অগ্রগতি নেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে, দূতাবাসগুলো জনমুখী করার প্রয়াস

কূটনৈতিক প্রতিবেদক কূটনৈতিক প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:৪০ পিএম, ১৭ এপ্রিল ২০১৯

সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েও গত নভেম্বরে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মিয়ানমারে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে পারেনি বাংলাদেশ। এর কিছুদিন পরেই জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবারও সরকার গঠন করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। নতুন সরকার গঠনের একশ দিন পার হলেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। উপরন্তু কক্সবাজার থেকে কিছু রোহিঙ্গাকে সরাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বাধার মুখে পড়েছে সরকার।

তবে বিষয়টিকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখছে না পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশ ব্যর্থ হয়নি দাবি করে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, বাংলাদেশ সঠিক পথেই আছে এবং এই ইস্যুতে কোনো দেশ বাংলাদেশের সমালোচনার কোনো সুযোগ পাবে না। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সরকার নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে বলেও সাংবাদিকদের জানান তিনি।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন একটি চলমান প্রক্রিয়া উল্লেখ করে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির জাগো নিউজকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে হবে।’

কক্সবাজারের শিবিরগুলো থেকে এক লাখ রোহিঙ্গাকে নোয়াখালী জেলার ভাসানচর দ্বীপে স্থানান্তর করতে চাইলেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বাধার মুখে পড়েছে সরকার। সেখানে তাদের আবাসনসহ সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার পরও জাতিসংঘসহ এসব সংস্থার বাধার মুখে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেছেন, ‘সংশ্লিষ্ট সবাই যদি মনে করে যে, রোহিঙ্গাদের নোয়াখালী জেলার ভাসানচর দ্বীপে স্থানান্তর করা হলে তাদের জন্য সমস্যা হবে তাহলে বাংলাদেশ তা করবে না।’

আবদুল মোমেন বলেন, এপ্রিল মাসে স্বেচ্ছায় প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তর করার পরিকল্পনা সরকারের ছিল। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের নানা শর্তের কারণে এটা কখন বাস্তবায়ন সম্ভব হবে তা তিনি জানেন না। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বিষয়টি দেখছে বলে তিনি জানান।

মিয়ানমারের সেনা অভিযানের মুখে প্রাণ বাঁচাতে দেশটির রাখাইন প্রদেশ থেকে পালিয়ে আসা প্রায় ১১ থেকে ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে কক্সবাজার জেলায় আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে সমাধান না আসলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে জনবান্ধব করার চেষ্টা করছে সরকার। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পরে অর্থনৈতিক কূটনীতি বাড়াতে এবং প্রবাসীদের জন্য সেবা বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নেন আবদুল মোমেন। এজন্য বিদেশে বাংলাদেশি মিশনে ২৪ ঘণ্টা হটলাইন চালু করা, বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধে সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও তদারকি করার ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানান তিনি। এ ছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনলাইনে সার্টিফিকেট সত্যায়িতসহ অন্যান্য কনস্যুলার সেবা অতি অল্প সময়ে প্রদান করা হচ্ছে।

অর্থনৈতিক কূটনীতি বাড়াতে আগামী তিন বছরে কোন দেশ কী পরিমাণ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে পারে তার একটি রূপরেখা দিতে বিদেশে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতদের নির্দেশও দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। অর্থনৈতিক কূটনীতিকে অগ্রাধিকার তালিকায় রাখার নির্দেশনা দিয়ে এক পত্রে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস প্রধানদের এ নির্দেশ দেন। অর্থনৈতিক কূটনীতিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রাধান্য দিয়ে স্বাগতিক সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি অভিবাসী বাংলাদেশিদের নিজ দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে উৎসাহিত করতেও নির্দেশনা দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

বাংলাদেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সাফল্য বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষায় উপস্থাপনের মাধ্যমে সারা বিশ্বে বাংলাদেশকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরে ‘ব্র্যান্ডিং’ করারও আহ্বান জানান ড. মোমেন। রূপরেখায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকারের নির্বাচনী লক্ষ্যসমূহ অর্জনে যেমন অধিকতর বিনিযোগ দরকার, সেই সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তি আহরণ ও ব্যবসা বাণিজ্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে দূতাবাসগুলোর সক্রিয় উদ্যোগ নেয়া দরকার। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।

পাশাপাশি বিদেশি বিনিযোগ আকর্ষণের মাধ্যমে দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান ও পর্যটন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব। দেশের ফার্মাসিউটিক্যালস, পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন শিল্পের অবস্থান সুদৃঢ় করতে রফতানি বহুমুখী করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন নতুন বাজার অনুসন্ধানেরও তাগিদ দেন ড. মোমেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী দ্বিপাক্ষিক ও উপ-আঞ্চলিক বাণিজ্, বিনিয়োগ-সংক্রান্ত আলোচনা, চুক্তি সম্পাদনে যথাযথ সমন্বয়কের ভূমিকা পালন এবং রফতানি ও আমদানিকারক ব্যবসায়ীদের বিদেশে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানে রাষ্ট্রদূতরা দৃশ্যমান ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন রূপরেখায়।

ইউরোপের একটি দেশে কর্মরত বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রদূত এ বিষয়ে বলেন, ‘আমরা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী দূতাবাসের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করি তাতে আশানুরূপ ফল আসবে।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। এ বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত মহিউদ্দিন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনীতির অন্যতম শক্তি। তাই তাদেরকে সার্বক্ষণিক সেবা দেয়া দূতাবাসগুলোর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।’

জেপি/এসআর/এমকেএইচ