বরিশালের সমাবেশে ল্যাঙ্গুয়েজে গন্ডগোল হয়ে যেতে পারে

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:১৩ পিএম, ২৮ অক্টোবর ২০১৯

রাশেদ খান মেনন। সভাপতি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। মহাজোটের অন্যতম নেতৃত্ব এবং সাবেক মন্ত্রী। সম্প্রতি বরিশালের এক সমাবেশে নির্বাচন, ভোট প্রসঙ্গ তুলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন বামপন্থী এ রাজনীতিক। তার ওই বক্তব্যের জেরে কৈফিয়ত চাওয়া হয় জোটের পক্ষ থেকে।

নির্বাচন, ভোট, গণতন্ত্রের প্রসঙ্গ নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজ-এর। দীর্ঘ আলোচনায় উন্নয়ন, দুর্নীতির প্রসঙ্গও গুরুত্ব পায়। সমালোচনা করেন ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে সরকারের যোগসাজশের বিষয়ে। তিন পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে প্রথমটি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ : ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে মহাজোটে শরিক হলেন। ক্ষমতার এক দশক পার হলো। কতটুকু প্রতিষ্ঠা করতে পারলেন মানুষের ভোটের অধিকার?

রাশেদ খান মেনন : ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা তথা সামগ্রিক নির্বাচন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে আমরা জোটবদ্ধ হয়েছিলাম। ওয়ার্কার্স পার্টি দলগতভাবে ও জোটগতভাবে ভোটের অধিকারে লড়াই করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে।

নির্বিঘ্নে মানুষের ভোট দেয়ার ব্যবস্থা করা, টাকার খেলা বন্ধ করা, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বন্ধ করার মধ্য দিয়েই আমরা নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার চেয়ে এসেছি। ২০০৫ সালে আমরা নির্বাচন ব্যবস্থা ও তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার সংস্কারের প্রস্তাব দেই। বিচারপতি হাসান সাহেবকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার মধ্য দিয়ে বিএনপি-জামায়াত নির্বাচনী নকশা প্রণয়ন করল, যা সবারই জানা এবং এ থেকেই সংকট তৈরি হলো। অন্যদিকে এম এ আজিজ কমিশন এক কোটির বেশি ভুয়া ভোটার তৈরি করল, যা সংকট আরও বাড়িয়ে দিল।

জাগো নিউজ : এমন খবর সবার জানা। বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে কী বলবেন?

রাশেদ খান মেনন : বর্তমান বুঝতে হলে আপনাকে অতীত আলোচনা করতে হবে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থাসহ নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ করতে থাকল বিএনপি সরকার। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই ২০০৫ সালের জুনে প্রেস ক্লাবে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার চেয়ে প্রস্তাবনা রাখলেন। এরপর জনগণের আন্দোলনের মুখে পাতানো নির্বাচন থেকে সরকার পিছিয়ে এলো। এলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার।

১/১১ সরকারের কাছেও আমরা সংস্কারের প্রস্তাব দিলাম। প্রধান নির্বাচন কমিশনার শামছুল হুদা সাহেব বিশেষ দক্ষতার সঙ্গে ভোটার তালিকা তৈরি করলেন। ২০০৮ সালে উৎসবের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনমনে স্বস্তি ফিরে এলো। যদিও বিএনপি-জামায়াত ওই নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল।

২০১৩ সালে সরকার পতনের আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াত দেশকে যে জায়গায় নিয়ে গেল, তাতে সরকারের সামনে একধরনের চ্যালেঞ্জ চলে এলো। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত হলে তৃতীয় কোনো শক্তি ক্ষমতায় আসত এবং বিরোধীরা মূলত তাই চেয়েছিল।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিচক্ষণতার সঙ্গে সে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করলেন। একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব করা হলো, যেখানে বিএনপিকেও অংশগ্রহণের কথা বলা হলো। বিএনপি নির্বাচনে এলো না এবং ৫৩ জন এমপি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেন। বিএনপি আন্দোলনেই থাকল।

গত নির্বাচনে সংলাপ আয়োজনের দাবি উঠল। সরকারের পক্ষ থেকে সংলাপ আহ্বান করা হলো। কিন্তু আমরা প্রথম থেকেই বুঝেছিলাম যে, বিরোধীরা আসলে নির্বাচন করতে আসেনি। তারা নির্বাচনকে ভণ্ডুল করতে অংশ নিয়েছে এবং সেটাই সত্য প্রমাণিত হলো।

জাগো নিউজ : বিরোধী শক্তি তো এবার আন্দোলন করেনি। ভোটও বর্জন করেনি। তারা ভণ্ডুল করল কীভাবে?

রাশেদ খান মেনন : আপনি ঢাকা শহরে বিএনপি-জামায়াতের একজন প্রার্থীকেও মাঠে দেখতে পাননি, একমাত্র মির্জা আব্বাস ছাড়া। দেশের অন্যান্য জায়গায়ও ঠিক তাই। নির্বাচনে প্রার্থী দিয়ে চরমভাবে মনোনয়ন বাণিজ্য করেছেন তারেক রহমান। দলটির ত্যাগী নেতারাও মনোনয়ন পাননি। নির্বাচনে অংশ নেয়ার অর্থ হচ্ছে, ভোটকেন্দ্রও পাহারা দেবে। তা দেয়নি। ফলে একতরফা নির্বাচন হয়েছে।

জাগো নিউজ : বিরোধী জোটের সাংগঠনিক দুর্বলতা হয়তো ছিল। কিন্তু নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন সরকারকে যেভাবে সহায়তা করেছে, তাতে বিরোধীদের মাঠে থাকার পরিবেশ কি ছিল?

রাশেদ খান মেনন : অবশ্যই ছিল। কেন থাকবে না? পরিপূর্ণ পরিবেশ ছিল বলে আমি মনে করি।

জাগো নিউজ : হাজার হাজার মামলায় লাখো মানুষকে আসামি করা হয়েছে। বিরোধীদের অসংখ্য নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে…

রাশেদ খান মেনন : আমরা কি মামলা নিয়ে নির্বাচন করিনি? ২০০৬ সালে আমরা যখন নির্বাচনের প্রস্তুতি নেই, তখন আমার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা। বিরোধীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা তখন। আমরা কি সরে গেছি?

জাগো নিউজ : ২০০৬ সালের পরিবেশ আর ২০১৮ সালের পরিবেশ কি এক ছিল?

রাশেদ খান মেনন : হ্যাঁ। কোনো তফাৎ ছিল না। বিএনপি কি আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়নি? এখন নতুন করে মামলার প্রসঙ্গ আসছে কেন?

জাগো নিউজ : রাতের আঁধারে ভোট হয়েছে বলে অভিযোগ। প্রমাণও মিলছে। এমনটি আগে দেখা যায়নি…

রাশেদ খান মেনন : এ অভিযোগ নিয়ে আমি সংসদেও বলেছি। বিরোধীরা ভোটকেন্দ্রের আশপাশে গিয়েছিল কি-না সন্দেহ আছে।

ভোট নিয়ে বিরোধী জোট গণশুনানির আয়োজন করল। ড. কামালের নেতৃত্বে। তাদের নিজস্ব কতিপয় ব্যক্তি ছাড়া আর একজনও সেই শুনানিতে অংশ নেয়নি। এমনকি প্রার্থীরাও এসে অভিযোগ করেননি যে, রাতের আঁধারে ভোট হয়েছে।

জাগো নিউজ : তাহলে সম্প্রতি বরিশালের সমাবেশে সাক্ষ্য দিয়ে বললেন কেন, ‘ভোট ডাকাতির কারণে মানুষ ভোট দিতে পারেনি’?

রাশেদ খান মেনন : আমি সেখানে ৪৫ মিনিটের বক্তব্য দিয়েছি। বরিশালে বক্তব্য দেয়ার প্রেক্ষাপট ছিল। কারণ আমরা সেখানে নৌকা প্রতীক নিয়ে জিততে পারিনি। আমাদের শরিক দলের নেতাকর্মীরা ভিন্ন আচরণ করেছেন। এটি সংসদেও বলেছি।

এ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে হয়তো বলেছি যে, আজ যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে, তাতে জনগণ ভোট দিতে পারছে না। বরিশালের সমাবেশে ল্যাঙ্গুয়েজে হয়তো গন্ডগোল হয়ে যেতে পারে। একটি বাক্য দিয়ে আমি সমস্ত নির্বাচনকে বানচাল করে দিয়েছি, এমনটি বললে তো হবে না।

আমি সংসদে বলেছি, নির্বাচন সফলভাবে হয়েছে। বিএনপি-জামায়াতের কারণে যেটুকু বাড়াবাড়ি হয়েছে, তাতে একটি নির্বাচন অশুদ্ধ হয়ে যায় না। এ বক্তব্য রেকর্ডেড। তাহলে হঠাৎ করে আমি উল্টো সুরে কথা বলব কেন?

এএসএস/এমএআর/জেআইএম

একটি বাক্য দিয়ে আমি সমস্ত নির্বাচনকে বানচাল করে দিয়েছি, এমনটি বললে তো হবে না

২০০৬ সালে আমরা যখন নির্বাচনের প্রস্তুতি নেই, তখন আমার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা। বিরোধীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা তখন। আমরা কি সরে গেছি

নির্বিঘ্নে মানুষের ভোট দেয়ার ব্যবস্থা করা, টাকার খেলা বন্ধ করা, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বন্ধ করার মধ্য দিয়েই আমরা নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার চেয়ে এসেছি