দ ইবনে মুয়াজ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে থামাতে চেষ্টা করে আর বলে- ‘সাদ! আবুল হাকামের (আজু জেহেল) আওয়াজের উপরে তোমার আওয়াজ উচুঁ করো না। তিনি এই মক্কা উপত্যকার সরদার! একটু আস্তে কথা বল। আস্তে কথা বল।’

উমাইয়া  ইবনে খালফ যখন কয়েকবার হজরত সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে থামাবার চেষ্টা করল; সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এতে বিরক্ত হলেন। বিরক্ত হয়ে উমাইয়া ইবনে খালফকে লক্ষ করে বললেন-

‘এখন আবুল হাকামের পক্ষ নিচ্ছ? কুফরের এই নেতার পক্ষে ওকালতি করছ?  এই পথে তোমার পরিণাম কী হবে সেটা চিন্তা করেছ? আমি তো মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে শুনেছি যে, তিনি তোমাকে হত্যা করবেন।’

উমাইয়া ইবনে খালফের আশংকা ও সত্যয়ন

এই কথা শুনে উমাইয়া ইবনে খালফ আতঙ্কিত হয়ে বলে উঠল-‘আমাকে?’

হজরত সাদ ইবনে মুয়াজ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘হ্যাঁ’। তখন উমাইয়া ইবনে খালফের আতঙ্কিত বাক্য ছিল এটি- ‘ওয়াল্লাহ! মুহাম্মাদ যখন কিছু বলেন তা মিথ্যা হয় না।’

উমাইয়া ইবনে খালফ অস্থির হয়ে বাড়ি ফিরল। বাড়ি এসে বউকে বলল, শুনেছ- আমার ইয়াসরিবী ভাই কী বলেছে? বউ বলল, কী বলেছে?

উমাইয়া বলল, সে নাকি মুহাম্মাদকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলতে শুনেছে যে, তিনি আমাকে হত্যা করবেন। একথা শুনে স্ত্রীও বলে উঠল- ‘আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ কখনো মিথ্যা বলেন না।’ (বুখারি)

বদরের যুদ্ধে উমাইয়া ইবনে খালফের অবস্থান

বদরের যুদ্ধের ঘটনা আরও চমৎকার। বদরের যুদ্ধের সময় মক্কার সর্দারেরা যখন মুসলমানদের শেষ করার জন্য প্রচণ্ড দম্বের সঙ্গে বীরদর্পে মক্কা থেকে বের হচ্ছিল তখন উমাইয়া ইবনে খালফের স্ত্রী স্বামীকে বলল-

‘তুমি কি ভুলে গেছ, তোমার ইয়াসরিবী ভাই কী বলেছিল?’ স্ত্রীর এই কথা উমাইয়ার মনে এতই প্রভাব বিস্তার করল যে, সে নানা ফন্দি-ফিকির করতে লাগল; কোনোভাবে যদি বদরের ময়দানে না যাওয়া যায়, কোনোভাবে যদি এড়িয়ে যাওয়া যায়।’

অন্যরা বের হয়েছে, সে এই আসছি, এই বের হচ্ছি ইত্যাদি বলে ঘরে বসে আছে; সবাই যখন বের হয়ে গিয়েছে তখন আবু জেহেল দেখে, উমাইয়া ঘরে বসে আছে। সে এসে তাকে লজ্জা দিল, উত্তেজিত করল। নানা কথা বলার পরে উমাইয়া উত্তেজিত হয়ে মক্কা থেকে বের হল। কিন্তু বের হলেও সঙ্গে নিল দুইটা সওয়ারি নিলো। যার একটায় সে সাওয়ার হলো, আরেকটা সঙ্গে খালি।

যেখানেই কাফেলা যাত্রাবিরতি করে, উমাইয়া পেছনে পেছনে থাকে এবং সঙ্গে থাকা দ্বিতীয় সাওয়ারিটাও প্রস্তুত রাখে। কোনো বিপদ হলেই, যেন তাজাদম সাওয়ারিতে লাফিয়ে চড়ে সোজা মক্কায় ফিরতে পারে।

কিন্তু মানুষ যতই কলা-কৌশলই গ্রহণ করুক না কেন, আল্লাহর ফয়সালা রদ করার ক্ষমতা কারো নেই। যে কারণে উমাইয়াও ঘরে পালিয়ে থেকেও যুদ্ধে আসা থেকে বিরত থাকতে পারেনি। সে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়েছে, মৃত্যুর আশঙ্কা করেছে, মৃত্যু থেকে পলায়নের ব্যবস্থাও নিয়েছে, কিন্তু এরপরও পায়ে পায়ে মৃত্যুর দিকেই এগিয়ে গেছে।

বদরের ময়দানে অধিকাংশ কাফের নেতার ধ্বংস হওয়াই ছিল আল্লাহর ফয়সালা। কাজেই ধ্বংসের জন্য তাদের এখানে আসতেই হবে। আল্লাহ পরিস্থিতি তৈরি করে দিয়েছেন, ওরাও প্ররোচিত হয়ে দর্পভরে নিজেদের ধ্বংসের দিকেই ছুটে গিয়েছে। চিন্তা করলে আল্লাহর নাফরমান অবিশ্বাসীদের জন্য কত বড় শিক্ষাই না এ হাদিসে বিদ্যমান!

সত্যবাদিতার দৃষ্টান্ত এমনই...

রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সত্যবাদিতার ব্যাপারে, তাঁর যবানে মোবারক থেকে বের হওয়া প্রতিটি বাক্যের ব্যাপারে তাঁর দুশমনেরও বিশ্বাস কীরূপ ছিল! তাঁর সত্যবাদিতায় অবিশ্বাসীরাও সম্পূর্ণ নিঃসংশয় ছিল।

মুসলিম উম্মাহর উচিত, বিশ্বনবির সত্যবাদিতার এ আমলটি নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করা। সত্যবাদিতার মাধ্যমে জান্নাতের পথের শুভ সূচনার চেষ্টা অব্যাহত রাখা।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে এই মহান গুণ অর্জন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

এমএমএস/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।