নির্বাচনে গিয়ে সরকারের স্বরূপ উন্মোচন করছি

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:৩৮ পিএম, ০২ জুলাই ২০১৮

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্য। সাবেক মন্ত্রী। গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন দলীয় কর্মকাণ্ডে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রসঙ্গে সম্প্রতি মুখোমুখি হন জাগো নিউজের।

দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। আসছে সংসদ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য না হলে গণতন্ত্র বিপন্ন হবে বলেও মত দেন। আলোচনায় উঠে আসে সম্প্রতি বিএনপির পক্ষ থেকে ভারত সফর এবং লন্ডনে থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তারেক রহমানের দেশে ফেরার প্রসঙ্গও।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবুতিন পর্বের প্রথমটি থাকছে আজ।

জাগো নিউজ : প্রশ্নবিদ্ধ ভোটের অভিযোগ এনেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিএনপি। গাজীপুর ও খুলনার নির্বাচন নিয়ে কী বলবেন?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দ্বিমত পোষণ করে কথা বলছে। কিন্তু সবার আগে দেখতে হবে পাবলিক পারসেপশন। জনভাবনা কী বলে সেটাই আসল কথা। নির্বাচন নিয়ে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলছেন, কেউ গোপনে বলছেন, আবার কেউ বলতে সাহস করছেন না।

আমার মনে হয়, জনভাবনায় কেউ-ই বলবেন না যে নির্বাচনে বাংলাদেশে জনমতের প্রতিফলন ঘটছে। বাংলাদেশের মানুষ তার নাগরিক অধিকার প্রয়োগের যে সুযোগ পাচ্ছে না, এটি এখন খুব পরিষ্কার বলে মনে করি।

জাগো নিউজ : এমন জনভাবনায় বিএনপির অবস্থান কোথায়?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করেনি, এটি একটি বড় প্রশ্ন।

আমরা কেন ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিনি, তা দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, সরকার তার পছন্দের লোক নির্বাচন কমিশনে বসিয়ে এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে নির্বাচনী প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এখন যা হচ্ছে, সবই নীল নকশার নির্বাচন। মূলত নির্বাচন এখন নীল নকশা বাস্তবায়নের একটি প্রকল্প মাত্র।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের আর বেশি কিছু করতে হচ্ছে না। পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই এ প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে এবং তার সভাপতিত্ব করছে নির্বাচন কমিশন। ভয়ভীতি, জাল ভোট, ভোটারদের বের করে দেয়া, এজেন্ট বের করে দেয়া, ব্যালট ছিনতাই- সবই এখন পুলিশ, ডিবির একটি অংশ বাস্তবায়ন করছে এবং নির্বাচন কমিশন তাতে সহযোগিতা করছে।

গাজীপুর সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম পুলিশের গাড়িতে ঘুরলেন। এর তো একটি ম্যাসেজ আছে। পুলিশ বুঝিয়ে দিলো, তারা জাহাঙ্গীরের পক্ষে। ভোটাররা আমাদের ম্যাসেজ বুঝে নাও। নির্বাচন কমিশন চুপ থাকলো। তার মানে কমিশনও ভয়ভীতির হিসাব বুঝিয়ে দিলো ভোটারদের।

খুলনা ও গাজীপুর নির্বাচনে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা। আগে মিডিয়া নির্বাচনের খবর কিছুটা প্রকাশ করতে পারত। এ নির্বাচনে একেবারেই তা বন্ধ করে দেয়া হয়। আমরা জেনেছি, গণমাধ্যম প্রধানদের বিভিন্ন সংস্থা থেকে ফোন করে বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ গণমাধ্যমকে শক্তিশালী বার্তা দিয়ে বলা হলো, সরকারের নীল নকশার নির্বাচনী প্রকল্পে তোমরাও শরিক হও।

খুলনা ও গাজীপুরের নির্বাচন নিয়ে দেশবাসীও পরিষ্কার ধারণা লাভ করেছে। এ ধারণায় বিএনপির অবস্থানও পরিষ্কার হচ্ছে।

জাগো নিউজ : বলছেন, ‘নীল নকশার নির্বাচনী প্রকল্প’। নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপিও সে প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা করছে কি-না?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : নির্বাচনে অংশ নিয়ে আমরা সরকারের স্বরূপ উন্মোচন করছি। জাতির কাছে সরকারের আসল চেহারা পরিষ্কার হচ্ছে।

জাগো নিউজ : তাতে লাভ কী?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : নতুন প্রজন্ম আওয়ামী লীগের বাকশালী শাসন দেখেনি। তারা এখন সরকারের বাকশালী শাসন ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি দেখছে। আওয়ামী লীগের অধীনে কোনো নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। সরকারের একদলীয় স্বৈরনীতি উন্মোচিত করতে পেরেছি এসব নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পেরে।

জাগো নিউজ : নির্বাচনের এ ধারা তো পরম্পরায়। বিএনপি বা এরশাদ আমলেও একই অভিযোগ ছিল?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : এ সরকারের মতো স্বৈরনীতির কোনো চিত্র আগে ছিল না। আমরা এমন পরিস্থিতির মধ্যেও নির্বাচনে অংশ নিয়ে জনগণের জন্য বিকল্প পথ তৈরি করে দিচ্ছি। যদিও সরকার সে বিকল্প পথও বন্ধ করে দিচ্ছে।

জাগো নিউজ : এমন পরিস্থিতি দাঁড়ালো এবং তা সরকারগুলোর পরম্পরায় সৃষ্টি। এ ভোটের রাজনীতি আসলে কোথায় নিচ্ছে জাতিকে?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকের যে মৌলিক অধিকার রয়েছে, তা সরকার কেড়ে নিয়েছে। এখানে আর আইনের শাসন নেই। গণমাধ্যম কথা বলতে পারছে না। জীবনের নিরাপত্তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। প্রতিদিন মানুষ হত্যা করা হচ্ছে বিনা বিচারে।

জনগণের ওপর আস্থা নেই বলেই প্রকল্পনির্ভর নির্বাচন করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে জাতি আসলে কই যাবে, তা সময় বলে দেবে। তবে আমি মনে করি, মানুষ তার অধিকার আদায়ে দ্রুত রাস্তায় নেমে আসবে। জনগণকে বাইরে রেখে একদলীয় সরকার ব্যবস্থা চালু করতে সরকার যে অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে জনগণ ইতোমধ্যে সচেতন হয়েছে। মানুষ তার অধিকারের মালিকানা ফিরিয়ে আনবেই।

amir khasru

জাগো নিউজ : এ ভরসা পাচ্ছেন কোথায়?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : জনগণকে ধোঁকা দিয়ে দিনের পর দিন ক্ষমতায় থাকা যায় না। ইতিপূর্বে কেউ থাকতেও পারেনি। মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করে বেশি দিন টিকে থাকা যায় না। মানুষ জানে, রুখে না দাঁড়ালে স্বৈর সরকার আরও সব মৌলিক অধিকার হরণ করবে।

জাগো নিউজ : আপনার ভাষায়, মানুষ তার মৌলিক অধিকার হারিয়েছে। ভোট দিতে পারছে না। এরপরও মানুষ অধিকার আদায়ে রাস্তায় নামছে না। তার মানে বিএনপি বা বিকল্প কোনো শক্তির ওপর ভরসা মিলছে না?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : একটি দল যদি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস করতে থাকে এবং সেই দলের বিপক্ষে অবস্থান করতে হলে ভিন্ন শক্তি প্রয়োগ করতে হয়। সভ্য সমাজের কোনো মানুষ সেই শক্তিতে বিশ্বাস রাখতে পারে না। আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের প্রশ্নে লৌহমানবী। খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় আজ কারাগারে। জনগণ ও গণতন্ত্রই হচ্ছে বিএনপির মূল শক্তি।

ফ্যাসিস্ট মনোভাব নিয়ে সরকার যে সন্ত্রাস চালাচ্ছে, তা থেকে মানুষ মুক্তি চায়। কিন্তু সেটা সভ্য উপায়ে।

সন্ত্রাস দিয়ে সন্ত্রাসের মোকাবেলা হয় না। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে মানুষ লড়াই করেই মুক্তি এনেছে। সেই জাতিকে ধোঁকা দিয়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা যাবে না।

জাগো নিউজ : হরতাল-অবরোধের মাধ্যমে সশস্ত্র অবস্থান নিয়ে আপনারা সরকারের পতনের চেষ্টাও করেছিলেন। পারলেন না। সরকারের কৌশলের কাছেই বিএনপি ব্যর্থ কি-না?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মনে করলে তার সঙ্গে রাজনৈতিক শক্তি প্রয়োগ করা যায়। বিএনপি সশস্ত্র অবস্থান নিয়ে আন্দোলন করেনি। আমরা রাজনৈতিকভাবে আন্দোলন করছি। জনগণ তার অধিকারের মালিকানা ফিরিয়ে আনতে যেভাবে বাকশালের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, এখনও তাই করবে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস দিয়ে এ জাতিকে দমিয়ে রাখা যাবে না।

জাগো নিউজ : তাহলে এখন কি বিএনপির কাছে জনগণের এ বিশ্বাসই একমাত্র ভরসা?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটিই ফ্যাক্ট। জনগণ বার বার আন্দোলন করে এটিই প্রমাণ করেছে।

জাগো নিউজ : স্বাধীনতার পরও রাজনীতির জন্য এমন আন্দোলন। তার মানে বাঙালি কি এখনও নিজেদের শাসন করতে শেখেনি?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : আন্দোলন হচ্ছে একটি সমাজের চলমান প্রক্রিয়া। অধিকার আদায়ে আন্দোলনের কোনো শেষ নেই। আন্দোলন করেই রাজনীতি সভ্য হয়। মানুষের মনে ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠতে পারে যে কোনো অধিকারের প্রশ্নে। এটি তো অস্বীকার করার সুযোগ নেই। মানুষের সত্যিকার মুক্তি কখন, কীভাবে মিলবে, তা সময় ধরে বলা যাবে না।

তবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো ছলনা জনগণ আর মানবে না। অস্ত্রের নির্বাচন এবার তারা রুখে দেবেই।

জাগো নিউজ : কীভাবে রুখবেন?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : আমাদের শক্তি জনগণ। জনগণই রুখে দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এএসএস/এমএআর/এমআরএম/এমএস

খুলনা ও গাজীপুরের নির্বাচন নিয়ে দেশবাসীও পরিষ্কার ধারণা লাভ করেছে। এ ধারণায় বিএনপির অবস্থানও পরিষ্কার হচ্ছে

জনগণকে বাইরে রেখে একদলীয় সরকার ব্যবস্থা চালু করতে সরকার যে অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে জনগণ ইতোমধ্যে সচেতন হয়েছে। মানুষ তার অধিকারের মালিকানা ফিরিয়ে আনবেই

সন্ত্রাস দিয়ে সন্ত্রাসের মোকাবেলা হয় না। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে মানুষ লড়াই করেই মুক্তি এনেছে। সেই জাতিকে ধোঁকা দিয়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা যাবে না

আপনার মতামত লিখুন :