সিঙ্গাপুরে সাড়ে ৪ দিনে সম্পত্তি নিবন্ধন, বাংলাদেশে ২৪৪ দিন

প্রকাশিত: ০৩:৩৩ পিএম, ১৬ মে ২০১৭
সিঙ্গাপুরে সাড়ে ৪ দিনে সম্পত্তি নিবন্ধন, বাংলাদেশে ২৪৪ দিন

গত পাঁচ বছরে দেশের অবকাঠামো খাতে বেশকিছু পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু বদলায়নি বিনিয়োগের চিত্র। কোনোভাবেই বিনিয়োগের খরা কাটছে না। প্রতি মাসেই কমছে নিবন্ধন। এভাবে টানা কয়েক বছর ধরে দেশে বিনিয়োগের দুর্দিন চলছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগের পরিমাণ তলানিতে এসে ঠেকেছে। বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবায়নের মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এজন্য অনুকূল পরিবেশের ওপর দায় চাপানো হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, জমি রেজিস্ট্রেশন, ঋণের সুদের হার, অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতাই বিনিয়োগে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে একধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। জাগো নিউজের পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত অনুসন্ধানীমূলক চার পর্বের নিবন্ধের তৃতীয় পর্ব আজ প্রকাশিত হলো-

সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী ৮ শতাংশ জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধি অর্জনে ৩২ দশমিক ৩৫ শতাংশ বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে জিডিপিতে ২৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ বিনিয়োগ বিদ্যমান। তাই স্থানীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো অত্যাবশ্যকীয়। কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগের জন্য বরাবরই হা-হুতাশ করছে বাংলাদেশ।

বিপুল আগ্রহ নিয়ে বিনিয়োগ করতে এসে এ দেশের নানা আইনি-বেআইনি ব্যবস্থার জটিলতায় পড়ে ফিরে যেতে হচ্ছে বিদেশিদের। সস্তাশ্রম ও ইউরোপসহ উন্নত দেশগুলোতে জিএসপি সুবিধার হাতছানিতে ছুটে আসা বিদেশি ব্যবসায়ীদের বিমুখ হতে যেন সময় লাগে না।

সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রারম্ভিক অনুমোদন অর্থাৎ ব্যবসার শুরুতে সম্পত্তি নিবন্ধনে সময় লাগে ২৪৪ দিন। অথচ এশিয়া মহাদেশের অন্য দেশ সিঙ্গাপুরে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে সময় লাগে মাত্র সাড়ে চারদিন।

দেশে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে সম্পত্তি নিবন্ধনে দেরি হওয়ার বিষয়টি অন্যতম বলে মনে করছে বিডা। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি সর্বনিম্ন ২২ দিনে কীভাবে নিবন্ধন করা যায় সে পথও বাতলে দিয়েছে সরকারি সংস্থাটি। বিডার প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

গবেষণায় বিডা বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ব্যবসায় পরিবেশ সূচক আমলে নিয়েছে। ১০টি খাতের ১০টি সূচক একত্রিত করে সার্বিক সূচকে ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দেখানো হয়েছে ১৭৬ নম্বরে। স্থানীয় ও বিদেশিদের বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে ১০টি খাত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঢেলে সাজানোর সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। এসব খাত নিয়ে পর্যায়ক্রমে গবেষণা ও সুপারিশমালা প্রস্তুত করছে সরকারি এ সংস্থা। সম্প্রতি সংস্থাটি অন্যতম অগ্রাধিকার খাত হিসাবে সম্পত্তি নিবন্ধনে সমস্যা শীর্ষক এক প্রতিবেদন অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।

ওই প্রতিবেদনের বলা হয়েছে, বাংলাদেশে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রাথমিকপর্যায়ে সম্পত্তি নিবন্ধনে সময় লাগে ২৪৪ দিন। অথচ এশিয়া মহাদেশেরই অন্য দেশ সিঙ্গাপুরে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে সময় লাগে মাত্র সাড়ে চার দিন, কোরিয়াতে সময় লাগে মাত্র সাড়ে ছয় দিন এবং ভুটানে সময় লাগে ৭৭ দিন। এছাড়া নিউজিল্যান্ডে একই কাজ সম্পন্ন করতে সময় লাগে মাত্র এক দিন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিনিয়োগ বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগের বড় বাধা হচ্ছে নিবন্ধন জটিলতা। তাই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোতে এসব কাজে গতি আনার সুপারিশ করা হয়েছে। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো অনলাইনের আওতায় আনার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

‘বাংলাদেশে বিদেশিদের বিনিয়োগে বাধা’র বিষয়ে জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অরগানাইজেশন (জেট্রো) একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা বাধাগুলো হলো- শিল্প ও সেবাখাতে বিদেশি বিনিয়োগের আইন-কানুন ও অবস্থা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকা; ইউডি না দেয়ার মাধ্যমে বিজিএমইএ দ্বারা পোশাক খাতে বিনিয়োগে পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা আরোপ; কেন্দ্রীয়ভাবে সংশ্লিষ্ট আইন-কানুন ও বিধি-বিধান ইংরেজিতে রূপান্তর না করা; বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিশালী ওয়ান স্টপ সার্ভিস ব্যবস্থা না থাকা; জমির ধরন ও মালিকানা নির্ণয়ে জটিলতা; বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুমোদন পেতে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর জটিলতা; স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে রাজস্ব বোর্ডে ‘বিক্রয় মূল্য’র নিবন্ধন জটিলতা; চলতি মূলধন জোগাতে বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা; বৈদেশিক মুদ্রায় অ-বাণিজ্যিক রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে বাধা; বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থায় স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা না থাকা;  বাজার মূল্যের সঙ্গে তুলনা করে শুল্কারোপ করা, যা প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি; স্থানীয় জনবল নিয়োগে বাধ্যবাধকতা এবং পিপিপি (সরকারি-বেসরকারি অংশীদার) আইন কার্যকর না হওয়া।

ওই প্রতিবেদনে জমির নিবন্ধন জটিলতা বেশ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশে জমির পরিচয়, মালিকানা চিহ্নিতকরণ ও রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া জটিল বলে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবহার উপযোগী জমির স্বল্পতাও বিনিয়োগের পথে বড় বাধা। ঢাকা ও চট্টগ্রামের কাছে ইপিজেডগুলোয় জমি প্রায় নেই। এমনকি কেউ উপযুক্ত জমি খুঁজে পেলেও তার মালিকানা ও অন্যান্য বিষয় নিশ্চিত হওয়া যায় না। উত্তরাধিকার সূত্রে জমি বণ্টন হওয়ায় তার মালিকানায় ভেজাল থাকে। ভূমি রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সব সময়ই জটিল পরিস্থিতিতে পড়েন বিনিয়োগকারীরা।

ভূমি অফিসগুলোর সেবাও খুব নিম্নমানের, শ্লথগতির এবং প্রায়ই দুর্নীতিতে ভরা। আর ভূমি অফিসগুলোও আইন মেনে চলে না। বাংলাদেশে ৬৩টি সাব-রেজিস্ট্রার অফিস রয়েছে, যার পাঁচটি ঢাকায়। এ ক্ষেত্রে জেলার সীমানা অনুযায়ী কোন অফিসে যেতে হবে, তাও পরিষ্কার নয়। এ অবস্থায় বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে যারা জমি কিনতে চান, তাদের ভয়াবহ খারাপ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়।

দেশের অর্থনীতির অগ্রযাত্রার স্বার্থে সরকারকে বিনিয়োগের বাধা দূর করে, ব্যবসার খরচ কমিয়ে অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক কাজের জোর সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সচিব অমিত কুমার পাল জাগো নিউজকে বলেন, বিশ্ব ব্যাংকের প্রকাশিত ব্যবসায় পরিবেশ সূচকে ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে ১৭৬ নম্বরে। ২০২১ সালের মধ্যে এ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৬ ধাপ কমিয়ে কিভাবে প্রথম ১০০ দেশের তালিকায় আনা যায়, তার কর্মপরিকল্পনা হতে নিয়েছে বিডা। এ জন্য আমাদের অনেক সংস্কার করতে হবে। যেসব জায়গায় দুর্বলতা আছে সেগুলো সবল করতে হবে। আইন সহজ করতে হবে।

তিনি বলেন, নিবন্ধন প্রক্রিয়াগুলো অটোমেশন সিস্টেমের আওতায় আনতে হবে। ব্যবসা শুরুর সময় কমানোর পাশাপাশি খরচ কমাতে হবে। যাতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে সহজে বিনিয়োগ করতে পারে এবং বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে।

এসব বাস্তবায়নে বিডা কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে আইন সংস্কারের কথা বলেছি। গ্যাস, বিদ্যুৎ সংযোগ, সম্পত্তি নিবন্ধনসহ বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অটোমশন করতে বলেছি। আটোমেশন হলে সময় অনেক কমে আসবে। একই সঙ্গে ব্যবসা শুরুর খরচও কমে যাবে।

অমিত কুমার পাল আরও বলেন, এসব কাজ বাস্তবায়নের জন্য আমরা পৃথক পৃথকভাবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছি। বৈঠকের পাশাপাশি গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের বিষয়টিও পর্যবেক্ষণ করছি।

‘বাস্তবায়নের কাজ যে গতিতে এগোচ্ছে আশা করি ব্যবসায় পরিবেশ সূচকে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম ১০০টি দেশের তালিকায় চলে আসবে’ বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালে ‘বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন- ২০১৬’ এর মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ বিনিয়োগ বোর্ড’ ও ‘বাংলাদেশ প্রাইভেটাইজেশন কমিশন’ একীভূত হয়ে ‘বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। আইনের আলোকে ২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর নতুন আঙ্গিকে সংস্থাটির যাত্রা শুরু হয়। শুরু থেকেই বেসরকারি খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে উৎসাহদান, শিল্প স্থাপনে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও সহায়তা প্রদান এবং সরকারি শিল্প বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অব্যবহৃত জমি বা স্থাপনা অধিকতর উপযোগী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের লক্ষ্যে প্রশাসনিক সমন্বয়সাধন ও উন্নততর সেবা প্রদানের নিমিত্তে কাজ করে আসছে প্রধানমন্ত্রী দফতরের আওতাভুক্ত সংস্থাটি।

এমইউএইচ/এমএআর/এমএস