ফেসবুকে পাওয়া
‘রকস্টার’ সিনেমার ‘পিরিতি’ গান কেমন হলো
কবি হাসান রোবায়েত মারফত যখন জানতে পারি ‘রকস্টার’ সিনেমায় তার লিরিকে গান আসবে—তখনই ভাবছিলাম কোনো কবিতা হতে পারে! পড়েছি নাকি নতুন করে লিখেছেন। যখন জানলাম লিরিকটা নেওয়া হয়েছে ‘ছায়াকারবালা’ কাব্যগ্রন্থ থেকে। তখন একটু ভাবনা কাজ করলো। যারা এই বইটি পড়েছেন; তারা জানেন প্রেমকে পোশাক করে মূলত রাজনৈতিক বাস্তবতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। কবিতাগুলোতে প্রেমবিষয়ক উপাদান থাকলেও কবিতাগুলো রাজনৈতিক সচেতনতার সৃজনশীল প্রকাশ। ফলে আগ্রহ আরও বাড়ল। কোন কবিতা, কী হবে তার সুর, কেমন আয়োজন হবে সংগীতের। এসব নিয়ে ভাবনা খেলা করে। ৮+৬ মাত্রার এরকম কবিতার অহরহ গান শুনেছি কবীর সুমনের সুরে ও গলায়। সেজন্য মনটা সুমনের সুরের দিকে ধাবিত হতে চাইতো।
অপেক্ষা শেষে গানটি মুক্তি পেল। এখন পর্যন্ত দশের বেশি বার শোনা হয়ে গেছে। বিশ্লেষণ করার ইচ্ছে ও ভালো লাগার উভয় টানই কাজ করেছে। গানের প্রথম দৃশ্য, মিউজিক—জেলখানা, কয়েদি, থালাবাসন ও অন্যান্য আয়োজনে হুট করে মগজে চলে আসল ‘আয়নাবাজি’ সিনেমার ‘পাপ জমাই’ গানটা।
পান্থ কানাইয়ের কণ্ঠে আহমেদ সানির সুরে হাসান রোবায়ের ‘পিরিতি’ সুরের দিক থেকে প্রায় উপযুক্ত লেগেছে আমার কাছে। লিরিকের অন্তর্নিহিত অর্থ গানের সুরটা বহন করতে পেরেছে। লিরিকের সারমর্ম এমন—প্রেমঘটিত ব্যর্থতা ও করুণ পরিণতি। লিরিকের অর্থের সাথে সাকিব খানের রিয়েকশন ও সম্ভাব্য চরিত্র সামঞ্জস্যপূর্ণ। কেন যেন মনে হচ্ছে ‘রকস্টার’ সিনেমার পুরো গল্পের হিন্ট এই গানের মধ্যে আছে। লিরিক ও সুর দুঃখমাখা আবহ নিয়ে উপযুক্ত হলেও মিউজিক ঠিক তার উল্টো। মিউজিক ও লিরিকের মধ্যে বৈপরীত্য সৃষ্টি করা হয়েছে। বিষয়টি আপাত অসংগতির মনে হলেও এরও ভালো ব্যাখ্যা দেওয়া যায়।
গানটা কয়েদিদের মুখে গাওয়া। তারা তাদের সময়টা নেচে গেয়ে কাটাচ্ছে। লিরিকের বিষণ্ণতা তাদের জন্য মুখ্য না। এই গানে লিরিকটা লিড করছে সাকিব খানকে আর মিউজিকটা তুলে ধরছে কয়েদিদের আমোদীয় সময়কে। নয়তো আপনি কোনোভাবে মেলাতে পারবেন না যে,
‘পিরিতি জানে না কালা
কোনো সংরাগ
এ প্রাণ ডালিম যেন
ফেটে দুই ভাগ।’
যখন গাওয়া হচ্ছে; তখন কয়েদিরা পুরো নেচে-গেয়ে ফ্লোরে গড়াগড়ি খাচ্ছে কেন। মিউজিক ও লিরিকের কাউন্টার পয়েন্ট দর্শকের জন্য দ্বিধার পরিবেশ তৈরি করবে। তারা স্যাড ও হ্যাপির মাঝামাঝি অবস্থান করবে। ইমোশন ও সুরের টানে থিয়েটার স্তব্ধ হওয়ার কথা থাকলেও মিউজিকের কারণে অর্ধেক থিয়েটার কয়েদিদের মতো কোমর নাড়াবে। এরকম বৈপরীত্যের উদাহরণ সিনেমাতে পূর্বেও পাওয়া যায়।
সাকিব খানের মেকআপ, রিয়েকশন বা অ্যাকশন আমাকে সিনেমাটির প্রতি আগ্রহী করে তুলছে। সাকিবের বুকে খেয়াল করলে দেখা যায় ‘মা’ (সম্ভবত, স্পষ্ট না) লেখা ট্যাটো করা। যদি তা-ই হয়, ধারণা করছি এই সিনেমায় মা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে হাজির হবে। সংগীত আয়োজন, সাউন্ড নিয়ে আমি সন্তুষ্ট না। এখানে কাজ করার মতো আরও জায়গা আছে। সিনেমায় গান দুইভাবে উপস্থাপিত হয়। প্রথমত চরিত্ররা গানের সাথে মুখ নাড়াচ্ছেন; দর্শক সেটা স্পষ্ট জানে। দ্বিতীয়ত চরিত্ররাই গাচ্ছেন তাদের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। ‘পিরিতি’ গানটা দ্বিতীয়টার অন্তর্ভুক্ত। ফলে এই গানে ফ্রেমে যেসব চরিত্র, বাদ্যযন্ত্র দেখানো হবে; সেসবের সাউন্ড দর্শকের কানে আসতে হবে। যদি না আসে তাহলে পুরো ব্যাপারটা বিশ্বাসযোগ্যতার জায়গা হারাবে।
সিনেমার কাজই হলো দর্শকের বিশ্বাস তৈরি করা। এই গানের ফ্রেমে স্টিল বা সিলভারের প্লেট, কলস ও গ্লাসের টোকাটুকি দেখানো হলেও পুরো গানে এসবের সাউন্ড সামান্য করে হলেও কানে আসেনি। এ বিষয়ে সেরা কাজ হয়েছে ‘হাওয়া’ সিনেমার ‘সাদা সাদা কালা কালা’ গানে। সেখানে সর্বোচ্চ ডিটেইলস আছে সাউন্ডে। এ ছাড়া ফ্রেমে দেখা যাচ্ছে কানাই ও মিশু দুজনই মুখ নাড়ছেন অর্থাৎ গান গাচ্ছেন কিন্তু সাউন্ড আসছে শুধু কানাইয়ের।
ওপেনিং সিনেই গান আর লিপস সিঙ্ক হয়নি। সুর ধরেছে—‘তারা নারা তারা নারা’ গাচ্ছে। কিন্তু কানাইয়ের মুখ তখনো বন্ধ। চরিত্র রিয়েল গাচ্ছে এমন গানে জায়গা চেঞ্জ হলে পরিবেশের ইকো মাথায় রেখে টোন কিছুটা চেঞ্জ করা উচিত। সাউন্ড দর্শককে জায়গা সম্পর্কেও ধারণা দেয়। কিন্তু এই গানে জেলের ভেতর ও বাহির দুই জায়গাতেই গান সমান টোনে চলেছে। তেমনটা হওয়ার কথা না। প্রথম টাইপের গান হলে দর্শক সেটা মাথায় নিয়েই আগাতো।
পুরো গানে একটা কন্টিনিউটি ব্রেক চোখে পড়েছে। তেমন বড় কিছু না। জেনারেল দর্শকের চোখে পড়বে না। কিন্তু ফিল্মের স্টুডেন্ট হিসেবে এগুলোও চোখে পড়ে যায়। সাকিব খান দেওয়ালে লিখছেন—‘...আমাকে নিয়ে যাও তোমার সাথে’। শেষে ‘থ’ লেখার পরে মাত্রা টেনে দিয়েছে, স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সেটা। কিন্তু তার পরের সিনেই সেই মাত্রা নেই। গানটার সিনেমাটোগ্রাফি ও এডিটিং ফাইন কিন্তু আমার বন্ধু মেহরাপ বলেছে লাইটিং নিয়ে আরও বেটার কাজ করা উচিত। শুভকামনা ‘রকস্টার’।
এসইউ