ড. কামাল হোসেনরা জামায়াতের ভোটও পাবেন!

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:৫৭ পিএম, ০৩ ডিসেম্বর ২০১৮

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। রাজনীতি ও নির্বাচন প্রসঙ্গ নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র।

সব দলের অংশগ্রহণে দেশে একটি নির্বাচনী পরিবেশ বিরাজ করছে বলে উল্লেখ করেন। ঐক্যফ্রন্টকে স্বাগত জানালেও এর নেতৃত্বের আদর্শ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ‘আদর্শহীন রাজনীতি সমাজের ওপর বিরূপ প্রভাব রাখছে’ বলে মত দেন। আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে শেষটি।

জাগো নিউজ : ঐক্যফ্রন্ট গঠনে রাজনীতির ধারা পরিবর্তিত হচ্ছে- এমনটি মনে করা হচ্ছে। আপনি কী মনে করেন?

আরেফিন সিদ্দিক : নির্বাচন ঘিরে দলগুলোর জোটবদ্ধ রাজনীতি খুবই পুরনো রীতি। আবার নির্বাচন উপলক্ষে জোট ভেঙে যায়। এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

তবে ঐক্যফ্রন্ট গঠনে অস্বাভাবিক বিষয় হচ্ছে আদর্শের বিসর্জন। ড. কামাল হোসেন সাহেবরা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা বলে এমন সব দলের সঙ্গে জোট করলেন, যাদের অনেকেই বাংলাদেশকে স্বীকার করেন না।

ঐক্যফ্রন্টের কোনো কোনো দল সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুর হত্যার সঙ্গে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল। অবাক হচ্ছি, ড. কামাল হোসেনরা জামায়াতের ভোটও পাবেন!

মানুষ রাজনীতি করেন আদর্শের জন্য। সেই আদর্শ যদি না থাকে তাহলে রাজনীতির তো আর কোনো অর্থ থাকে না।

জাগো নিউজ : এই যে আদর্শ বিচ্যুতি! তার মানে গলদ কী আমাদের রাজনৈতিক কাঠামোতেই?

আরেফিন সিদ্দিক : বিচ্যুতির মধ্য দিয়ে কাঠামো ভঙ্গুর হয় এবং আদর্শ বিচ্যুতি ঘটছে পরম্পরায়। এখন আর আদর্শ বলে কিছু নেই। এখন রাজনীতি হচ্ছে শুধুই ক্ষমতায় যাওয়া। নীতি-নৈতিকতা বাদ দিয়ে সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থ নিয়েই রাজনীতি করা। এটি অবশ্যই দুঃখজনক। যারা স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলছেন, তারাই আজ স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তির সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন।

জাগো নিউজ : রাজনীতির এই অবনমন সামগ্রিকভাবে দেখা যায় কিনা? আওয়ামী লীগও হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে…

আরেফিন সিদ্দিক : হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে রাজনৈতিক কোনো আঁতাত হয়েছে বলে আমি মনে করি না। কওমি মাদরাসার লাখ লাখ শিক্ষার্থী আধুনিক শিক্ষার বাইরে। বিশাল একটি জনগোষ্ঠীকে মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে রেখে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। সরকার সেই তাগিদ অনুভব করেছে। এ কারণেই তাদের সনদ দেয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া হলো। এর সঙ্গে রাজনৈতিক জোটের সম্পর্ক আছে বলে মনে করি না।

জাগো নিউজ : কিন্তু নির্বাচন সামনে রেখে কওমি সনদের স্বীকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে…

আরেফিন সিদ্দিক : আওয়ামীবিরোধীরাই এমন প্রশ্ন তুলছেন। দেশে এখন দুই ধারায় রাজনীতি হচ্ছে। একটি হচ্ছে আওয়ামী লীগ, আরেকটি হচ্ছে আওয়ামী লীগবিরোধী। ২০ দলীয় জোটের প্রকাশ আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করেই। এখন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যুক্ত হলো।

আওয়ামী লীগবিরোধী শিবির থেকে যেকোনো বিষয়ে বিরোধিতা আসবে- এটাই স্বাভাবিক। আওয়ামী লীগ এই সমালোচনা মোকাবেলা করেই এগিয়ে যাচ্ছে।

জাগো নিউজ : ঐক্যফ্রন্ট সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে কিনা?

আরেফিন সিদ্দিক : আমি চ্যালেঞ্জ মনে করছি না। প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করেছে ঐক্যফ্রন্ট।

জাগো নিউজ : নির্বাচন ব্যর্থ হওয়ার কোনো আশঙ্কা করছেন?

আরেফিন সিদ্দিক : এখন পর্যন্ত এমন কোনো শঙ্কা প্রকাশের কারণ তৈরি হয়নি। এমন কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়নি, যা নির্বাচনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। আমি মনে করি, নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু হবে।

জাগো নিউজ : বিরোধী পক্ষের নেতাদের সাজা হচ্ছে, মামলা হচ্ছে, গ্রেফতার হচ্ছে। শঙ্কা তো আছেই…

আরেফিন সিদ্দিক : মাঠ ঠিক রাখার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। তফসিল ঘোষণার পরই নির্বাচন কমিশন প্রার্থীদের সুরক্ষা দেবে। অভিযোগ আসলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগ না থাকলে তা গণমাধ্যমে প্রচার করবে। এতে জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে।

আমি মনে করি, অতীতে কী হয়েছে, তা ভুলে গিয়ে রাজনীতির সঠিক পথে সবাইকে হাঁটা উচিত। ২১ আগস্টের মতো আর কোনো ঘটনা না আসুক, তা সবারই কামনা।

জাগো নিউজ : নির্বাচন না হওয়ার কথাও প্রচার আছে। আপনি কী মনে করেন?

আরেফিন সিদ্দিক : নির্বাচন না হওয়ার কোনো কারণ নেই। প্রজাতন্ত্রে সঠিক সময়ে নির্বাচন না হলে সাংবিধানিক শূন্যতা দেখা যায়। ‘নির্বাচন নাও হতে পারে’- এমন প্রশ্ন রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর।

জাগো নিউজ : প্রত্যাশিত না হলে নির্বাচন ব্যর্থ হয়েছে, আবার আটকেও গেছে…

আরেফিন সিদ্দিক : হ্যাঁ, মানুষ প্রশ্ন তোলে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে। আমরা সেই অতীতে যেতে চাই না। আমরা গণতান্ত্রিক পথে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। রাতারাতি একটি উত্তম গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যায় না। কিন্তু আমরা তো চেষ্টা করতে পারি।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় শুধু ক্ষমতাসীনদের দায়িত্ব নয়। সকলের দায়িত্ব রয়েছে। বিরোধী দল, গণমাধ্যম, জনসাধারণ- সবারই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে।

এছাড়া রাজনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিকভাবেই সমাধান করা দরকার।

জাগো নিউজ : অধিক সংখ্যক প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন এবারের নির্বাচনে। চমক নেই আওয়ামী লীগের মনোনয়নে। অভিযুক্ত সংসদ সদস্যরাই ফের প্রার্থী হচ্ছেন…

আরেফিন সিদ্দিক : একটি আসনে দলগুলো একাধিক প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে কৌশলগত অবস্থান থেকে। তবে আমি মনে করি, দলগুলো অবশ্যই চেষ্টা করবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রার্থী বাছাইয়ে। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিরসনে দলগুলো কাজ করবে। রাজনীতিতে দ্বন্দ্ব থাকবেই। তবে সেটা যেন আত্মঘাতী না হয়।

আর আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকায় চমক তো আছেই। প্রায় ৫০টি আসনে নতুন মুখ। এটি তো বড় খবর। বেশ কয়েকজন তরুণ এসেছেন। পরিবর্তন আসছে।

এএসএস/এমএআর/আরআইপি

যারা স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলছেন, তারাই আজ স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তির সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন

২০ দলীয় জোটের প্রকাশ আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করে। এখন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যুক্ত হলো

‘নির্বাচন নাও হতে পারে’- এমন প্রশ্ন রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর

রাজনীতিতে দ্বন্দ্ব থাকবেই। তবে সেটা যেন আত্মঘাতী না হয়

আপনার মতামত লিখুন :