বাংলাদেশে এইডসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে ভারত

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:২৯ পিএম, ৩০ নভেম্বর ২০১৯
প্রতীকী ছবি

অধ্যাপক সামিউল ইসলাম। ন্যাশনাল লাইন ডিরেক্টর, এইডস এসটিডি প্রোগ্রাম। ১ ডিসেম্বর বিশ্ব এইডস দিবস উপলক্ষে মুখোমুখি হন জাগো নিউজ-এর। এইডস মোকাবিলায় বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় অবস্থানে বলে মন্তব্য করেন। বলেন, মানুষের মধ্যে সচেতনতা আসছে বলেই এইডস নিয়ে কুসংস্কার দূর করা সম্ভব হচ্ছে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ : বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এইডসের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাই?

সামিউল ইসলাম : তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে আমরা এইডস মোকাবিলায় ঈর্ষণীয় অবস্থানে আছি বলে মনে করি। বাংলাদেশে জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাত্র শতকরা .০১ ভাগ এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত। মূলত আমাদের বহুমুখী উদ্যোগের কারণেই ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে এইডস থেকে রক্ষা এবং আক্রান্তদের উপযুক্ত চিকিৎসা প্রদান করে প্রায় সুরক্ষা প্রাচীর গড়ে তুলতে পেরেছি।

কাজগুলো আগে মূলত এনজিওগুলো করত। এখন সরকার মূলধারার কার্যক্রমে এইডস-কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছে। আমরা মূলত এইডসে আক্রান্তদের শনাক্ত করতেই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছি। এ কারণে আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরিধি বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে আসছি। আমরা ২৮টি মেডিকেল কলেজে বিনামূল্যে এর পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছি। এনজিওগুলোও বিনামূল্যে পরীক্ষা করানোর ব্যবস্থা করছে। আমরা সাধারণ মানুষকেও আহ্বান জানাচ্ছি, এইচআইভি পরীক্ষার জন্য।

বিশেষ করে আমরা আক্রান্তদের চিকিৎসা ব্যবস্থার আওতায় এনে নজরদারিতে রেখেছি, যাতে করে তাদের কাছ থেকে নতুন করে আর কেউ আক্রান্ত না হয়। যারা বিদেশে যাচ্ছেন, তাদেরও সতর্কতামূলক প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে, যাতে করে তারাও এ রোগে আক্রান্ত না হন।

মাদকসেবীদের নিয়েও আমরা নানা সচেতনমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি। এইডস আক্রান্ত মায়েদের আমরা বিশেষ চিকিৎসার ব্যবস্থা করছি। এমন বহুমুখী উদ্যোগের মধ্য দিয়েই এইডস-এর ঝুঁকি মোকাবিলা করছে সরকার।

জাগো নিউজ : বর্তমানে এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কত?

সামিউল ইসলাম : গত বছরের হিসাবে মোট ছয় হাজার ৫৪৪ জন এইডস আক্রান্ত রোগী আমরা শনাক্ত করেছিলাম। এর মধ্যে ১২ জন মারা গেছেন। বাকিরা আমাদের তত্ত্বাবধানে সেবা নিচ্ছেন। গত বছরের চেয়ে এবার বেশি এইডস রোগী শনাক্ত হয়েছে। তার মানে এই নয় যে, এইডস রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। শনাক্ত করা রোগীরা আমাদের মাঝেই ছিল। তারা হয়ত আগে টেস্ট করাতে চায়নি।
আমরা বোঝাতে সক্ষম হয়েছি, এইডস মানেই মরণব্যাধি নয়। এর চিকিৎসা নিয়ে ভালো থাকা যায়। তারা স্বাভাবিক মানুষের মতোই থাকতে পারেন এবং তাদের মাধ্যমে নতুন করে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকছে না।

জাগো নিউজ : এইডসে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কী ধারণা পোষণ করছে?

সামিউল ইসলাম : বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ। এমন একটি দেশের সরকার এইডসের বিনামূল্যে পরীক্ষা এবং রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছে। এটি বিশ্বকে অবাক করেছে। সরকারি হাসপাতালের ১২টি সেন্টার থেকে চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং বেঁচে থাকা পর্যন্ত তারা সেবা পেয়ে যাচ্ছেন। এটি অনেক ধনী দেশেও নেই।

আমরা মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে এইডস সেবাকে গ্রথিত করে দিতে পেরেছি। আমরা বোঝাতে সক্ষম হয়েছি, এটি আর দশটি রোগের মতোই। এই রোগীরা যেন কোনোভাবে বৈষম্যের শিকার না হয়, তার জন্যও বিশেষ নজরদারি রয়েছে।

জাগো নিউজ : মানুষ কেমন সাড়া দিচ্ছেন?

সামিউল ইসলাম : এইডস নিয়ে সাধারণ মানুষও এখন অধিক সচেতন। আমাদের আশীর্বাদ হচ্ছে ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসন। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ধর্মে সমর্থন করে না। এই নৈতিক শিক্ষা আমাদের অনেক সুরক্ষা দিচ্ছে। এ শিক্ষা থেকেই আমরা আমাদের পরিবারের সদস্যদের অনিয়ন্ত্রিত আচরণ থেকে বিরত রাখতে পারছি।

জাগো নিউজ : ভারতে প্রচুর এইডস রোগী। আমাদের সীমানা ভারত ঘেরা। উদ্বেগ বাড়ায় কি-না?

সামিউল ইসলাম : ভারত এইডস নিয়ন্ত্রণে আমাদের থেকে অনেক পিছিয়ে। এইডস পরীক্ষার ক্ষেত্রেও ভারত পিছিয়ে। এমন কী মৌলিক চিকিৎসাসেবাতেও আমরা ভারতকে ছাড়িয়ে গেছি।

বাংলাদেশের অধিকাংশ সীমানাই ভারতের সঙ্গে। ভারতে এইডস রোগীর সংখ্যা ভয়াবহ পর্যায়ে। কাঁটাতারে বেড়া থাকলেও দুদেশের প্রচুর মানুষ নিয়মিত যাতায়াত করে থাকেন। সঙ্গত কারণে ভারত বাংলাদেশের এইডস ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।

আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান থাকলে এ ঝুঁকি কমিয়ে আনা সম্ভব। আমরা একে-অপরের সঙ্গে যদি অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারি, অগ্রগতি নিয়ে যদি আলোচনা করতে পারি, অবশ্যই সবার জন্য মঙ্গল বলে মনে করি। ভারত একজন এইডস রোগীকে বিনামূল্যে সারাজীবন চিকিৎসা দেয় না। আমরা দিচ্ছি। এর কী কী সুবিধা, তা জানতে পারলে ভারতের জন্যই ভালো হবে। আবার তাদের অভিজ্ঞতা আমরা পেলে আমাদের জন্যও সুবিধা হবে।

জাগো নিউজ : যৌনকর্মীদের সম্পর্কে কী বলবেন?

সামিউল ইসলাম : সাধারণের মধ্যে যৌনপল্লী নিয়ে অন্যরকম ধারণা থাকলেও আমাদের কাছে যৌনকর্মীদের মধ্য থেকে এইডস আক্রান্ত রোগী বেশি শনাক্ত হয়েছে, তা মনে করি না। এর কারণ হচ্ছে, যৌনকর্মীরাও এখন অনেক সচেতন।

আমরা এ জনগোষ্ঠীকে নানাভাবে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি। এটি করতে হচ্ছে আমাদের স্বার্থেই। একটি জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে আপনি সবাইকে সুরক্ষা দিতে পারবেন না। এইডস থেকে রক্ষায় সরকার বিনামূল্যে কনডম দিচ্ছে। এতে করে অনেক যৌনরোগ থেকেও রেহাই মিলছে।

বিশেষ জনগোষ্ঠীকে কনডম ব্যবহারে উৎসাহিত করা এবং সঠিকভাবে ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দেয়ারও ব্যবস্থা করা হয়েছে। যা দীর্ঘদিন ধরে এনজিওগুলো দিয়ে আসছে।

আমাদের লক্ষ্য হলো, এইডস আক্রান্ত নব্বই ভাগ রোগীকে শনাক্ত করা এবং তার মধ্য থেকে ৯০ ভাগ রোগীকে সেবার আওতায় আনা। এটিই হচ্ছে বিশ্ব ধারণা। আমরা এখন সাধারণ মানুষের কাছ থেকেও সহায়তা পাচ্ছি। যৌনজীবন থেকেই একমাত্র এইডসের বিস্তার নয়। নানা কারণেই এইডসের বিস্তার ঘটছে। এটি বোঝাতে পারাই হচ্ছে আমাদের সফলতা।

এএসএস/এমএআর/এমএসএইচ