‘কেন্দ্র থেকে হল’র পর প্রশ্ন ফাঁসের নতুন তথ্য

আদনান রহমান
আদনান রহমান , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:০৩ পিএম, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ | আপডেট: ০৫:০৭ পিএম, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮
‘কেন্দ্র থেকে হল’র পর প্রশ্ন ফাঁসের নতুন তথ্য

‘পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে হল বা শ্রেণিকক্ষে যাওয়ার মধ্যে ফাঁস হয় প্রশ্ন’ মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের যুগ্ম কমিশনারের বক্তব্যের একদিন পর প্রশ্ন ফাঁস তদন্তে নতুন তথ্য বেরিয়ে এলো। ফাঁস হওয়া প্রশ্ন ফেসবুকে ছাড়ার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়াদের রিমান্ডে নিয়ে নতুন এ তথ্য পান গোয়েন্দারা।

ডিবির দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, গ্রেফতার এক আসামির মোবাইল ফোন থেকে গণিতের একটি হাতে লেখা প্রশ্ন উদ্ধার করা হয়। ওই প্রশ্ন পরীক্ষায় আসা প্রশ্নের অনুরূপ। প্রশ্নটি পরীক্ষার আগের দিন ফাঁস হয়। বোর্ডের শিক্ষকদের এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। পরবর্তী অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিজি প্রেসে প্রশ্নটি ছাপাতে নেয়ার আগে কোনো একটি পর্যায়ে এটি ফাঁস হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তপন কুমার সরকার জাগো নিউজকে বলেন, বোর্ড থেকে হাতে লেখা প্রশ্ন ফাঁসের কোনো সুযোগ নেই। কারণ একটি নির্দিষ্ট ফন্ট ও ফরমেটের মাধ্যমে শিক্ষকরা প্রশ্ন লেখেন। তাই সেটি প্রকাশের সুযোগ নেই। যেসব হাতে লেখা প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে সেগুলো বিভিন্ন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সাজেশনের কপি।

প্রশ্ন করার প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে বোর্ড কর্মকর্তারা জানান, দেশের সিনিয়র শিক্ষকরা শিক্ষা বোর্ডের কার্যালয়ে এসে একটি নির্দিষ্ট ফরমেটের কাগজে নিজ নিজ প্রশ্নপত্র তৈরি করেন। এরপর মডারেটররা প্রশ্নগুলো নির্বাচন করেন। নির্বাচিত প্রশ্নগুলো একাধিক প্যাকেটে খামবন্দি করে সেগুলো সিলগালা করা হয়। মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দফতরের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে লটারি অনুষ্ঠিত হয়। লটারিতে ওঠে আসা প্রশ্নটি না খুলে সরাসরি বিজি প্রেসে পাঠানো হয়। সেটা কড়া সতর্কতার মধ্যে সেগুলো ছাপানো হয়।

গ্রেফতার হওয়াদের তথ্য অনুযায়ী, প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, অভিভাবক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা জড়িত।

চলমান এসএসসি পরীক্ষার প্রতিটি প্রশ্নপত্র পরীক্ষার আগে ফাঁস হচ্ছে। ফাঁস হওয়া প্রশ্ন ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগে গত শনিবার মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ ঢাকা ও ফরিদপুর থেকে ১৪ জনকে গ্রেফতার করে। ডিবির তদন্ত অনুযায়ী, বিজি প্রেস নয় বরং পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে ফাঁস হয় প্রশ্ন। যদি তা-ই হয় কেন্দ্রের শিক্ষক নাকি কর্মচারী, কারা প্রশ্নের ছবি তুলে পাঠাচ্ছে? কী স্বার্থেই তারা এটি করছে- এসব প্রশ্নের উত্তরে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকৃত ফাঁসকারীদের শনাক্ত করা কঠিন।

প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে তদন্তকারী সংস্থা ডিবির যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন বলেন, ‘তৃণমূল থেকে অর্থাৎ পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে পরীক্ষা শুরুর ৩০-৪০ মিনিট আগে প্রশ্ন ফাঁস করে ছবি তুলে পাঠানো হয়। কারা প্রশ্নের ছবি তুলে ফাঁস করছে, কারা এ চক্রের সঙ্গে জড়িত; তাদের কাছে যাওয়া খুবই কঠিন। ওরা শত শত হাজার হাজার চেইন। কখনো চট্টগ্রাম থেকে প্রশ্ন পাঠানো হয়, কখনো আরেক জেলা থেকে। তাদের শনাক্ত করা কঠিন।’

তবে আসামিদের রিমান্ডে নেয়ার পর জানা গেছে, ছাপাখানায় যাওয়ার আগেই প্রশ্ন পেত তারা।

প্রশ্ন ফাঁস প্রসঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার শেখ নাজমুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রশ্ন ফাঁস চক্রের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন স্তরের অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মূলহোতাদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। মূলহোতাদের আইনের আওতায় আনা না গেলে প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করা যাবে না।’

ডিবি সূত্র জাগো নিউজকে জানায়, প্রশ্ন ফাঁস ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছ থেকে অর্থ লেনদেনের তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তিনশ মোবাইল নম্বর ব্লক করে দেয়া হয়েছে।

‘প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি যেসব পরীক্ষার্থীর অভিভাবক ফাঁস হওয়া প্রশ্ন কিনছেন তাদেরও গ্রেফতার করা হবে। এ রকম অর্ধ শতাধিক অভিভাবককে শনাক্ত করা হয়েছে’- বলেন ডিবির এক কর্মকর্তা।

প্রশ্ন ফাঁস রোধে করণীয় জানতে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা জাগো নিউজকে বলেন, শুধু পুলিশ কিংবা বোর্ড নয়, সামগ্রিকভাবে সকলের সমন্বয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে হবে। প্রশ্নপত্র ফেসবুকে ছড়ানোর অভিযোগে ডিবি যাদের গ্রেফতার করেছে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে যাদের নাম আসছে তাদেরকে শুধু ডিবি নয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটিরও উচিত জিজ্ঞাসাবাদ করা। নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে কমিটি কাজ করলে প্রশ্ন ফাঁস ঠেকানো সম্ভব।’

এদিকে প্রশ্ন ফাঁসের কারণে এসএসসি পরীক্ষার সময় সরকারি নির্দেশনা অনুসারে নির্দিষ্ট কিছু সময় ইন্টারনেটের গতি ২৫ কেবিপিএস করতে মোবাইল ফোন অপারেটর ও ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে গত রোববার চিঠি দেয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। নির্দেশনা অনুযায়ী রোববার রাতে দেশব্যাপী ইন্টারনেট সেবায় ধীরগতি পরিলক্ষিত হয়। তবে গতকাল সোমবার সকালে ইন্টারনেটের গতি কমানোর নির্দেশনা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

প্রসঙ্গত, চলমান এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় প্রতিদিনই প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠছে। প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আটকও হচ্ছেন অনেকে। এটি রোধে ব্যর্থ হওয়ায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করা হয়েছে। এমনকি পরীক্ষা কেন্দ্রে মোবাইল ব্যবহার থেকে শুরু করে কেন্দ্রের ২০০ মিটারের মধ্যে মোবাইল ফোন পেলে গ্রেফতারের কথাও বলা হয়েছে। এরপরও প্রশ্ন ফাঁস রোধ করা সম্ভব না হওয়ায় উদ্বিগ্ন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা।

এআর/এমএআর/আরআইপি