দরিদ্র-ভুক্তভোগীদের তদন্তের শেষ ভরসাস্থল ‘পিবিআই’

তৌহিদুজ্জামান তন্ময়
তৌহিদুজ্জামান তন্ময় তৌহিদুজ্জামান তন্ময় , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:১৯ পিএম, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১

পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) আট বছরে মামলা তদন্তের প্রক্রিয়াকে নিয়েছে অনন্য উচ্চতায়। গত পাঁচ বছর এই ইউনিটের নেতৃত্বে রয়েছেন পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) বনজ কুমার মজুমদার। খুব অল্প সময়ে আলোচিত ও ক্লু-লেস হত্যাকাণ্ডের ক্লু উদ্ধার করে আলোচনায় আসেন তিনি। মামলার তদন্তেও আনেন নতুন ধারা। সম্প্রতি জাগো নিউজের অপরাধ বিষয়ক প্রতিবেদক তৌহিদুজ্জামান তন্ময় একান্তে কথা বলেন পিবিআই প্রধানের সঙ্গে।

জাগো নিউজ: শুরুতে পিবিআইর প্রতিষ্ঠা ও এর কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাই।

বনজ কুমার মজুমদার: পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে যাত্রা শুরু করে। ৫ জানুয়ারি, ২০১৬ সালে পিবিআইর জন্য একটি নিজস্ব বিধিমালা অনুমোদন হয়। পরে শুরু হয় পিবিআইর মামলা তদন্তের কার্যক্রম। পিবিআই মূলত ডাকাতি, খুন, দস্যুতা, নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলা, অগ্নিসংযোগ, সাইবার ক্রাইম, ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম সংক্রান্ত অপরাধ তদন্ত করে।

২০১২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ৯৭০ জন জনবল নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে ২০২০ জন জনবল নিয়ে বাংলাদেশের মোট ৪২টি জেলায় পিবিআইর ৪৯টি ইউনিট কাজ করছে। কার্যক্রম শুরুর পর থেকে পিবিআইর ইউনিটগুলো জিআর ও সিআর মামলা তদন্ত করছে। একজন ডিআইজির নেতৃত্বে পিবিআই পরিচালিত হয়। অপারেশনাল কার্যক্রম অনুসারে পিবিআইকে পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল- এ দুটি অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে। দুজন অতিরিক্ত ডিআইজির নেতৃত্বে এ দুটি অঞ্চল পরিচালিত হয়।

এছাড়া কাজের সুবিধার্থে পুরো বাংলাদেশকে আটটি অপরাধ বিভাগ, জেলা ও মেট্রোপলিটন এলাকা মিলে ৭৪টি বিভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রত্যেক ইউনিট একজন পুলিশ সুপার দিয়ে পরিচালিত। পিবিআই হেডকোয়ার্টার্সের অধীনে এসআইঅ্যান্ডও, ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব, সিটিইউ ও অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিট পরিচালিত হয়।

জাগো নিউজ: পিবিআই তদন্তকারী সংস্থা। অন্য তদন্ত সংস্থা থেকে এর পার্থক্য কী? সুষ্ঠু তদন্তের ক্ষেত্রে পিবিআই গুণগত পরিবর্তন আনতে পেরেছে কি না?

বনজ কুমার মজুমদার: তদন্ত করে থানা পুলিশ। পাশাপাশি ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চ, ঐতিহ্যবাহী সংগঠন সিআইডি ও র‌্যাবও কিছু কিছু মামলার তদন্ত করে। দেশের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, একটি স্বাধীন তদন্ত সংস্থা থাকা প্রয়োজন। আগে থানা পুলিশ না পারলে সিআইডির কাছে যেত। এখন তিনটি সংস্থা মামলার তদন্ত করছে। তিনটি সংস্থাই তদন্ত করে এবং সবারই নিজস্ব ভঙ্গি রয়েছে। আমরা একই অফিসার, আমাদের মধ্য থেকেই সিআইডি, থানা পুলিশ ও পিবিআইতে যাচ্ছে। আমরা মনে করি, যিনি আদালতে বা থানায় যাচ্ছেন তিনি কোনো না কোনোভাবে কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। সেই জায়গা পিবিআই চিহ্নিত করে কাজ শুরু করে। এখানেই পিবিআইর বিশেষত্ব।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) আদলে তৈরি পিবিআই এখন পর্যন্ত চাঞ্চল্যকর নুসরাত হত্যা মামলা, নায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলা, সগিরা মোর্শেদ হত্যা মামলা, মোনায়েম হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করে প্রশংসিত হয়েছে।

জাগো নিউজ: সিআর মামলা তদন্তে থানা পুলিশ আর পিবিআইর বিশেষত্ব কী?

বনজ কুমার মজুমদার: আমাদের কাছে মনে হয়েছে মামলা যেখানেই হোক সেটি মামলাই। সিআর ও জিআর মামলার মধ্যে পার্থক্য দুটি। একটি সরাসরি অ্যারেস্ট করা যায় ও ধর্তব্য অপরাধ অন্যটি ধর্তব্য অথবা অধর্তব্য দুটিই থাকে- আদালতের অনুমতি ছাড়া অ্যারেস্ট করা যায় না। সাধারণত আদালত অনুমতি দেন না। আদালতে দায়ের করা মামলার তদন্তে থানা পুলিশের চেয়ে গুণগত পরিবর্তন এসেছে পিবিআইর তদন্তে। কারণ পিবিআই তদন্তে ভুক্তভোগীদের বেশি গুরুত্ব দেয়। ভুক্তভোগীরা ন্যায্য সুবিধা বেশি পান। পিবিআই নিজে থেকে ভিকটিম বা ভুক্তভোগীর সঙ্গে যোগাযোগ করে। এখানে হয়রানির কোনো সুযোগ নেই। আমরা আদালতের সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ রক্ষা করি। জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব হলে, আইনের ব্যাখ্যার প্রয়োজন হলে বা অপারেশনাল সাপোর্ট দরকার হলে আমরা আদালতের শরণাপন্ন হই। অন্য সংস্থার সঙ্গে পিবিআইয়ের শুধু গুণগত নয়, মৌলিক পরিবর্তন আছে।

আমাদের ডকুমেন্টেশন ও বিভিন্ন বর্ণনা আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণে সন্তুষ্ট হয়ে সিআর মামলায় যাবজ্জীবন পর্যন্ত দিয়েছেন। সিআর মামলা বেশি ঘটে জায়গা-জমি নিয়ে ঝামেলায়। এ মামলাগুলো বেশিরভাগই হয় আদালতে। আমরা এ জায়গাটিতে স্পষ্ট করার চেষ্টা করি দলিলপত্রসহ যা প্রয়োজন সবকিছু সংগ্রহ করা। এতে ভিকটিম ও মামলার প্রতিপক্ষ- উভয়পক্ষই উপকৃত হয়।

jagonews24

জাগো নিউজ: তদন্তের শেষ ভরসাস্থল বলা হয় পিবিআইকে। কিন্তু কেন?

বনজ কুমার মজুমদার: পিবিআইতে আমি আসার পরই চেয়েছি এখানে যেন সাধারণ মানুষের অ্যাক্সেস থাকে। এটি আমার মাঠ পর্যায়ে কাজ করার দীর্ঘদিনের একটি কৌশল। আমার কাছে আসা খুবই সহজ। অফিস টাইমে সবার মোবাইল রিসিভ করার চেষ্টা করি। দূর-দূরান্ত থেকে আমার কাছে মামলার দুপক্ষেরই ভিজিটর আসেন। অফিসে বেশিরভাগই ভুক্তগোগীও আসেন। আসামিরাও বাদ যান না। অনেক ভুক্তভোগী এসে কথা বলার পর আসামি হয়ে যান, আবার অনেক আসামি কথা বলার পর নির্দোষ প্রমাণ হন। আমাদের কথা একটাই- ‘সিরাতুল মুস্তাকিম (সরল পথ, ইসলামে সঠিক পথও বলা হয়)।’

জাগো নিউজ: হত্যার অভিযোগের অধিকাংশ মামলায় বাদীপক্ষ নারাজি দেন। এসব মামলার তদন্তে পিবিআই কীভাবে কাজ করে?

বনজ কুমার মজুমদার: নারাজি দেওয়ার কয়েকটা কারণ থাকতে পারে। মার্ডার কেসে মামলার বাদীপক্ষ বেশিরভবাগ ক্ষেত্রেই নারাজি দেয়। বিভিন্ন জেলার মার্ডার কেস নিয়ে প্রতিদিন কর্মকর্তাদের নিয়ে আলোচনা করি। অনেক গরিব মানুষ মারা যান (মার্ডার হন)। পিবিআই গরিব মানুষদের মার্ডার কেসগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে। এক্ষেত্রে আমাদের বর্তমান আইজিপি মহোদয় খুবই সদয়।

এসব মামলার ক্ষেত্রে লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়ে আমাদের সরবরাহ করেন। পিবিআইতে আলাদা একটি বিভাগ রয়েছে, যেখানে মার্ডার মামলার ডকেটগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। সেক্ষেত্রে মনিটরিং হয় ঠিকমতো। অনেক মামলা রয়েছে, যা পরিবারের কাছে তথা ওই এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যকর। মামলাগুলো অনেক জটিল থাকে। সেসব মামলা যখন সাকসেস হয় তখন আমরা বিভিন্ন জেলা থেকে অফিসার এনে একদিনের একটি ওয়ার্কশপ করি।

এতে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের প্রশ্ন তোলার সক্ষমতা বাড়ে। কারণ আপনি যদি প্রশ্ন তুলতে না পারেন তাহলে মামলার সল্যুশন দ্রুত হতে পারে। পরবর্তীসময়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা নতুন কোনো মামলায় প্রবেশ করলে তার নিজস্ব কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়। যে মামলাগুলো অন্য কোনো সংস্থা ডিটেকশন করতে পারেনি সেই মামলাগুলো দ্রুত নারাজি হয় এবং পিবিআইতে চলে আসে। ইতোমধ্যে নারাজির অনেক মামলা স্বপ্রণোদিত হয়ে আদালত পিবিআইকে দিয়েছেন।

jagonews24

জাগো নিউজ: সবচেয়ে বেশি সফলতা কোথায়?

বনজ কুমার মজুমদার: আমাদের সবচেয়ে বেশি সফলতা মফস্বলে। যেখানে গরিব মানুষকে মারা হয়েছে, ডাকাতি হয়েছে, নির্যাতনের শিকার হয়েছে, প্রতিবেশীরাও সাপোর্ট দিতে পারে না। মফস্বলে আরও অনেক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে, যা পত্রিকার পাতায় স্থান পায় না। তবে পত্রিকায় আসুক আর না আসুক পিবিআই মফস্বলের মামলা সমান গুরুত্ব দিয়ে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তদন্ত করে আসছে। আমাদের অধিক সফলতাও তাই মফস্বলে।

এছাড়া সিআর মামলাগুলো তদন্তে পিবিআই বেশি সফল। আমাদের অনেক সিআর মামলা আছে (দুই ডজনের বেশি), যা তদন্ত করতে গিয়ে খুনের মামলা ডিটেক্ট করে এনেছে পিবিআই। তবে কোনো মামলাই তুচ্ছ নয়। আমার-আপনার কাছে হয়তো একটি মামলা তুচ্ছ মনে হতে পারে, কিন্তু ভিকটিমের কাছে মামলাগুলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাই পিবিআই সব মামলাই গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে।

জাগো নিউজ: তদন্তের দায়িত্বের পর এখন পর্যন্ত কতগুলো মামলার নিষ্পত্তি করেছেন?

বনজ কুমার মজুমদার: তদন্তের দায়িত্ব পেয়ে এখন পর্যন্ত নিষ্পত্তি করেছি ৬৩ হাজারেরও বেশি মামলা। এর মধ্যে আদালতে দায়ের করা মামলা রয়েছে ৫০ হাজার ৫৫৪টি। থানায় দায়ের করা মামলা ১২ হাজার ৪৯৮টি।

মুলতবি বা চলমান মামলা রয়েছে থানার (জিআর) দুই হাজার ৪১৬টি, সিআর (আদালত) মামলা চার হাজার ৮৯৭টি। এর মধ্যে ১ হাজার ২২৭টি হত্যা মামলা।

জাগো নিউজ: চাঞ্চল্যকর মামলার নিষ্পত্তি চ্যালেঞ্জিং। পিবিআই কীভাবে এটা করে?

বনজ কুমার মজুমদার: চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোতে আমরা এক্সপার্ট অফিসারদের মতামতের ওপর গুরুত্ব দেই। সেমিনার করি, কেস স্ট্যাডি করি, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে নিয়ে আসি। সেখানে নানা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হয়। এতে প্রশ্ন করার সক্ষমতা বাড়ে কর্মকর্তাদের। চাঞ্চল্যকর মামলার নিষ্পত্তিতে চ্যালেঞ্জ যেমন রয়েছে তেমনি মামলার রহস্য উদ্ঘানেও আনন্দ লাগে।

জাগো নিউজ: আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় পিবিআইর সক্ষমতা মূল্যায়ন করবেন কীভাবে?

বনজ কুমার মজুমদার: যখন একজন বাদী মামলা করেন তখন বাদীকেই সন্তুষ্ট করা আমাদের যৌক্তিক কাজ। যারা আসামি থাকেন, তারা যাতে ন্যায়বিচার পান এবং মিথ্যাভাবে বাদীকে সন্তুষ্টি করতে গিয়ে কেউ যাতে ভিকটিম না হয় সেসব দিক দেখাও জরুরি।

বিপদে প্রতিটি মানুষ যেন পিবিআইকে পাশে পায়, আমরা সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছি। কিছু ভুলত্রুটি যে আমাদের হচ্ছে না, তা কিন্তু নয়। তবে সার্বিক মূল্যায়নের জায়গা থেকে বলতে পারি, কাজের কারণেই মানুষ পিবিআইর ওপর আস্থা রাখছে, আদালতও আস্থা রাখছে, প্রশংসা করছে। পিবিআইয়ের কোনো কর্মকর্তা যদি অনিষ্ট কাজ করেই ফেলে ইউনিটপ্রধান হিসেবে সেই দায়িত্ব আমারও রয়েছে। এটা নিয়েও আমরা কাজ করি। বিচার আমার কারও না কারও কাছে দিতেই হবে।

জাগো নিউজ: পুলিশে না এলে কোন পেশায় থাকতেন এবং অবসরে গেলে কী করবেন?

বনজ কুমার মজুমদার: জীবন বাঁচাতে একটা তো কিছু করাই লাগতো। পুলিশে না এলে আমি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে থাকতাম।

অবসরের প্রশ্ন শুনে মুচকি হেসে বলেন, আর তিন বছর পর অবসরে যাচ্ছি। অবসরে গিয়ে দেখি কী করা যায়... কাজ তো একটা করতে হবে।

জাগো নিউজ: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

বনজ কুমার মজুমদার: আপনাকে ও জাগো নিউজ পরিবারকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।

টিটি/এএ/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]