বছর ঘুরতেই ৭৩ শতাংশ পলিসি নেই সানলাইফের


প্রকাশিত: ১০:৫৮ এএম, ১৯ মার্চ ২০১৭
বছর ঘুরতেই ৭৩ শতাংশ পলিসি নেই সানলাইফের

বছর ঘুরতেই ‘নাই’ হয়ে গেছে সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের নতুন বিক্রি করা ৭৩ শতাংশ পলিসি। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানটি ২০১৫ সালে যে পলিসি বিক্রি করেছিল ২০১৬ সালে এর মাত্র ২৬ দশমিক ৯০ শতাংশ নবায়নে আদায় হয়েছে।

ফি-বছর মোটা অঙ্কের পলিসি বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি প্রতিবারই আইন লঙ্ঘন করে গ্রাহকদের টাকা মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় করছে কোম্পানিটি। ফলে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রাহকদের বিমা দাবির টাকা পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে জীবন বিমা প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৬ সাল শেষে বিমা দাবি উত্থাপিত হলেও প্রায় আড়াই হাজার গ্রাহকের দাবির টাকা পরিশোধ করতে পারেনি সানলাইফ। প্রতিষ্ঠানটির এমন অবস্থার কারণে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে কমে যাচ্ছে পলিসি বিক্রি ও প্রিমিয়াম আয়। ২০১৬ সালে প্রিমিয়াম আয় ২৪ শতাংশের উপরে কমে গেছে। ভাঙতে হয়েছে বিনিয়োগও।

অনুসন্ধানে জানা যায়, শেষ সাত বছরে সানলাইফ ব্যবস্থাপনা ব্যয় খাতে সীমা লঙ্ঘন করে ১২৮ কোটি ৪০ লাখ টাকার উপরে অবৈধ খরচ করেছে। এর মধ্যে শেষ বছরে অর্থাৎ ২০১৬ সালেই অবৈধভাবে ব্যয় করা হয়েছে ১৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এর আগের বছর ২০১৫ সালে অবৈধভাবে ব্যয় করা হয় ২৯ কোটি ৪ লাখ টাকা। ২০১৪ সালে এই অবৈধ ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১০ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।

এছাড়া ২০১৩ সালে ১৯ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, ২০১২ সালে ২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, ২০১১ সালে ১৯ কোটি ২২ লাখ টাকা এবং ২০১০ সালে সাত কোটি ৭৮ লাখ টাকা অবৈধভাবে খরচ করা হয়। অর্থাৎ প্রতি বছরই প্রতিষ্ঠানটি ব্যবস্থাপনা খাতে মোটা অঙ্কের টাকা অবৈধভাবে খরচ করছে।

ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের খাতে কোম্পানিটি অবৈধভাবে যে অর্থ ব্যয় করেছে এর ৯০ শতাংশ বিমা গ্রাহক (পলিসি হোল্ডার) এবং বাকি ১০ শতাংশ শেয়ার গ্রাহকদের (শেয়ারহোল্ডার) প্রাপ্য। অর্থাৎ ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের খাতে অতিরিক্ত খরচ করা না হলে এই টাকা পলিসি হোল্ডার ও শেয়ার হোল্ডাররা বোনাস হিসেবে পেতেন।

মাত্রাতিরিক্ত অর্থ অবৈধভাবে খরচ করায় প্রতিষ্ঠানটির রিজার্ভেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে কোরো সারপ্লাস অর্থ নেই। অথচ ২০১৫ সালে কোম্পানিটির ১৪ কোটি ৪৫ লাখ এবং ২০১৪ সালে ২৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা সারপ্লাস ছিল।

গ্রাহককে ফাঁকি দিতে অবৈধ ব্যয়ের পাশাপাশি প্রতি বছর মোটা অঙ্কের পলিসি তামাদি করে দিচ্ছে এই সানলাইফ। ২০১৬ সালে কোম্পানিটির ৬১ হাজার ১৪২টি পলিসি তামাদি হয়ে গেছে। আগের বছর ২০১৫ সালে ৫৫ হাজার ২৫০টি এবং ২০১৪ সালে ৩৫ হাজার ১৬০টি পলিসি তামাদি হয়।

এদিকে, ২০১৫ সালে গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করা পলিসির সিংহভাগ প্রিমিয়াম ২০১৬ সালে নবায়ন বাবদ আদায় করতে পারেনি সানলাইফ। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি নতুন পলিসি বিক্রি করে প্রিমিয়াম আয় করে ৮১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। ২০১৬ সালে নবায়নে যার ২৬ দশমিক ৯০ শতাংশ বা ২১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা আদায় হয়েছে।

পলিসি তামাদি হওয়ার কারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে নবায়ন প্রিমিয়াম আয়ে। ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠানটির নবায়ন প্রিমিয়াম আয় কমেছে ১৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। বছরটিতে নবায়ন প্রিমিয়ামের মাত্র ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ আদায় হয়েছে।

২০১০ সালের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি কোনো বছরই নবায়ন প্রিমিয়ামের ৫০ শতাংশও আদায় করতে পারেনি। কোম্পানিটি ২০১০ সালে ৩১ দশমিক ৭০ শতাংশ, ২০১১ সালে ৩৫ দশমিক ৩২ শতাংশ, ২০১২ সালে ৩৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ২০১৩ সালে ৩০ দশমিক ৯৯ শতাংশ, ২০১৪ সালে ৩৬ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং ২০১৫ সালে ৪৪ দশমিক ৯ শতাংশ নবায়ন প্রিমিয়াম আদায় করতে সক্ষম হয়েছে।

এদিকে, অবৈধভাবে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করায় দুর্বল হয়ে পড়ছে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থা। ফলে বিমা পলিসির মেয়াদ শেষ হলেও বড় অঙ্কের গ্রাহকের দাবির টাকা অপরিশোধিত থেকে যাচ্ছে।

গত নভেম্বর শেষে দুই হাজার ৩১১ জন গ্রাহকের বিমার দাবির টাকা অপরিশোধিত ছিল। আর ডিসেম্বর শেষে দাবির টাকা না পাওয়া গ্রাহকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৪১০ জনে।

প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৫ সালে সানলাইফের বিনিয়োগ ছিল ২৮৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। যা ২০১৬ সাল শেষে দাঁড়িয়েছে ২৫১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থাৎ ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগ তো বাড়েনি বরং ৩৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা বিনিয়োগ ভেঙেছে।

এসব অনিয়মের বিষয়ে জাগো নিউজের পক্ষে সানলাইফের চেয়ারম্যান রুবিনা হামিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না। আপনি আমাদের কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

একাধিবার মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সোলায়মান হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এমএএস/এমএমএ/এমএআর/এমএস