প্রধানমন্ত্রীর কাছে এভারেস্টজয়ী শাকিলের খোলা চিঠি

ইকরামুল হাসান শাকিল
ইকরামুল হাসান শাকিল ইকরামুল হাসান শাকিল , পর্বতারোহী ও লেখক
প্রকাশিত: ০১:০৬ পিএম, ০১ এপ্রিল ২০২৬
ফাইল ছবি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে খোলা চিঠি লিখেছেন এভারেস্টজয়ী পর্বতারোহী ইকরামুল হাসান শাকিল। ১ এপ্রিল বেলা ১১টা ৪ মিনিটে নিজের ফেসবুক আইডিতে তিনি চিঠিটি পোস্ট করেন। খোলা চিঠিটি জাগো নিউজের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:

‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সমীপে খোলা চিঠি
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শুরুতেই আপনার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন। আপনার সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন আজ স্বপ্ন দেখছে আকাশছোঁয়া। সম্প্রতি দেশের সকল স্তরের ক্রীড়াবিদদের সম্মাননা প্রদান, স্পোর্টস কার্ড এবং মাসিক ভাতার যে যুগান্তকারী উদ্যোগ আপনি নিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। এই উদ্যোগ তৃণমূলের খেলোয়াড়দের জন্য এক নতুন আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার ৩০ মার্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘প্রথমবারের মতো ক্রীড়া ভাতা চালু করেছে সরকার। আজ সকালে নিজ কার্যালয়ে ক্রীড়া ভাতা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রথম পর্যায়ে ১২৯ জন ক্রীড়াবিদকে ১ লাখ টাকা করে ভাতা এবং ক্রীড়া কার্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গত এক বছরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য আনা ক্রীড়াবিদদের আর্থিকভাবে পুরস্কৃতও করেছেন সরকারপ্রধান। এখন থেকে বিভিন্ন খেলার জাতীয় দলের খেলোয়াড়েরা প্রতি মাসে ১ লাখ টাকা করে ভাতা পাবেন। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক জানিয়েছেন, এপ্রিল থেকে পর্যায়ক্রমে ৫০০ জন ক্রীড়াবিদকে বেতনকাঠামোর আওতায় আনা হবে। সরকারের এমন পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন দেশের ক্রীড়াবিদেরা। তাঁরা বলছেন, এ উদ্যোগের ফলে খেলোয়াড়দের নিজেদের মধ্যে যেমন প্রতিযোগিতা হবে, একইভাবে সবাই চাইবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ভালো করতে।’

আমি একজন বাংলাদেশি পর্বতারোহী হিসেবে আপনার সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই একটি বিশেষ বিষয়ে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অতি জরুরি এবং এক্সট্রিম ও এন্ডুরেন্স অ্যাথলেটদের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা এবং পৃষ্ঠপোষকতার আওতায় আনার জন্য। আমি আমার অবস্থান থেকে এই স্পোর্টসের সকলের হয়ে ভীষণ হতাশা নিয়ে লিখছি।

গত বছরের ১৯ মে আমি সম্পন্ন করেছি ঐতিহাসিক ‘সি টু সামিট এভারেস্ট অভিযান’। সমুদ্রপৃষ্ঠ (ইনানী সৈকত) থেকে কোনো প্রকার যানবাহন ছাড়া পায়ে হেঁটে ১৩৭২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে, ৩ কিলোমিটার যমুনা নদী সাঁতরে পার হয়ে ৮৪ দিনে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ করেছি, যা বিশ্ব এক্সট্রিম ও এন্ডুরেন্স ক্রীড়াঙ্গনে অত্যন্ত বিরল ও দুঃসাহসিক একটি রেকর্ড। এটি কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয় বরং বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকাকে এক অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরার প্রচেষ্টা। এ ছাড়াও পৃথিবীর দুর্গমতম ও চ্যালেঞ্জিং হিমালয়ের ট্রেইল ‘দ্য গ্রেট হিমালয়ান ট্রেইল’র ১৭০০ কিলোমিটার পথ ১০৯ দিনে অতিক্রম করেছি, যা পৃথিবীতে ৫০ জনেরও কম পর্বতারোহী সম্পন্ন করতে পেরেছেন। এ ছাড়া হিমালয়ের দুর্গম পাঁচ, ছয়, সাত হাজার মিটারের পর্বত শিখরে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকার প্রতিনিধিত্ব করেছি, যা এই স্পোর্টসে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শুধু সাফল্যই নয়, ইতিহাস তৈরি করেছে।

বর্তমানে আমার মতো অনেক পর্বতারোহীই বিশ্বের দুর্গমতম বিভিন্ন পর্বত শিখরে দেশের পতাকা তুলে ধরছেন এবং তরুণ প্রজন্ম স্বপ্ন দেখছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে পাল্লা দিয়ে এই স্পোর্টসে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করার।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পর্বতারোহণ কেবল একটি সাধারণ খেলা নয়; এটি একটি ‘এক্সট্রিম স্পোর্টস’, যা বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এবং চ্যালেঞ্জিং খেলা হিসেবে স্বীকৃত। এই খেলার প্রতিটি পদক্ষেপে থাকে মৃত্যুর ঝুঁকি, কিন্তু হৃদয়ে থাকে দেশের নাম উজ্জ্বল করার অদম্য বাসনা। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, সরকারের সাম্প্রতিক এই মহতী উদ্যোগের (ক্রীড়া কার্ড ও ভাতা) তালিকায় পর্বতারোহণ এবং এন্ডুরেন্স স্পোর্টসকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অতীতেও রাষ্ট্র উল্লেখযোগ্য কোনো সহযোগিতার হাত বাড়ায়নি বরং বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে পর্বতারোহণকে সর্বোচ্চ বীরত্বের প্রতীক হিসেবে দেখা হয় এবং এর জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ কয়েকটি দেশের কথা উল্লেখ করতে পারি:

ভারত: পর্বতারোহীদের জন্য ‘তেনজিং নরগে ন্যাশনাল অ্যাডভেঞ্চার অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়, যা দেশটির সর্বোচ্চ ক্রীড়া সম্মান ‘অর্জুন পুরস্কার’র সমতুল্য। এ ছাড়া পর্বতারোহী বাচেন্দ্রী পাল বা অরুনিমা সিনহার মতো অনেককে ‘পদ্মশ্রী’ বা ‘পদ্মভূষণ’র মতো সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মানেও ভূষিত করা হয়েছে, যা স্বয়ং রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে প্রদান করা হয়ে থাকে। প্রত্যেক এভারেস্ট আরোহীকে ভারত কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকার ১০ থেকে ১৫ লাখ ভারতীয় রুপি অর্থ সহায়তাও দিয়ে থাকে।

পাকিস্তান: পাকিস্তানে পর্বতারোহীদের অসামান্য অর্জনের জন্য বেসামরিক সম্মাননা দেওয়া হয়। ‘প্রাইড অব পারফরম্যান্স’ পাকিস্তানের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার। বিখ্যাত আরোহী নাজির সাবির এবং আশরাফ আমানসহ অনেকেই এই পদক পেয়েছেন। ‘হিলাল-ই-ইমতিয়াজ’ ২০২৫-২৬ সালের তালিকায় দেখা গেছে, তরুণ আরোহী শেহরোজ কাশিফকে তার বীরত্বের জন্য এই উচ্চপদস্থ বেসামরিক সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাজ্য: এভারেস্ট বিজয়ী বা দুঃসাহসী আরোহীদের ব্রিটিশ রাজপরিবার থেকে ‘নাইটহুড’ (স্যার) বা ‘অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার’ পদকে ভূষিত করা হয়। স্যার এডমন্ড হিলারিকে রানী এলিজাবেথ ‘নাইটহুড’ উপাধি দিয়েছিলেন।

নিউজিল্যান্ড: স্যার এডমন্ড হিলারিকে নিউজিল্যান্ডের সর্বোচ্চ সম্মান ‘অর্ডার অব নিউজিল্যান্ড’ দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া পর্বতারোহীদের অসামান্য অর্জনের জন্য বেসামরিক সম্মাননা দেওয়া হয়।

নেপাল: নেপালে পর্বতারোহীদের ‘নেপাল তারা’ বা এই জাতীয় বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়। সেখানকার অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক পরিচয়ে পর্বতারোহীদের অবদানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এরকম অসংখ্য উদাহরণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশের পর্বতারোহীরা বিশ্বের বিখ্যাত পর্বতারোহীদের সাথে তাল মিলিয়ে দেশের হয়ে সম্মান বয়ে আনছেন। কিন্তু রাষ্ট্র তাদের ন্যূনতম স্বীকৃতি ও সম্মান দেয়নি। আমরা দেশের হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এই স্পোর্টসে সম্মান বয়ে আনছি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে স্বাস্থ্য সচেতন ও মাদকমুক্ত এই স্পোর্টসের স্বপ্ন দেখাচ্ছি। যেহেতু সরকার আমাদের কোনো পৃষ্ঠপোষকতা করে না, তাই এই স্পোর্টসের প্রতিনিধিরা প্রতিনিয়ত আশাহত হয়ে স্বপ্নকে গলাটিপে মেরে ফেলছেন। পরিবার ও সমাজ থেকেও তারা অবহেলার শিকার হচ্ছেন।

শৈশবে শোনা জিন-ভূতের গল্পের মতো শুনে আসছি, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের আওতায় ‘বাংলাদেশ স্পোর্টস অ্যাডভেঞ্চার অ্যান্ড মাউন্টেনিয়ারিং কনফেডারেশন’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম আছে। কিন্তু আমার মতো প্রায় সকল পর্বতারোহী তা কখনো দেখেননি। তাদের কোনো কর্মকাণ্ডও চোখে পড়েনি কখনো। কারা দায়িত্বে আছেন, কী কাজ করছেন, সরকারি অনুদান কীভাবে খরচ করছেন কেউ জানে বলে আমার জানা নেই। তাদের সোশ্যাল মিডিয়া দেখলে সহজেই অনুমান করা যায়, তাদের দায়িত্বহীনতা ও কাজের পরিধি সম্পর্কে। বাংলাদেশ স্পোর্টস অ্যাডভেঞ্চার অ্যান্ড মাউন্টেনিয়ারিং কনফেডারেশনের ফেসবুক গ্রুপ: Bangladesh Sports Adventure & Mountaineering Confedaration।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মাউন্টেনিয়ারিং ফেডারেশনের কর্মপরিধি একটু লক্ষ্য করুন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মাউন্টেনিয়ারিং ফেডারেশনগুলোর দেশভেদে নামের ভিন্নতা থাকলেও (যেমন- ভারতে আইএমএফ, নেপালে এনএমএ বা যুক্তরাজ্যে বিএমসি) এদের কর্মপরিধি বা কাজের ক্ষেত্রগুলো প্রায় একই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ‘বাংলাদেশ স্পোর্টস অ্যাডভেঞ্চার অ্যান্ড মাউন্টেনিয়ারিং কনফেডারেশন’র কোনো কাজ চোখে পড়েনি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অসংখ্য পর্বতারোহী আশাহত হয়ে আজ পর্বতারোহণ স্পোর্টস থেকে সরে দাঁড়ানোর পথ বেছে নিচ্ছেন স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে হত্যা করে। হয়তো খুব শিগগিরই সেই পথ আমাকেও বেছে নিতে হবে। আমি তাদেরই একজন হয়ে আজ হতাশার গল্প বলছি। ক্রীড়াঙ্গনের অন্যান্য ক্রীড়ার মতো যদি সরকার পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে এই সম্ভাবনাময় বৈশ্বিক ক্রীড়া থেকে তরুণ প্রজন্ম লাল-সবুজ পতাকার প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন দেখতে পারবেন না, সাহস পাবেন না।

পর্বতারোহণ একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ খেলা। ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং চরম প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে আমাদের মতো তরুণেরা যখন দেশের জন্য বিশ্বরেকর্ডসহ বিভিন্ন অর্জন বয়ে আনেন, তখন রাষ্ট্রীয় একটু পৃষ্ঠপোষকতা ও উৎসাহ আমাদের আগামীর পথকে আরও সুগম করতে পারে। আপনার সরকারের সহযোগিতা ও নজরদারি থাকলে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এই দুঃসাহসিক ক্রীড়াঙ্গনে দেশের জন্য আরও আন্তর্জাতিক সফলতা ও অনন্য সম্মান বয়ে আনতে পারবেন।

আপনার কাছে একজন এক্সট্রিম স্পোর্টস ব্যক্তি হিসেবে, পর্বতারোহণ এবং এন্ডুরেন্স স্পোর্টসের এই বিরল সাফল্যগুলোকে মূল্যায়ন করার আশা ব্যক্ত করছি। আমাদের এই বীরত্বপূর্ণ প্রচেষ্টাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আওতায় আনা হোক। স্পোর্টস কার্ড এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে এই ক্রীড়াব্যক্তিদের পাশে দাঁড়ালে আমরা সুস্থ ও চ্যালেঞ্জিং অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস জাতি হিসেবে বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে আরও বড় বড় সাফল্য এনে দিতে পারবো।

আপনার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।

বিনীত,
ইকরামুল হাসান শাকিল
সি টু সামিট; এভারেস্টজয়ী পর্বতারোহী।’

এসইউ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।