জনগণ ভোটবিমুখ, এটি আমাকে ভাবায়

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:৪০ পিএম, ০৬ মার্চ ২০২০

আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, এমপি। সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। জাতীয় সংসদের হুইপ। রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও শিষ্টাচার নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র।

রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ‘লোক দেখানো’ আয়োজনের সমালোচনা করে বলেন, ‘রাজনীতির অপসংস্কৃতি কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না। শোভাযাত্রা, পোস্টার বা বিলবোর্ডে জনপ্রিয়তা পাওয়া যায় না। জনপ্রিয়তা পেতে হলে মানুষের হৃদয়ে ছবি আঁকতে হয়।

জনকল্যাণ নিশ্চিত করা সংসদ সদস্যদের সেবামূলক কাজ নয়, মূলত ‘বাধ্যতামূলক কাজ’ বলে মতামত ব্যক্ত করেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ : এর আগে বলেছিলেন, ব্যানার, পোস্টার বা ছবির রাজনীতির সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনীতি যায় না। কিন্তু আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারাও এখন এমন রাজনীতি করে আসছেন।

আল মাহমুদ স্বপন : আমি মনে করি, আওয়ামী লীগ এ রাজনীতি ধারণ করে না। আওয়ামী লীগের যে নেতারা এ সংস্কৃতি ধারণ করছেন, তাদের প্রতি আমার বিনীত অনুরোধ থাকবে, আপনারা এ সংস্কৃতি থেকে সরে আসুন।

আমি স্বপনের নিজস্ব কোনো আলো নেই। শেখ হাসিনাই আমার আলো। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ফের ক্ষমতায় আসে। ২০২০ সাল চলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কারণে এ সময়ে একটি ভোটও কমেনি। কিন্তু আয়নায় নিজের চেহারা দেখলেই সব পরিষ্কার বোঝা যাবে, আমার কারণে এলাকায় ভোট কমেছে না বেড়েছে।

আমি যদি সত্যিকার অর্থে আওয়ামী লীগ করি, তাহলে এমন কোনো কাজ করা ঠিক হবে না যে কারণে আওয়ামী লীগের ক্ষতি হবে। আওয়ামী লীগের নেতাদের আরও বিনয়ী হতে হবে। মনে রাখতে হবে, মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস শেখ হাসিনার ওপর। নিজের যোগ্যতায় নয়, শেখ হাসিনা দয়া করলে আমরা পদমর্যাদা পাই। তাহলে নিজেদের নিয়ে এত প্রচারের কী আছে?

রাজনীতির অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধে নেমেছি। তাতে পদ থাকুক বা না থাকুক, আমি বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে ধারণ করি।

জাগো নিউজ : আপনি সমস্ত ক্রেডিট শেখ হাসিনাকে দিচ্ছেন। কিন্তু একটি দল বা সংগঠন অনেকগুলো আলোর সমন্বয়ে চলে…

আল মাহমুদ স্বপন : অবশ্যই একটি দল বা সরকার টিমওয়ার্কের মাধ্যমে চলে। কিন্তু টিমলিডার যদি সবাইকে নিজের আলোয় আলোকিত করতে ব্যর্থ হন, তাহলে টিমও ব্যর্থ। ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র তৃতীয় বিশ্বে কখনই সুখকর হয়নি। বাংলাদেশেও যখনই ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র তৈরি হয়েছে, তখনই সেই সরকারের পতন হয়েছে।

abu-sopon

আপনি সৃষ্টির রহস্যও দেখতে পারেন। চাঁদের কোনো নিজস্ব আলো নেই। সবই সূর্যের আলোয় আলোকিত। সূর্যের আলোয় যদি সবই আলোকিত হয়, তাহলে শেখ হাসিনার আলোতে কেন আমরা আলোকিত হতে পারি না? শেখ হাসিনার আলো ধারণ করে তার প্রতিফলন ঘটাতে পারলেই সমাজ সুন্দর হবে। আমার নিজের এত আলোর দরকার কী?

জাগো নিউজ : কিন্তু নেতাদের আত্মপ্রচারের রাজনীতি শেখ হাসিনা নিজেও দেখেন। যে প্রচারে শেখ হাসিনাকেই কেন্দ্রে রাখা হয়…

আল মাহমুদ স্বপন : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ রাজনীতি কখনই পছন্দ করেন না। আপনি দেখেন, নেত্রীর ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন, কোথাও আড়ম্বরতা পছন্দ করেননি।

জাগো নিউজ : যারা অপসংস্কৃতির রাজনীতি করেন, তাদের বিরুদ্ধে তো সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেবার কথা?

আল মাহমুদ স্বপন : বিষয়টি আসলে এভাবে কেউ সামনে আনেনি। যথেষ্ট হয়েছে। এখন থামানো দরকার। বলতে পারেন, এ রাজনীতির বিরুদ্ধে আমিই প্রথম আওয়াজ তুলেছি।

জাগো নিউজ : মানুষ ভোটবিমুখ। সিটি নির্বাচন, উপ-নির্বাচন তার প্রমাণ। বলা হয়, ভোটের জন্য জনমানুষের কাছে যেতে হয় না বলে মহড়ার রাজনীতি, ক্যামেরার রাজনীতি গুরুত্ব পাচ্ছে…

আল মাহমুদ স্বপন : একটি বা দুটি নির্বাচন আমলে নিয়ে গোটা রাজনীতিই মূল্যায়ন ঠিক নয়। তবে আপনার এ প্রশ্ন আমার মাথাতেও ঘুরপাক খাচ্ছিল। এ কারণেই আমি লড়াইটা শুরু করেছি।

বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি আমাকে শিখিয়েছে, রাজনীতি করতে হবে মানুষকে নিয়ে। আর কিছুই করার দরকার নেই। একজন কর্মী যদি বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি মনোযোগ দিয়ে পড়েন এবং তা ধারণ করেন, তাহলে তিনি নিজেকে একজন পরিশুদ্ধ নেতা হিসেবে গড়ে তুলতে পারবেন।

আমার ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা বলি। আমার নির্বাচনী এলকায় ১৫টি ইউনিয়ন এবং তিনটি পৌরসভা রয়েছে। আমি একজন সৌভাগ্যবান সংসদ সদস্য। কারণ আমার এলাকার এমন কোনো পাড়া বা মহল্লা নেই, যেখানে আমি যাইনি। আমার অনেক অরাজনৈতিক বন্ধু আছে। তারা আমার হয়ে বিভিন্ন কৌশলে বিভিন্নজনের সঙ্গে আলোচনা করে মতামত নেন। তাদের কাছ থেকে আমি পক্ষে-বিপক্ষের মতামত নিই।

মানুষ যদি ক্রমাগতভাবে খারাপ ভাবতে থাকে তাহলে আমি ভোটের বাজারে অচল। আমাকে দিয়ে ভোট হবে না। আবার আমি জনে জনে গিয়ে বলতে পারব না, আমি ভালো মানুষ। এ কারণে আমি সেই কাজগুলো করার চেষ্টা করি না, যা মানুষ পছন্দ করেন না। আমার কাজের মধ্য দিয়ে ভালোবাসা প্রমাণ করার চেষ্টা করি। এতে মানুষও আমার প্রতি ভালোবাসা দেখাতে চায়। আমার ওই অরাজনৈতিক বন্ধুদের কাছ থেকে জনমত নিয়ে এখন এমন ধারণা পোষণ করতেই পারি।

sopon

বড় জনসভা করে দেখেছি, আমরা মানুষ টানতে পারি না। কর্মী আসে। আমাদের প্রতি মানুষের আবেদন কমে গেছে। ইমেজ সংকট আমাদের। বড় জনসভার আয়োজন করে কর্মী-সমর্থকদের বক্তব্য শুনে লাভ কী? আমি খারাপ কাজ করলেও কিছু মানুষ আছে, আমাকে ভোট দেবে, কিছু মানুষ আমাকে ভোট দেবে না।

কিন্তু এর বাইরেও বিশাল একটি জনগোষ্ঠী আছে, যারা নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে। এ মানুষগুলোকে যদি আমি ধারণ না করি, তাহলে তারা কোনোদিনই আমার প্রতি আস্থাশীল হবেন না। এ কারণে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, মানুষ আমার কাছে আসবে না। আমি মানুষের কাছে যাব। আমি প্রতিটি ইউনিয়নে ‘জনতার মুখোমুখি’ অনুষ্ঠানে করেছি। মানুষ উন্মুক্ত আলোচনায় প্রশ্ন করেছে আমায়।

জাগো নিউজ : এমন আলোচনার অভিজ্ঞতা কেমন?

আল মাহমুদ স্বপন : একজন এমপি-কে সাধারণ মানুষ অতিমানব মনে করেন। প্রথম প্রথম তারা ভয়ে প্রশ্ন করতে চাইত না। আমি তখন লিখিত প্রশ্ন করার নিয়ম চালু করলাম। অনেকে আবার লিখিত প্রশ্নও করতে চায় না। আমি বক্স রেখে দিলাম। সেখানে নামে-বেনামে অনেকেই লিখিত প্রশ্ন করতে থাকলেন। আমি এমন প্রশ্নের আলোকে মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে থাকলাম।

সরকার বাধ্য পার্লামেন্টে জবাবদিহি করতে। আর সংসদ সদস্যরা বাধ্য জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে।

জাগো নিউজ : আলোচনা হচ্ছিল মানুষ ভোটবিমুখ হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতি আপনাকে ভাবাচ্ছে কি-না?

আল মাহমুদ স্বপন : জনগণ ভোটবিমুখ, এটি আমাকেও ভাবায়। এ কারণেই জনগণের কাছে যাওয়ার লড়াইটা শুরু করেছি।

জাগো নিউজ : সার্বিক বিবেচনায় কী বলবেন?

আল মাহমুদ স্বপন : কর্মী-সমর্থক-নেতা, সবাই আমার রাজনৈতিক সহকর্মী। অনেকেই নির্বাচন করতে আগ্রহী। আমি তাদের কাছে বিনীত অনুরোধ করব, আমাদের পেছনে না ঘুরে, আমাদের ছবি না ব্যবহার করে মানুষের হৃদয়ে অবস্থান করেন।

এত উন্নয়ন মানুষ আগে কখনও দেখেনি। মানুষের কাছে যাবার ব্যাপক সুযোগ। শেখ হাসিনা মানুষের কল্যাণে যা করছেন, তা তুলে ধরতে পারলে অনেকেই আওয়ামী লীগের প্রতি আকৃষ্ট হবে। আমরা সাধারণ মানুষকে ধারণ করতে পারছি না।

মুজিববর্ষের শপথ হোক, আগামী ১৭ মার্চের আগে সব বিভেদ ভুলে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর আকাঙ্ক্ষার আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করি।

জাগো নিউজ : বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল ভাত-ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। উন্নয়নের কথা বললেন। কিন্তু উন্নয়ন প্রশ্নে মানুষের ভোটের অধিকার, বাকস্বাধীনতা চাপা পড়ে যাচ্ছে বলেও প্রশ্ন উঠছে…

আল মাহমুদ স্বপন : এটি একধরনের অনভিপ্রেত অভিযোগ। প্রধানমন্ত্রী ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় যে লড়াই করছেন, তা আর কেউ করেননি।

বাংলাদেশের মতো বাকস্বাধীনতা আর কোথায় আছে? টেলিভিশনের আলোচনাগুলোয় সত্যের সঙ্গে মিথ্যার যে বেসাতি দিয়ে সরকারের সমালোচনা করা হয়, তা বিশ্বের আর কোথাও পাবেন না।

জাগো নিউজ : সে সমালোচনা টেলিভিশনের ক্যামেরাতেই বন্দি থাকছে কি-না? রাজনীতির মাঠে তো কাউকে নামতে দেয়া হচ্ছে না…

আল মাহমুদ স্বপন : ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় যে কেউ আন্দোলন করতে পারেন। আপনাকে মনে রাখতে হবে, দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেশ স্থিতিশীল পর্যায়ে আছে। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির নাম স্বাধীনতা নয়।

হরতাল ডাকা আপনার নাগরিক অধিকার। আবার হরতাল না মানার অধিকার আছে রিকশাচালকের। আপনি তাকে মানতে বাধ্য করাতে পারেন না।

জাগো নিউজ : বাধ্য করার রেকর্ড আপনাদেরও আছে…

আল মাহমুদ স্বপন : হ্যাঁ। আমরাও এক সময় পিকেটিং করেছি। কিন্তু হরতাল আহ্বান করার সাবজেক্ট থাকতে হবে, আবেদন থাকতে হবে। আপনি অন্যায্য দাবি আদায়ে পেট্রল বোমা মেরে মানুষ হত্যা করতে পারেন না। আমরা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার করতে হরতাল করেছি। অধিকার হরণ করতে নয়।

এএসএস/এমএআর/জেআইএম