মূল্যায়ন পরীক্ষার নামে পাইওনিয়ার ডেন্টাল কলেজে জরিমানার ফাঁদ!

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:০৬ এএম, ২০ ডিসেম্বর ২০১৭
পাইওনিয়ার ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতাল। ইনসেটে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থী বিনিশা শাহ

এসএসসিতে জিপিএ ৫, এইচএসসিতে জিপিএ ৪.৮০। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েও ডেন্টাল চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন থাকায় ভর্তি হন রাজধানীর ভাটারার পাইওনিয়ার ডেন্টাল কলেজে। ২০১০ সালে ১৭তম ব্যাচে ভর্তি হওয়া সোহানের (ছদ্মনাম) ডেন্টাল কোর্স শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৫ সালে। কিন্তু শেষ হয়নি। ২০১৭ সালেও তিনি থার্ড ইয়ারে।

কখনো অ্যাসেসমেন্ট (মূল্যায়ন) পরীক্ষায় ফেল... কখনো চূড়ান্ত পরীক্ষায় ফেল... এভাবেই আটকে আছে তার স্বপ্নের ক্যারিয়ার। এজন্য প্রতি বছর গুণতে হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। শুধু এক শিক্ষাবর্ষেই সোহানকে জরিমানা বাবদ অতিরিক্ত গুণতে হয়েছে এক লাখ ২০ হাজার টাকা।

শুধু সোহান (ছদ্মনাম) নয়, এমন শতাধিক শিক্ষার্থী আজও পাইওনিয়ার ডেন্টাল কলেজে ভর্তি হয়ে জরিমানার ফাঁদে পড়েছেন। তারা বলছেন, প্রতিষ্ঠানটিতে মেধাবীরাই ভর্তি হন। কিন্তু পদে পদে প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছে জরিমানার ফাঁদ! অ্যাসেসমেন্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে জরিমানা, ইয়ার চেঞ্জের টার্ম পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে জরিমানাসহ পুনরায় টিউশন ফি আদায়, হোস্টেলে গরমের সময় একটির বেশি ফ্যান ব্যবহৃত হলে জরিমানা, টয়লেট ব্যবহারে কমপ্লেইন নিয়েও শিক্ষার্থীদের জরিমানা করা হয়। সবমিলে শিক্ষার্থীরা রয়েছেন প্রচণ্ড মানসিক চাপে।

টাকার চাপ, জরিমানার চাপ, ফেল করে পুনরায় পাসের চাপ- চতুর্মুখী চাপে শিক্ষার্থীদের নাভিশ্বাস অবস্থা।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে বিনিশা শাহ্ নামে পাইওনিয়ার ডেন্টাল কলেজের ২২তম ব্যাচের তৃতীয় বর্ষের এক নেপালি শিক্ষার্থী হোস্টেলে নিজ কক্ষে আত্মহত্যা করেন। গতকাল মঙ্গলবার তার টার্ম-২ পরীক্ষা ছিল। কিন্তু পরীক্ষা শেষ হওয়ার আধাঘণ্টা আগেই খাতা জমা দিয়ে কেন্দ্র থেকে বের হয়ে যান এবং হোস্টেল কক্ষে গিয়ে আত্মহত্যা করেন।

paionear

প্রতিষ্ঠানটির কর্তাব্যক্তিদের দাবি, পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করেছিল ওই শিক্ষার্থী। ধরা পড়ায় লজ্জায় ও অপমানে তিনি আত্মহত্যা করতে পারেন।

তবে বিনিশা শাহে্র সহপাঠীদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত প্রেসার ও জরিমানার অর্থ দিতে না পারায় আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন বিনিশা। এমন ঘটনার পর ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে উঠে আসতে থাকে প্রতিষ্ঠানটির নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র।

এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানটির একাধিক সাবেক শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজ’র। কথোপকথন ও বিভিন্ন অনিয়মের কিছু তথ্য-উপাত্ত এসেছে জাগো নিউজ’র হাতে।

সোহান নামে এক শিক্ষার্থী জাগো নিউজকে বলেন, ৬/৭ লাখ টাকার বিনিময়ে ভর্তি হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে অ্যাসেসমেন্ট পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেয়া হয়। এ পরীক্ষার এক পার্টে ফেল করলে জরিমানা গুণতে হয় কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা। এভাবে ৪০ থেকে ৭০ হাজার টাকা অতিরিক্ত গুণতে হয়। যা পরিবারের কাছে চাওয়া ও নেয়া অত্যন্ত বিব্রতকর। আবার ফেল করলে প্রতিষ্ঠান থেকে এবং পরিবার থেকে কটু কথাও শুণতে হয়।

কখনো লিখিত পরীক্ষায় ফেল, আবার লিখিত পরীক্ষায় পাস করলেও ভাইভায় (মৌখিক পরীক্ষা) ফেল। একটিতে ফেল করলেই সার্বিক ফলাফল ফেল। আর ফেল মানেই ৪০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত গুণতে হয়। এতো কিছুর পরও শুধু পাসের আশায় কিংবা পুনরায় ফেলের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস করেন না।

paionear

সুমন নামে অপর এক শিক্ষার্থী জানান, দ্বিতীয় বর্ষে উঠে পড়াশোনা ভালো করলেও অ্যাসেসমেন্ট পরীক্ষায় দুটি বিষয়ে ফেল করে সে। ফলে তাকে জরিমানা গুণতে হয় ২৫ হাজার টাকা। বাড়ি থেকে এ টাকা নিতে পারেননি। প্রিয় ক্যামেরা (ডিএসএলআর) বিক্রি করে জরিমানার টাকা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ওই বর্ষের ভাইভা পরীক্ষায়ও অকৃতকার্য হন তিনি।

হোস্টেলে থাকা চূড়ান্ত বর্ষের এক শিক্ষার্থী জাগো নিউজকে বলেন, হোস্টেলের একটি কক্ষে একটিই ফ্যান চলে। অতিরিক্ত ফ্যান চালালে জরিমানা গুণতে হয়। আবার টয়লেট নোংরার অভিযোগ এনেও জরিমানা করা হয় শিক্ষার্থীদের। অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কলেজে এতো বাজে অভিজ্ঞতার কথা শুনিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডেন্টাল কলেজটির একাধিক ইন্টার্ন চিকিৎসক জানান, ৪৮ মাসের কোর্স সরকারি নির্দেশনায় হয়েছে ৬০ মাস। কিন্তু আমাদের লাগছে ৭২ মাসের বেশি। একেকজনের একেক রকম। টাকার বিনিময়ে শুধু এ থেকে নিস্তার মেলে। এ নিয়ে কেউ কোনো কথা বলতে সাহস পান না, পুনরায় ফেলের ভয়ে। পাশাপাশি জরিমানা তো আছেই।

এসব অভিযোগের বিষয়ে পাইওনিয়ার ডেন্টাল কলেজের পরিচালক রকিবুল হোসেন রুমি জাগো নিউজকে বলেন, এ ধরনের অভিযোগ কখনো শিক্ষার্থীরা আমাদের কাছে করেননি। এমন অভিযোগ পেলে অবশ্যই তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি বলেন, গত ২৪ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি সুনামের সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে এটি ডেন্টাল কলেজগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে। এখানে যথাযথ নিয়মে সবকিছু পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটিতে আইনি কাঠামোর বাইরে কোনো কিছুর ব্যত্যয় ঘটছে না।

পদে পদে জরিমানার ফাঁদ পাতার কথা অস্বীকার করেন তিনি আরো বলেন, এ অভিযোগ অবান্তর।

জেইউ/এমএআর/আরআইপি

 

আপনার মতামত লিখুন :