অ্যাপে মেপে গরু কিনছেন ক্রেতারা

নাজমুল হুসাইন
নাজমুল হুসাইন নাজমুল হুসাইন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:৫৩ পিএম, ১৩ জুলাই ২০২১

করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে কোরবানির পশু কিনতে বিপাকে পড়েছেন ক্রেতারা। অনেকেই সংক্রমণ এড়াতে হাটে না গিয়ে অনলাইনে গরু-ছাগল কিনছেন। গত বছরও এ সময় করোনার প্রকোপ ছিল বেশ। তাই অনলাইনে পশু কেনার যে ধারা শুরু হয়েছে, এবার পরিধি আরও বেড়েছে।

অনলাইনে পশু কেনার ক্ষেত্রে যারা নতুন পশু কিনতে গিয়ে তাদের কপালে ভাঁজ পড়ছে। কোন গরু ভালো, কোনোটাতে মাংস কতটুকু হবে, এ নিয়ে ধন্দে পড়ে যাচ্ছেন তারা। কিন্তু যারা জানেন, তারা এ জটিল কাজটি সহজ করেছে অ্যাপের মাধ্যমে। এমন অ্যাপ রয়েছে, যার মাধ্যমে পশুর সম্ভাব্য ওজন ও মাংসের পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এরপর আপনি নিজেই মাংসের কেজিপ্রতি দামও নির্ধারণ করতে পারবেন।

এ পদ্ধতিকে খামারিরা বলছেন ‘লাইভ ওয়েট’। তারা এ পদ্ধতির প্রচারণা চালিয়ে অনলাইনে ক্রেতাদের কাছে গরু বিক্রি করছেন। খামারি এবং ক্রেতা উভয়ই বলছেন, ওজন পদ্ধতিতে কেজি দরে পশু কিনলে ঠকার সম্ভাবনা কম। গত বছর যারা এভাবে গরুর ওজন ও মাংসের পরিমাণ নির্ণয় করে কিনেছেন তারাও বলছেন, পদ্ধতিটি কার্যকর।

ফিতা দিয়ে গরু মেপে কেনা-বেচার প্রচলন বেশ কয়েক বছর ধরে চলে আসছে। বিশেষ করে ব্যবসায়ী ও খামারিরা ওজন ছাড়া যখন গরু বেচা-কেনা করতেন তখন গরুর ওজন কত? কী পরিমাণ মাংস হবে? ইত্যাদি নানা প্রশ্ন উঠত। কেউ সহজ সমাধান দিতে পারত না। কিন্তু এখন সময় পাল্টেছে। বৈজ্ঞানিক উপায়ে পশুর ওজন পরিমাপের পদ্ধতি এসেছে। এখন ব্যবসায়ীরা হাটে-বাজারেও ফিতা নিয়ে যান। এরপর অ্যাপে ফিতায় মাপা পরিমাপ দিয়ে খুব সহজে মাংসের ওজন বা দাম নির্ণয় করা যায়।

পরিমাণ জানুন বিএলআরআই ফিড মাস্টারে

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) উদ্ভাবিত এ অ্যাপের নাম ফিড মাস্টার। গুগল প্লে স্টোরেই এটি পাওয়া যায়। এর ওয়েব ভার্সন এসেছে এ বছর। এ অ্যাপটি গত বছর থেকে ব্যবহার হচ্ছে। এ বছর আরও বেড়েছে অ্যাপের কদর। এ পর্যন্ত ৩৫ হাজার ৬০০ মানুষ অ্যাপটি ডাউনলোড করেছেন।

এ প্রযুক্তি বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৩৮টি দেশে ব্যবহার হচ্ছে। ভারত, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য দেশের মানুষও এ অ্যাপটি ডাউনলোড করেছে। গত বছর অ্যাপটির ব্যবহার পরবর্তী জরিপে বিএলআরআই দেখেছে, যারা এ অ্যাপ ব্যবহার করে মাংসের পরিমাণ নির্ণয় করে গরু কিনেছেন তারা পরে জবাইয়ের পর সেই পরিমাণ ওজনই পেয়েছেন। ফলে এ অ্যাপ ব্যবহারে ঠকার শঙ্কা কম।

কীভাবে পরিমাপ করবেন

আপনি যে গরুর ওজন নির্ণয় করতে চাচ্ছেন, সেই গরু প্রথমে সোজা করে দাঁড় করান। সকালে গরুকে খাবার দেয়ার আগে ওজন নেয়া উত্তম। এতে সঠিক ওজন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। গরুর বুকের ব্যাস কত ইঞ্চি তা বের করতে হবে এবং লেজের কাছে হাড় থেকে শুরু করে সামনের পায়ের জোড়ার গিট পর্যন্ত ফিতা ধরে দৈর্ঘ্য বের করতে হবে।

গরুর ওজন মাপার সূত্র

গরুর দৈর্ঘ্য x বুকের বেড় x বুকের ব্যাস বা বেড়/৬৬০। বুকের বেড়ের বর্গমূল ও দৈর্ঘ্য ইঞ্চিতে নিতে হবে। অর্থাৎ ধরুন, আপনার গরুটির দৈর্ঘ্য ৫১ ইঞ্চি এবং বেড় ৫৬ ইঞ্চি। তাহলে গরুর আনুমানিক ওজন হবে (৫১x৫৬x৫৬)/৬৬০ = ২৪২.৩৩ কেজি।

আর এ কাজটি দ্রুত কবরে এ অ্যাপ। আপনি শুধু অ্যাপকে দৈর্ঘ্য, বুকের বেড় জানাবেন। তারপর এটি মুহূর্তে কাঙ্ক্ষিত তথ্যটি জানিয়ে দেবে।

jagonews24

ওজন ও মাংসের পরিমাণ জানার ক্ষেত্রে ৯৫ শতাংশ যথাযথ তথ্য দেয় অ্যাপটি। অ্যাপটির মাধ্যমে গরুর চামড়া ও নাড়ি-ভুঁড়ি বাদ দিয়ে ওজন আসে।

যা বলছেন উদ্ভাবক

অ্যাপটি বানিয়েছেন বিএলআরআইয়ের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আহসানুল কবির। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, গরুর যথাযথ ব্যবস্থাপনার জন্য ফিড মাস্টার নামে এই অফলাইন মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনটি তৈরি করা হয় ২০১৬ সালে। সঠিক পরিকল্পনা, খাদ্য ও খামার ব্যবস্থাপনা ও তথ্যের অভাবে খামারের উৎপাদন অবস্থা অনুযায়ী খাদ্য চাহিদা নিরূপণ ও সঠিক সময়ে টিকা দিতে না পারায় দুধ ও মাংসের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় এবং রোগের প্রাদুর্ভাব ও বিস্তার ঘটে। ফলে খামারিরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তা খামারি ও উদ্যোক্তাদের খামার করতে নিরুৎসাহিত করে। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য একটি অফলাইন মোবাইল অ্যাপলিকেশন তৈরি করা হয়েছে।

এ অ্যাপটি যা বয়স, লিঙ্গ এবং উৎপাদন অবস্থার উপর ভিত্তি করে বুকের মাপ ও দৈর্ঘ্যে অথবা ওজন জানানো সাপেক্ষে অতি অল্প সময়ে ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের (এনআরসি) ফিডিং স্ট্যান্ডার্ড অনুসারে স্বল্প খরচে গরুর জন্য সুষম রেশন তৈরি করতে পারে।

দুধ উৎপাদনে খাবার খরচও কমিয়েছে অ্যাপটি

এ শুরু মাংসের পরিমাণ নির্ণয় নয়, অ্যাপে রেশন, বাসস্থান, ওজন, টিকার অ্যালার্ম, বই, উদ্ভাবক পরিচিতি, জরুরি যোগাযোগ ও মন্তব্যের অপশন রাখা আছে। প্রথমত এ অ্যাপটি খামারিদের গরুর খাবারের সঠিক পরিমাণ নির্ণয়ে তৈরি হয়েছিল। এ জন্য নামও দেওয়া হয়েছে ফিড মাস্টার।

পাইলটিংয়ের অংশ হিসেবে এ অ্যাপটি রাজশাহীর রাজাবাড়িহাট ও সাভারের হেমায়েতপুরে খামারি পর্যায়ে ব্যবহার করা হয়েছে। বিএলআরআই ইনোভেসন টিম ও মন্ত্রণালয় এর একজন প্রতিনিধি এই পাইলটিং পর্যবেক্ষণ করেন।

সেখানে দেখা যায় যে, রাজশাহীর রাজাবাড়িহাট ও ঢাকার সাভারের হেমায়েতপুরে পাইলটিংয়ের জন্য নির্বাচিত খামারিদের দুধ উৎপাদন পূর্বের তুলনায় গড়ে ১২.২ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া খাদ্য খরচ ৫.৮৮ শতাংশ কমেছে এবং খাদ্য সরবরাহের পরিমাণ ১২.৭৩ শতাংশ সাশ্রয় হয়েছে।

দুধের গুণগত মানের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, দুধের ননী উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কিন্তু এসএনএফ, আমিষ ও ল্যাকটোজের পরিমাণ বাড়লে তা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়েনি।

এনএইচ/এসএস/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]