দীপ্তিদের হাতের ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে কৃষি অঞ্চল ঠাকুরগাঁও


প্রকাশিত: ০৩:১৭ পিএম, ১১ জুলাই ২০১৬

কিছুদিন আগেও কৃষকের অভাবে যে জমিগুলো অনাবাদী পড়ে থাকতো সেগুলোতে এখন আবাদ হচ্ছে দীপ্তিদের হাতে ছোঁয়ায়। এতে যেমন বিপ্লব ঘটছে কৃষিতে, তেমনি স্বচ্ছলতার মুখ দেখছে তাদের পরিবারগুলো। অথচ আগে তারা স্বামীনির্ভর সাংসারিক কাজে ব্যস্ত ছিলেন। স্বামী সারাদিন বাইরে কাজ করে যা আয় করেন, সেই টাকায় সন্ধ্যায় বাজার করে বাড়িতে ফিরতেন। এতে খেয়ে পড়েই সব কিছু শেষ হয়ে যেতো তাদের। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে সেই কবল থেকে রক্ষা পেয়েছেন তারা। এখন স্বামীদের পাশাপাশি মাঠে সরাসরি কাজ করছেন দীপ্তি রানীর মতো অসংখ্য নারী। আর এ কারণে এখন তাদের সন্তানরা স্কুলে যেতে পারছে। চলাফেরা করতে পারছে সমাজের অন্যসব মানুষের সঙ্গেও।

বদলে যাওয়া এই এলাকাটি হলো ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বেগুনবাড়ী ইউনিয়নের কাছারিপাড়া গ্রাম। দীপ্তি রানীরা ওই গ্রামেরই খাদ্য উৎপাদক।

dipto

সোমবার দুপুরে ওই গ্রামেই এক জমির পাশে অনেকক্ষণ ধরে মনের জমানো কথাগুলো প্রকাশ করলেন তিনি। কেমন আছেন, কৃষি কাজে অনেক কষ্ট তাই না এই দুটি প্রশ্ন দীপ্তি রানীর কাছে।

দুটি প্রশ্নেই সকল উত্তর বেরিয়ে এসেছে সহজ সরল এই কৃষাণী নারীর মুখ থেকে। এসময় দীপ্তির ক্লান্ত মুখটিতে হাসি ফুটে ওঠে। অবাক হন তিনি ভালো মন্দ জানতে চাওয়ায়।

দীপ্তি জানান, কিছুদিন আগে তার স্বামী কাজ করতো মাঠে। তখন তিনি বাড়ি থাকতেন। অভাব-অনটনের কারণে ছেলেও স্কুলে যেত না। অভাব মিটাতে তিনিও একসময় স্বামীর সঙ্গে কৃষিকাজে মাঠে নেমে পড়েন। এরপর থেকে তাদের সংসারে অনেকটাই অভাব দূর হয়েছে। এখন তিনি সংসার চালানোর পর কিছু টাকা সঞ্চয়ও করতে পারেন। ছেলেটাও এখন নিয়মিত স্কুল যাওয়া আসা করছে।

dipto

তিনি বলেন, ‘হামার নিজের কোনো জমি নাই। মাইনছির জমির কাম করি খাই। কিছুদিন আগতও হামার এলাকার কামের লোক ছিল নাই। তখন অনেক জমি পড়ি ছিলো। কুনহই আবাদ হছিল নাই। এলা অনেক কামের মাইনছি। আশপাশের সব জমিত এলা ধান হয়।’

দীপ্তি জানালেন, এখন তারা চুক্তিতে কৃষিজমিতে কাজ করছেন। এক বিঘা জমিতে ধান রোপণ করতে তারা এক হাজার ১০০ টাকা করে নিচ্ছেন। ১০ জনের দল রয়েছে দীপ্তি রানীদের। সেই মোতাবেক সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দুই বিঘা জমিতে কাজ করতে পারেন তারা। এতে জনপ্রতি ২০০ টাকার উপরে পান।

তিনি বললেন, তাদের দলের সবাই নারী। এদের মধ্যে দল নেত্রী হলেন ঝকঝকি নামে এক নারী। তিনিই মূলত কাজের চুক্তি করেন বিভিন্ন জায়গায়।

তিনি জানালেন, কৃষিতে অনেক খরচ থাকায় এবং কৃষি শ্রমিক না পাওয়ায় অনেক আবাদী জমিতে কৃষিপণ্য ফলাতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন কাছারিপাড়া গ্রামের অনেকেই। কিন্ত এখন অনেক কৃষি শ্রমিক থাকায় অনেকে আগ্রহ ফিরে পাচ্ছেন বলে জানালেন।

দীপ্তি জানান, কৃষিকাজ করে কৃষকের কোনো লাভ থাকে না। তিন থেকে চার মাস কষ্ট করে শ্রম, সার, বীজ ও পানির পেছনে টাকা খরচ করে থাকলেও ধান কাটার পর বাজারে নিয়ে গেলে করুণ দশা। ধানের কোনো দাম নেই।

dipto

কথা হয় দলনেত্রী ঝকঝকির সঙ্গেও। তিনি বলেন, ‘হামরা কামের মানুষ কাম করে খাই। কিছুদিন পর বুঝি আর কাম পামো নাই। কারণ সরকার তো কৃষকের দিক তাকায় না। হামার এইত্তি যদি লোক জমিত ধান না নাগাই তাহলে হামাক না খায় থাকিবার হবে। সরকার ধানের দাম বাড়ালেই দেশেত বেশি বেশি ধান হবে।’

পাশেই কাছারিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেখানে গিয়ে দেখা যায় এলাকাটি হিন্দু অধ্যুষিত হওয়ায় ৯৫ ভাগ ছাত্রছাত্রী সেখানে হিন্দু।

বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক আব্দুর রহিম জানালেন, কিছুদিন আগেও এই এলাকার কোনো বাড়ি থেকে ছেলে মেয়ে স্কুলে আসতো না। তবে এখন নিয়মিত আসছে।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন এই স্কুলে চাকরির সুবাদে দেখেছি এলাকার প্রতিটি মানুষ খুবই অভাবী ছিল। এখন সেই বাড়িগুলোতেই গিয়ে দেখা যায় অন্যরকম চিত্র। তবে তাদের খুব কষ্ট হয়, যখন কোনো কাজ থাকে না। তখন না খেয়ে থাকতে হয় অনেক পরিবারকে।

এমএএস/এসএইচএস/এবিএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।