ছিঁচকে চোর থেকে চট্টগ্রামের ‘গব্বর সিং’

আবু আজাদ
আবু আজাদ আবু আজাদ , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:১৫ পিএম, ০৯ জানুয়ারি ২০২১
কালো জ্যাকেট পরিহিত সন্ত্রাসী নুরে আলম ওরফে নুরু

জলপাই রঙের একটি ধূসর শার্ট, একটি পিস্তল, একজোড়া জুতো, তার মাঝেই দাঁড়িভর্তি একটি অগোছালো মুখ; যে চেহারাটা ভাবলেই শরীরের সমস্ত রক্ত হিম করে দেয়, মনে পড়ে সেই ‘গব্বর সিং’ এর কথা? এক সময় ‘বাজে লোক’ বলতে এই একটা মুখই ফুটে উঠত মানসপটে। এখনো বলিউডে সেই ‘গব্বর সিং’র বেশ চর্চা। তবে ‘কুৎসিত’ রাজনীতি চট্টগ্রামের পাহাড়ে জন্ম দিয়েছে এ যুগের ‘গব্বর সিং’ কে। তিনি নগরের অন্ধকার জগতের অঘোষিত ‘রাজা’ আকবর শাহ এলাকার সন্ত্রাসী নুরে আলম ওরফে নুরু (৪০)।

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মৃত ধনা মিয়ার ছেলে নুরুর জীবন-যাপন ছিল অনেকটা বলিউডের ভিলেন ‘গব্বর সিং’ এর মতো। গুলি ও এলোপাতাড়ি কিরিচ চালানোয় পারদর্শী নুরু। আছে তার প্রশিক্ষিত বাহিনীও। সেই বাহিনীর হাতেই ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বেশ ক’বার হামলার শিকার হয়েছে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় নিয়োজিত বাহিনী পুলিশ। সর্বশেষ গত ২৬ ডিসেম্বর বিকেলে চট্টগ্রাম নগরীর আকবর শাহ থানার ১ নম্বর ঝিল এলাকায় নুরুকে গ্রেফতারে অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় সন্ত্রাসীদের অতর্কিত আক্রমণে সেখান থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হন পুলিশ সদস্যরা। সেদিন উভয়পক্ষের মধ্যে গুলিবিনিময়ের ঘটনাও ঘটে।

তবে সিনেমার গব্বরের মতো শেষ রক্ষায় হয়নি সন্ত্রাসী নুরুরও। গত শুক্রবার (৮ জানুয়ারি) রাতে তাকে সহযোগীসহ নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শান্তির হাট থেকে আটক করে আকবর শাহ থানা ও নগর গোয়েন্দা পুলিশের যৌথ টিম।

যেভাবে সন্ত্রাসী নুরুর উত্থান
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি কোনো এক সময় কুমিল্লা থেকে এসে চট্টগ্রামের ফিরোজ শাহ কলোনীর নাছিয়া ঘোনা ১নং ঝিল এলাকায় বসতি গড়েন নুরুর বাবা ধনা মিয়া ভাণ্ডারী। শিশুকাল থেকেই নাছিয়াঘোনায় বেড়ে ওঠেন নুরুল আলম ওরফে নুরু। তার কর্মজীবন শুরু হয় নগরের ফয়স’লেকে কনকর্ড গ্রুপের কর্মচারী হিসেবে। সেই থেকে তার পাহাড় যাত্রা। শুরুতে পাহাড়ে বসবাস ও পরে পাহাড়ের মাটি চুরি। এরপর পাহাড় দখলের মাধ্যমে ঘটে নুরুর অন্ধকার জগতের বিস্তৃতি।jagonews24

নুরুর বিরুদ্ধে রয়েছে ৩০টির বেশি মামলা, গুলি ও এলোপাতাড়ি কিরিচ চালানোয় পারদর্শী এই সন্ত্রাসী

পুলিশের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় মাদক ও অস্ত্র কারবার, চুরি, ডাকাতি, লুটপাট, পাহাড় কাটাসহ বিভিন্ন অপরাধে নুরুর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। শুধু ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নগরের আকবর শাহ থানা ও খুলশী থানায় ১৮টি মামলা দায়ের হয় তার বিরুদ্ধে। বর্তমানে সেই মামলার সংখ্যা ৩০; অর্থাৎ গত দুই বছরে তার বিরুদ্ধে আরও ১২টি মামলা দায়ের হয়েছে।

২০১৪ সালের ৬ জুলাই অস্ত্রসহ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলেও পরে জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বের হন সন্ত্রাসী নুরু। এরপর আর পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি। ১ নম্বর ঝিলের প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছিল নুরুর গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক। পুলিশ বা গোয়েন্দা—যারাই ওই এলাকায় প্রবেশ করতেন, সে তথ্য পৌঁছে যেতো নুরুর কাছে।

তার নিয়ন্ত্রিত এলাকার তিন রাস্তার মুখে দিনের বেলায় পাহারা ও ভেতরে অস্ত্র হাতে পাহারায় থাকতো লোকজন। একবার রাতে অভিযানে গিয়ে বৈদ্যুতিক বেষ্টনীতে আটকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন এক পুলিশ কনস্টেবল।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) উপ-কমিশনার (পশ্চিম) ফারুক উল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘নুর আলম প্রকাশ নুরু এক সময় ফয়স’লেক কনকর্ড গ্রুপের কর্মচারী ছিলেন। সেখান থেকে একসময় তার পাহাড়ে যাতায়াত শুরু হয়। এরপর আস্তে আস্তে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েন নুরু। প্রথম দিকে ছিঁচকে চুরি, সেইসঙ্গে পাহাড়ের মাটি কেটে বিক্রি করতেন। তার অপরাধের প্রবণতা যত বাড়তে থাকে, সাঙ্গপাঙ্গও বাড়তে থাকে। এর মধ্যে এলাকার অনেকেই তাকে কাজে লাগাতে শুরু করে। এক সময় তিনি হয়ে ওঠেন ওই পাহাড়ি এলাকার অঘোষিত ডন।’

jagonews24

নুরুকে গ্রেফতারে যাওয়া পুলিশের ওপর এভাবেই হামলা চালানো হয়

নুরুর ঘরই সন্ত্রাসের ডেরা
সন্ত্রাসী নুরুর ছোট ভাই জানে আলম। নগরের বিভিন্ন থানায় হামলা, ভাঙচুর, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, অস্ত্রচালান, পাহাড় কাটা, লুটপাট, চুরিসহ নানান অপরাধমূলক কাজে জড়িত থাকায় জানে আলমের বিরুদ্ধে ২০১৩ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১০টি মামলা হয়েছে। তিনি আকবর শাহ থানার ৩ নং সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত আসামি।

সন্ত্রাসী নুরুর ভগ্নিপতি রুবি বেগমের স্বামী আবুল কাসেম আলমগীরের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের ১০ জুন নারী নির্যাতন, ঘরবাড়িতে হামলা, লুটপাটের অভিযোগে লক্ষীপুর সদর থানায় মামলা দায়ের হয়। ২০১৬ সালের ১৩ জুন বসতঘরে অগ্নিসংযোগের মামলা দায়ের হয় আকবর শাহ থানায়। ২০১৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ফিরোজ শাহ কলোনির ১ নং ঝিল এলাকা থেকে একটি এলজি, দুই রাউন্ড গুলিসহ আলমগীরকে গ্রেফতার করে আকবর শাহ থানা পুলিশ। সব মিলিয়ে আলমগীরের বিরুদ্ধে লক্ষীপুর ও আকবর শাহ থানায় ছয়টি মামলা রয়েছে।

নুরুর বোন অর্থাৎ আলমগীরের স্ত্রী রুবি বেগমের বিরুদ্ধেও অস্ত্র ও পুলিশের ওপর হামলার দুটি মামলা রয়েছে। নুরুর পিতা ধনা মিয়া ও মা আনোয়ারা বেগমের নামেও রয়েছে মামলা। ২৬ ডিসেম্বর পুলিশের ওপর হামলার ঘটনার পর থেকে নুরুর ভাই জানে আলম, ভগ্নিপতি আলমগীর, পিতা ধনা মিয়া ও মা আনোয়ারা বেগম পলাতক রয়েছেন।

সর্বশেষ নুরুকে গ্রেফতারের পর শুক্রবার রাতে তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে একটি ওয়ান শ্যুটারগান, একটি রিভলবার, দুটি ধারালো কিরিচ, একটি ধারালো রাম দা ও ৪০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে।

jagonews24

সন্ত্রাসী নুরুর সঙ্গে আকবর শাহ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী আলতাফ হোসেন

নগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মো. কামরুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘কলোনিটির কয়েকটি বাসার মাটির নিচে নুরুর অনেক অস্ত্র মজুদ রয়েছে—এ তথ্য আমাদের কাছে আগে থেকেই ছিল, তবে কলোনির কোন বাসায় এসব অস্ত্র রাখা হয়েছে তা শুধু নুরু, তার ভাই জানে আলম ও বোন রুবি বেগমই জানতেন। নুরুকে গ্রেফতারের পর তার বাড়ির দেয়ালের নিচ থেকে গর্ত খুঁড়ে এসব অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।’

অপরাজনীতির কালোছায়া গড়ে তোলে নুরুদের
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নুরু একসময় বিএনপির রাজনীতি করতেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার হাত ধরে তিনি হয়ে ওঠেন বেপরোয়া। বাড়তে থাকে তার অপরাধের পরিধি, বাড়তে থাকে মামলাও। ২০১৪ সালে নুরুর বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ছিল ১৭টি, কিন্তু বর্তমানে সেই সংখ্যা ৩০ এর কোঠায়।

এর মধ্যে ২০১৪ সালে দায়ের হওয়া অস্ত্র মামলায় দুই বছর আগে ২০১৯ সালের ১৭ আগস্ট তার বিরুদ্ধে ১৭ বছর কারাদণ্ডের আদেশ হলেও সেই সাজা পরোয়ানা থানার নথিতে পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, কৌশলে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সাজা পরোয়ানা গায়েব করেছেন নুরু। অথচ সাজা পরোয়ানা মাথায় নিয়ে পূর্ব ফিরোজশাহ নাছিয়াঘোনা এলাকায় সরকারি পাহাড় দখল করে নুরু গড়ে তুলেছেন নিজস্ব সাম্রাজ্য।

অভিযোগ আছে, ১৭ বছরের সাজাপ্রাপ্ত নুরুকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছিলেন আকবর শাহ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী আলতাফ হোসেন। এ আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও যেতেন নুরু। কাজী আলতাফ হোসেনের সঙ্গে নুরুর অনেক ছবি এখনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাসছে।

jagonews24

নুরুকে গ্রেফতারকালে উদ্ধার ওয়ান শ্যুটারগান, পিস্তল, রাম দা ও ছুরি

যদিও এ বিষয়ে জানতে চাইলে আলতাফ হোসেন জাগো নিউজের কাছে দাবি করেন, ‘নুরুর সঙ্গে সম্পর্ক দূরের কথা, যোগাযোগও নেই।’

সূত্র বলছে, শুধু কাজী আলতাফ নন, অনেকের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই ছিঁচকে চোর থেকে ‘গব্বরে’ পরিণত হয়েছিলেন নুরু। পূর্ব ফিরোজশাহ ১ নম্বর ঝিলপাড়, নাছিয়াঘোনা, বেলতলী ঘোনায় একসময় ছিন্নমূল মানুষজন পাহাড়ি খাস জায়গায় গিয়ে বসতি স্থাপন করলেও এখন সেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন বসবাস করছে। তারা নুরু বাহিনীর হাতে গড়ে ওঠা জমি ও প্লটের মালিক হয়েছেন। ও লোকেরাই নুরুকে পালাতে এবং পুলিশি অভিযান প্রতিরোধে সাহায্য করেছিলেন। এমনকি গ্রেফতারের পর তাকে সাজার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য বিভিন্ন আইনজীবীর কাছেও যাচ্ছেন এই লোকেরা।

এক বছরেও থানায় পৌঁছেনি সাজা পরোয়ানা!
২০১৪ সালের ৬ জুলাই রাতে আকবর শাহ থানার ফিরোজ শাহ কলোনির ওবেট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছন থেকে দেশীয় তৈরি এলজি ও এক রাউন্ড কার্তুজসহ নুরুকে আটক করে পুলিশ। এ মামলায় দুই বছর আগে ২০১৯ সালের ১৭ আগস্ট তার বিরুদ্ধে ১৭ বছর সাজার আদেশ হলেও সেই সাজা পরোয়ানা আকবর শাহ থানার নথিতে নেই বলে জানিয়েছে পুলিশ।

সিএমপির উপ-কমিশনার (পশ্চিম) ফারুক উল হক এ বিষয়ে জাগো নিউজকে বলেন, ‘২০১৪ সালের একটি মামলায় নুরুর বিরুদ্ধে ১৭ বছরের সাজা দেন বিজ্ঞ আদালত। এর আগে ওই মামলায় জামিন পেয়ে তিনি আর আদালতে হাজির হননি; তাই তার অনুপস্থিতিতেই মামলার রায় হয়। কিন্তু বিজ্ঞ আদালতের আদেশের কপি থানায় না পৌঁছানোয় নুরুর সাজার বিষয়ে পুলিশ জানতেই পারেনি। বিষয়টি আমরা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছি।’

আবু আজাদ/এইচএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]