সিগন্যাল বাতি জ্বলে না, হাতের ইশারায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ

মুসা আহমেদ
মুসা আহমেদ মুসা আহমেদ
প্রকাশিত: ০৮:৪১ এএম, ০৩ মার্চ ২০২১

রাজধানীর গুলশান-১ নম্বর গোলচত্বরে পৃথক চারটি স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক বাতির খুঁটি রয়েছে। প্রতিটি খুঁটিতে রয়েছে ছয়টি করে স্বয়ংক্রিয় বাতি এবং দুটি করে সিসিটিভি ক্যামেরা। গাড়ির চালক, যাত্রী, পথচারী সবারই নজর বাতিগুলোতে। কিন্তু স্থাপনের দুই বছরেও জ্বলতে দেখা যায়নি স্বয়ংক্রিয় বাতিগুলো। অব্যবস্থাপনা আর অবহেলায় সেগুলোর ওপর জমেছে কয়েক স্তরের ধুলাবালির আবরণ।

স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণের জন্য বাতিগুলো বসানো হলেও মুখে বাঁশি, হাতে লাঠি এবং রাস্তায় দড়ি টেনে কাজটি করতে হচ্ছে পুলিশ সদস্যদের।

উল্লিখিত পয়েন্টটি ছাড়াও গুলশান-২ নম্বর গোলচত্বর, মহাখালী রেল ক্রসিং (জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সামনে), বিজয় সরণি, মিরপুর রোড, পল্টন মোড়, কাকরাইলসহ নগরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতেও একই চিত্র দেখা গেছে। অথচ গত ২০ বছরে ঢাকা শহরে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ ও সিটি করপোরেশন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে ৭০ কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু কোনো উদ্যোগই শেষ পর্যন্ত সাফল্যের মুখ দেখেনি। তাই এখনো ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে ভরসা পুলিশের সেই হাতের ইশারা।

jagonews24

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক শামসুল হক মনে করেন, শিগগির সিগন্যাল বাতিগুলো ব্যবহার না করা হলে নষ্ট হয়ে যাবে। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘এসব বাতি জ্বালাতে পুলিশের প্রকৌশল বিভাগের প্রয়োজন পড়ে না। রিমোটের মাধ্যমেই চালানো সম্ভব। সিগন্যাল বাতিগুলো এখনই কার্যকর করতে হবে। অন্যথায় যত বড় বড় প্রকল্পই হাতে নেয়া হোক না কেন, সুফল মিলবে না।’

ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার যত প্রকল্প
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রকৌশল দফতর সূত্র জানায়, ২০০০ সালে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে (প্রায় ২৫ কোটি টাকা) ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ ৭০টি মোড়ে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সংকেত বাতি বসানোর কাজ শুরু হয়। ‘ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট’ প্রকল্পের আওতায় এই কাজ শেষ হয় ২০০৮ সালের শেষ দিকে। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহার না হওয়ায় অল্পদিনেই অধিকাংশ বাতি অকেজো হয়ে পড়ে। ২০০৯ সালের নভেম্বরে নগরের অর্ধশতাধিক মোড়ে পরীক্ষামূলকভাবে স্বয়ংক্রিয় বাতি ব্যবহার শুরু করে পুলিশ। কিন্তু তিন-চারদিনের মাথায় সেই পুরোনো পদ্ধতি অর্থাৎ হাত ও বাঁশিতে ফিরে যায় পুলিশ।

২০১০-১১ অর্থবছরে নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) নামে আরেকটি প্রকল্প হাতে নেয় ঢাকা সিটি করপোরেশন। তখন প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে স্বয়ংক্রিয় বাতি সংকেত সরঞ্জাম কেনা হয়। ২০১২ সালে কাকলী থেকে শাহবাগ পর্যন্ত ১১টি স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সংকেত ব্যবস্থা চালু করা হয়। কিন্তু এরপর তীব্র যানজটে পুরো ঢাকা স্থবির হয়ে পড়ে। স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা কার্যত ব্যর্থ হয়। তারপর আবারও স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সংকেত ব্যবস্থা চালু করতে ফের উদ্যোগ নেয় কেইস প্রকল্প। এই প্রকল্পের অধীনে গত ৯ বছরে নগরের বিভিন্ন স্থানে ৩৫টি নতুন সংকেত বাতি বসানো হয়। সেগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের হাতে দেয়া হয় রিমোট কন্ট্রোল। যে সড়কে যানবাহনের চাপ বেশি থাকবে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে পুলিশ সদস্যরা সেখানকার সবুজ বাতি জ্বালাবেন, সংশ্লিষ্ট অন্য সড়কে তখন লাল বাতি জ্বলবে। কিন্তু বাস্তবে এই প্রকল্পটিও কোনো কাজে আসেনি।

jagonews24

কেইস প্রকল্পের দাফতরিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো ডিএসসিসির নগর ভবনে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই ৩৫টি সিগন্যাল বাতি স্থাপন ও বিদ্যমান বাতিগুলো রক্ষণাবেক্ষণে ৩২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ প্রায় ১৫টি মোড় ঘুরে কোনোটিতেই সংকেত বাতি ব্যবস্থার কার্যকারিতা দেখা যায়নি। সবখানেই হাতে লাঠি, মুখে বাঁশি নিয়ে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করছেন ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা।

গুলশান-১ নম্বর মোড়ে হাতের ইশারায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছিলেন কনস্টেবল জাহিদুল ইসলাম। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘দুই বছর আগে এই মোড়ের ট্রাফিক সিগন্যালগুলো স্থাপন করতে দেখেছি। কিন্তু এগুলো কে চালাবে, কীভাবে চলবে বা নিয়ন্ত্রিত হবে সে বিষয়ে আমাদের কেউ কোনো নির্দেশনা দেয়নি। ফলে হাতের ইশারায় যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে।’

কেইস প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৮ সালের জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলনের পর ঢাকা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে সভা করেছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয় বৈদ্যুতিক সংকেত বাতি এবং ট্রাফিক সংকেত নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগকে বুঝিয়ে দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়। সে অনুযায়ী এসব সিগন্যাল বাতির পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বটি ডিএমপিকে বুঝিয়ে দেয় সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে ২০১৯ সালের মার্চে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে।

jagonews24

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছু ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এসব সিগন্যাল বাতির দায়িত্ব বুঝে পেলেও তা পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণে ডিএমপির সক্ষমতা নেই। নেই কোনো প্রকৌশল বিভাগও। এরই মধ্যে মেট্রোরেলের নির্মাণকাজের জন্য অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সড়ক থেকে সিগন্যাল বাতি সরিয়ে নিতে হয়েছে। এখন আদৌ এই বাতি কার্যকর করা হবে কিনা সে বিষয়েও কোনো নির্দেশনা নেই।’

jagonews24

কেইস প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘তারা ট্রাফিক সংকেত বাতিগুলো সচল অবস্থায় ডিএমপিকে হস্তান্তর করেছেন। তবে মেট্রোরেল প্রকল্পের কারণে আগেই কিছু বাতি উঠিয়ে ফেলা হয়েছে। এখন মেট্রোরেলের কাজ শেষ হলে সব সড়কে একসঙ্গে বাতিগুলো ব্যবহার করতে পারবে পুলিশ। বিক্ষিপ্তভাবে সিগন্যাল বাতি জ্বালিয়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।’

এক্ষেত্রে অবশ্য ভিন্নমত পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মো. মুনিবুর রহমানের। তিনি জানান, কারিগরি ত্রুটির কারণে বাতিগুলো জ্বালানো সম্ভব হচ্ছে না। এখন বাতিগুলো সিটি করপোরেশন রক্ষণাবেক্ষণ করছে। এসব সমস্যা নিরসনে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছে। কিন্তু কবে নাগাদ সিগন্যাল বাতি কার্যকর করা হতে পারে সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি তিনি।

এমএমএ/এসএস/এসএইচএস/এইচএ/জেআইএম

দুই বছর আগে এই মোড়ের ট্রাফিক সিগন্যালগুলো স্থাপন করতে দেখেছি। কিন্তু এগুলো কে চালাবে, কীভাবে চলবে বা নিয়ন্ত্রিত হবে সে বিষয়ে আমাদের কেউ কোনো নির্দেশনা দেয়নি

এসব সিগন্যাল বাতির দায়িত্ব বুঝে পেলেও তা পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণে ডিএমপির সক্ষমতা নেই। নেই কোনো প্রকৌশল বিভাগও

মেট্রোরেল প্রকল্পের কারণে আগেই কিছু বাতি উঠিয়ে ফেলা হয়েছে। এখন মেট্রোরেলের কাজ শেষ হলে সব সড়কে একসঙ্গে বাতিগুলো ব্যবহার করতে পারবে পুলিশ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]