সংলাপই সরকারকে চাপে ফেলেছে

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:২৫ পিএম, ২৭ নভেম্বর ২০১৮

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক। সাবেক নির্বাচন কমিশনার। অধ্যাপনা করছেন বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

নির্বাচন প্রসঙ্গ নিয়ে সম্প্রতি মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র। প্রশ্ন তোলেন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে। কমিশনের বিদ্যমান আইন ও কাঠামোতেই নির্বাচন সুষ্ঠু করা সম্ভব বলে মত দেন। ‘একাদশ সংসদ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য না হলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে’ বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেন এ বিশ্লেষক। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে শেষটি।

আরও পড়ুন >> ইসি সচিব বেশি কথা বলছেন

জাগো নিউজ : নির্বাচন ঘিরে রাজনীতি এখন দুই মেরুতে। ঐক্যফ্রন্টের অগ্রযাত্রা সরকারের জন্য কতটুকু চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারছে বলে মনে করেন?

সাখাওয়াত হোসেন : আমি মনে করি, ঐক্যফ্রন্টের যাত্রা সরকারের জন্য ইতিবাচক। সরকারে দৃশ্যমান স্বস্তি মিলছে বলেও মনে করি। কারণ গত পাঁচ বছর সরকার চাপে ছিল। দেশের বৃহত্তম একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এটি সরকারের জন্য সুখের ছিল না।

ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর সরকারের পক্ষ থেকে স্বাগত জানানো হয়েছিল। আমরা অবশ্য সংলাপেরও আয়োজন দেখলাম। যদিও এর ফলাফল নিয়ে তেমন প্রত্যাশা ছিল না। কিন্তু এমন আয়োজন রাজনীতির জন্য ইতিবাচকই বটে।

জাগো নিউজ : কিন্তু সংলাপ তো আপাতত ব্যর্থ। এমন আয়োজনের সার্থকতা কী?

সাখাওয়াত হোসেন : বৈরী মনোভাবসম্পন্ন দুটি পক্ষ আলোচনায় বসেছে, এটিই সার্থকতা। দাবি মানলে এক হিসাব, না মানলে আরেক হিসাব। দাবি না মানলে বিরোধী পক্ষ সরকারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টির সুযোগ পাবে।

জাগো নিউজ : এ চাপ আগেও ছিল। সরকার পাত্তা দেয়নি…

সাখাওয়াত হোসেন : বিরোধী পক্ষ নিজেরাও জানতো সরকার এসব দাবি মানার অবস্থায় নেই। বিশেষ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারলে এসব মানবে কেন? বিরোধী জোট সেই পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেনি।

আরও পড়ুন >> জনগণের শক্তিকেই সামনে আসতে হবে

কিন্তু দাবি না মানলেও তো সুষ্ঠু ভোট হতে হবে। কারণ সরকারকে তো যেকোনো একটি পথ অবলম্বন করতে হবে। সবসময় একই কৌশলে ক্ষমতায় থাকা যায়, তা মনে করার কোনো কারণ নেই।

আর প্রধানমন্ত্রী তো নিজেই বারবার বলছেন, নির্বাচনে ফল যাই আসুক আমি মেনে নেব। তিনি ভোট সুষ্ঠু করার প্রতিশ্রুতিও দিয়ে আসছেন বারবার। ফলাফল কী হয় সেটা পরের হিসাব, কিন্তু সংলাপ-ই সরকারকে চাপে ফেলেছে। নির্বাচন সুষ্ঠু করা নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্ব হলেও একক নয়।

জাগো নিউজ : নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে?

সাখাওয়াত হোসেন : ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর সরকারও খুব স্বস্তিতে ছিল না। এ কারণেই আমি মনে করি, সরকারের সঠিক উপলব্ধি হয়েছে।

আর নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে বিপদ আরও বাড়বে। সমাজে অস্বস্তি রয়েছে তা আপনি-আমি যতটা উপলব্ধি করছি তার চাইতে বেশি উপলব্ধি করছে সরকার।

বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন কোনো দেশ নয়। আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে তাল মিলিয়েই চলতে হয়। গার্মেন্টস পণ্যের ওপর আমাদের অর্থনীতি নির্ভর করে। শান্তিরক্ষা মিশনে হাজার হাজার সেনা বাইরে। লাখ লাখ প্রবাসী বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন। তাই বিশ্বকে অস্বীকার করে চলার উপায় নেই।

বাংলাদেশ এখন ১৯৭৫, ১৯৮১ বা ১৯৯১ সালের জায়গায় নেই। ২০১৮ সালের বাংলাদেশ নিয়ে আপনাকে সুস্থ চিন্তা করতে হবে। গতবার মানুষ ভোট দিতে পারেনি। এবার প্রত্যাশা করছে ভোট দেয়ার। সেই ভোট দেয়ার অধিকার যদি বারবার হরণ করা হয়, তাহলে তা সরকারের উপরেই বর্তাবে। এ অপবাদ থেকে সরকার রেহাই পাবে না।

জাগো নিউজ : এই প্রশ্নে উগ্রবাদ ...

সাখাওয়াত হোসেন : জঙ্গিবাদের এক ধরনের ঢেউ থাকে। আল-কায়দা ও তালেবানের সময় আমরা ঢেউ দেখলাম। তবে সেই ঢেউ আমাদের এখানে স্থায়ী রূপ পাবে, তা মনে করি না। এখানে ধর্মীয় উগ্রবাদ টেকসই হবে না। এখানকার মানুষ ধার্মিক কিন্তু ধর্ম নিয়ে উন্মাদনা বিশ্বাস করে না।

আরও পড়ুন >> কঠিন হলেও বিরোধীপক্ষ খেলতে চাইবে এবার

তবে স্বাধীনতার সব রাস্তা বন্ধ হলে যেকোনো ঘটনাই ঘটতে পারে। এক্ষেত্রে শুধু ধর্ম নয়, যেকোনো চেতনা থেকেই উগ্রবাদের বিস্তার ঘটতে পারে। সে উগ্রবাদ ডান বা বামপন্থা থেকেও হতে পারে। রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে চরমপন্থীরা সুযোগ নিতেই পারেন।

জাগো নিউজ : শঙ্কার জায়গা থেকে অনেকেই নির্বাচন না হওয়ার কথাও বলছেন। আপনি কী বলবেন?

সাখাওয়াত হোসেন : আমি তা মনে করি না। নির্বাচন না হওয়ার কোনো কারণ দেখি না। দেশি-বিদেশি এমন কোনো কারণ তৈরি হয়নি যে নির্বাচন বিলম্ব হতে পারে। নির্বাচন হবেই।

জাগো নিউজ : ১/১১-এর পর নির্বাচন পিছিয়ে গেল। আপনারা দুই বছর পর নির্বাচন দিলেন…

সাখাওয়াত হোসেন : ১/১১ কী কারণে তৈরি হয়েছিল, তা সবারই জানা। সেই প্রেক্ষাপট এখন নেই। আর দুই বছর পর হলেও তো নির্বাচন দিতে হবে। নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। নির্বাচন না হলে অন্য শক্তি আসবে। তারা তো সংবিধানের ওপর ভর করে আসবে না। এখন বাংলাদেশে আগের সেই পরিস্থিতি নেই।

জাগো নিউজ : অতীতের ‘পরিস্থিতি’ তো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই তৈরি হয়েছে…

সাখাওয়াত হোসেন : এমন পরিস্থিতি কারও জন্যই শুভকর নয়। আর রাজনীতিবিদরা চাইবে না অন্য কোনো শক্তি ক্ষমতায় আসুক। এ কারণে নির্বাচনেই সমাধান। বিশ্বের কাছেও সরকারের এক ধরনের প্রতিজ্ঞা রয়েছে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য।

জাগো নিউজ : এবারের নির্বাচনে ভারতের হস্তক্ষেপ কেমন প্রত্যক্ষ করছেন?

সাখাওয়াত হোসেন : ২০১৪ সালে যেভাবে হস্তক্ষেপ করেছিল, এবার তা করবে বলে মনে করি না। সময় অনেক গড়িয়েছে। গোপনে কী হচ্ছে তা ভিন্ন বিষয়! তবে এখন প্রকাশ্যে তারা বলছে, বিশেষ কোনো দলের সঙ্গে নেই তারা।

জাগো নিউজ : অনেকেই ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত ঐক্যফ্রন্টকে ভারতের ‘বি টিম’ বলে। এ নিয়ে আপনার অভিমত কী?

সাখাওয়াত হোসেন : এ ব্যাপারে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।

জাগো নিউজ : সংকট উত্তরণে আপনার পরামর্শ কী?

সাখাওয়াত হোসেন : নির্বাচন কমিশনের যে ক্ষমতা ও কার্যবিধি রয়েছে, তা যথাযথ প্রয়োগ করলেই সমাধান মিলবে।

নির্বাচন কমিশনকে অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা করার কথা। যদি না করে তাহলে কমিশন জনগণকে বোঝাতে পারবে। কমিশন তো দায় এড়াতে পারবে না।

আরও পড়ুন >> একত্রিত হলেই রাজনীতির মাঠে ঐক্য অটুট থাকে না

জাগো নিউজ : নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা যথেষ্ট বলে মনে করেন?

সাখাওয়াত হোসেন : যতটুকু আইন আছে, তার প্রয়োগ করতে পারলে ভোট সুষ্ঠু হবে। তবে আমি মনে করি রিটার্নিং অফিসারের সংখ্যা আরও বাড়ানো দরকার। একজনের অধীন একাধিক নির্বাচনী আসন থাকা মানে পক্ষপাতের ঝুঁকি বাড়ানো। একটি জেলায় একাধিক রিটার্নিং অফিসার থাকলে ভারসাম্য থাকে, জবাবদিহিতা থাকে। ভারতসহ উপমহাদেশের অন্যান্য দেশে এ ধরনের নিয়োগের ব্যবস্থা থাকে। বাংলাদেশেও এ ব্যবস্থা সম্ভব। এজন্য আইনের পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। আরপিও-তে বিধান রয়েছে। অথচ আমরা এখনও ঔপনিবেশিক রীতি থেকে বের হতে পারিনি।

এএসএস/এমএআর/এমএস

ঐক্যফ্রন্টের যাত্রা সরকারের জন্য ইতিবাচক। সরকারে দৃশ্যমান স্বস্তি মিলছে বলেও মনে করি

বৈরী মনোভাবসম্পন্ন দুটি পক্ষ আলোচনায় বসেছে, এটিই সার্থকতা

নির্বাচন সুষ্ঠু করা নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্ব হলেও একক নয়

দেশি-বিদেশি এমন কোনো কারণ তৈরি হয়নি যে নির্বাচন বিলম্ব হতে পারে। নির্বাচন হবেই

আপনার মতামত লিখুন :