জনবল সংকটে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজে ধীরগতি

মুহাম্মদ ফজলুল হক
মুহাম্মদ ফজলুল হক মুহাম্মদ ফজলুল হক , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৩৮ এএম, ২৭ অক্টোবর ২০২১
ফাইল ছবি

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম চলছে ২০১০ সালের ২৫ মার্চ থেকে। ট্রাইব্যুনালে এখন ৩৫টি মামলার বিচার কার্যক্রমসহ বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে শুনানির জন্য। এর মধ্যে ছয়টি মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন, ছয়টিতে সাক্ষ্য শেষ পর্যায়ে, একটিতে চার্জগঠনের জন্য দিন ধার্য রয়েছে এবং আটটি মামলা রয়েছে চার্জ গঠনের শুনানির জন্য। এর মধ্যে আরও আটটি মামলা বিচার শুরুর অপেক্ষায়।

স্বাধীনতার ৩৯ বছর পর ২০১০ সালের মার্চ মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। এরপর আসামির সংখ্যা ও মামলার চাপ বেড়ে যাওয়ায় আরও একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ২০১২ সালের ২২ মার্চ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ট্রাইব্যুনাল-২ নামে দুটি ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম চলে। এরপর ২০১৫ সালে ট্রাইব্যুনাল-২ নিষ্ক্রিয় করে ট্রাইব্যুনাল-১ বিচারকাজ চালিয়ে যায়। একই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর দুটি ট্রাইব্যুনালকে একীভূত করে করা হয় আরও একটি ট্রাইব্যুনাল।

ট্রাইব্যুনাল থেকে গত ১১ বছরে মোট ৪৩টি মামলায় রায় ঘোষণা করা হয়েছে। যেখানে দণ্ডিত আসামির সংখ্যা শতাধিক। এর মধ্যে রায়ে ৭১ জন আসামির মৃত্যুদণ্ড, ২২ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং খালাস পেয়েছেন একজন।

ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও প্রসিকিউটরের মৃত্যু

গত ২৬ জুন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুমের মৃত্যু হয়। এরপর গত ২৪ আগস্ট মারা যান ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. আমির হোসেন। ফলে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম বন্ধই ছিল বলা চলে। গত ১৪ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলমকে ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

বিচারপতি কেএম হাফিজুল আলম ১৭ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালে যোগদান করার পর ট্রাইব্যুনাল সচল হয়। প্রথমদিন বিভিন্ন ধরনের ১৮টি মামলায় প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট ও দিন ধার্য করেন। এরপর গত প্রসিকিউশনের আবেদনে বৃহস্পতিবার ১২ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানার আদেশ হয়। এর মধ্যে ছয়জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

এর আগে থেকেই ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলাম। তিন সদস্যের এই ট্রাইব্যুনালের অন্য সদস্য হলেন বিচারপতি মো. আবু আহমেদ জমাদার।

বৈশ্বিক মহামারি করোনাসহ অন্য সরকারি ছুটি ও বিচারক না থাকায় ট্রাইব্যুনালের বিচারে গতি ছিল ধীর। এখন বিচারক নিয়োগ দিয়ে নতুন করে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করার পরে আবারও গতি ফিরবে বলে আশা আইনজীবীদের। এখন নতুন করে গ্রেফতারি পরোয়ানা, মামলায় সাক্ষী হাজির করার জন্য প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট ও আসামিদের হাজির করার আদেশসহ নিয়মিত মামলায় সাক্ষ্য শুনানি শুরু হচ্ছে। এছাড়া সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করার পরে জাজমেন্ট দেওয়ার আগে যেসব মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য রয়েছে সেগুলো আবারও পূর্ণ শুনানি করা হবে বলে জানা যায়।

এখন যেসব মামলা সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে এগুলোসহ সব মামলার কার্যক্রমই চলবে। নতুন মামলা এলে সেসব বিষয়ে শুনানি হবে। এক কথায় ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম আবারও আগের মতোই চলবে। ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর বিচার চললেও ২০১৩ সাল থেকে রায় ঘোষণার কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর থেকে পর্যায়ক্রমে মোট ৪৩টি মামলার রায় আসে।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আরও ৩৬টি মামলা বিচারাধীন। যার একটি ময়মনসিংহের। এরই মধ্যে ৭৮টি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে। এদিকে ট্রাইব্যুনালের রায়ের পরে ৯টি মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা হয় দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে। আরও দুটি মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।

বিচারাধীন ৩৫টি মামলা

মামলাগুলোর মধ্যে যথাক্রমে ছয়টি মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন, ছয়টি মামলার সবশেষ সাক্ষী তদন্ত কর্মকর্তার (আইও) সাক্ষ্যগ্রহণ করার জন্য রয়েছে। ৯টি মামলায় সাক্ষীদের জবানবন্দি ও জেরার কার্যক্রম চলছে। সাক্ষী গ্রহণের জন্য তিনটি মামলা প্রস্তুত করা হয়েছে, চার্জ গঠনের জন্য দিন ধার্য রয়েছে একটি মামলা এবং আটটি মামলা রয়েছে ফরমাল চার্জ পর্যায়ে।

যে ছয়টি মামলা যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য রয়েছে

ময়মনসিংহের আনিসুর রহমানসহ অন্যান্য আসামি ও সাতক্ষীরার মো. আব্দুল খালেক মন্ডলসহ অন্যান্য আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য রয়েছে। মৌলভীবাজারে আব্দুল আজিজ ওরফে হাবলুসহ অন্যান্য আসামি, খুলনার আমজাদ হাওলাদারসহ অন্যান্য আসামি, বগুড়ার আব্দুল মোমিন তালুকদার ওরফে খোকা ও খলিলুর রহমানসহ অন্যদের বিষয়ে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য রয়েছে।

তদন্ত ও বর্তমান মামলা

রাষ্ট্রপক্ষের একাধিক আইনজীবীর তথ্যমতে, বিচার ও প্রাক্-বিচার পর্যায়ে থাকা ৩৫টি মামলায় আসামির সংখ্যা ২২৭। এর মধ্যে কারাগারে ১২৩ জন, পলাতক ৭৯ জন। ১৯ জন এরই মধ্যে মারা গেছেন। বাকি চারজন জামিনে আছেন। অন্য দুজন স্বেচ্ছায় ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করেন, তারাও কারাগারে।

এখন পর্যন্ত তদন্ত সংস্থায় অভিযোগ এসেছে ৭৭৮টি, যার মধ্যে ৭৮টি অভিযোগের তদন্ত শেষ হয়েছে। ২৭টি অভিযোগ তদন্তাধীন, যাতে আসামির সংখ্যা ৩৮ জন। এর বাইরে ৩ হাজার ৮৩৯ জনের বিরুদ্ধে থাকা ৬৯৪টি অভিযোগ গ্রহণ করেছে তদন্ত সংস্থা, যা তদন্ত শুরুর অপেক্ষায়।

ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করার বিষয়ে সৈয়দ হায়দার আলী জাগো নিউজকে বলেন, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালের তিনজন মেম্বারের (বিচারপতির) একজন (বিচারপতি আমির হোসেন) মারা যাওয়ার পর ওই পদটির শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল। তখন ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। হাইকোর্টের বিচারপতি কেএম হাফিজুল ইসলামকে সরকার নিয়োগ দেওয়ার পরে তিনি যোগ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সচল হয়েছে এবং কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। আমরাও আমাদের কার্যক্রম করে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনাল নতুন করে পুনর্গঠন করা হয়েছে, অনেকগুলো মামলাও আমাদের হাতে ছিল, এসব মামলায় নিয়োজিত প্রসিকিউটর ও তদন্ত কর্মকর্তারা তাদের কাজ করে যাচ্ছেন। আশা করি যেসব মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ পর্যায়ে রয়েছে, ওইসব মামলায় যুক্তিতর্ক শেষ করার পর রায় ঘোষণা করা হতে পারে।

সৈয়দ হায়দার আলী আরও জানান, এখন যদি কোনো মামলা রায়ের জন্য থাকে, সে মামলাগুলো আইন অনুযায়ী আবার সামআপ যুক্তিতর্ক পুনর্গঠন শুনানি করতে হবে।

প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্ত বলেন, যে স্বপ্ন নিয়ে জাতি ট্রাইব্যুনালের ওপর আশা রেখেছিল, মনে করি ট্রাইব্যুনাল সে আশা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছেন। কারণ, ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে যুক্ত বিচারপতি, প্রসিকিউশন, তদন্ত সংস্থা ও ডিফেন্স- সবাই আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট। তবে প্রসিকিউটর, তদন্ত কর্মকর্তা ও লোকবলের কিছুটা সংকট রয়েছে।

‘আমাদের প্রসিকিউশন থেকে চাকরি ছেড়ে অনেকেই চলে গেছেন, অনেকে বিদেশে গেছেন এবং করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারাও গেছেন একজন প্রসিকিউটর। কিন্তু আমাদের জনবল বাড়ছে না, আশা করি সরকার এ বিষয়ে সচেষ্ট।’

এফএইচ/এসএইচএস/এএ/এমএস

আমাদের প্রসিকিউশন থেকে চাকরি ছেড়ে অনেকেই চলে গেছেন, কেউ বিদেশে গেছেন এবং করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারাও গেছেন একজন প্রসিকিউটর। কিন্তু আমাদের জনবল বাড়ছে না, আশা করি সরকার এ বিষয়ে সচেষ্ট রয়েছে।

আইনের দ্বারা গঠিত একটি বিধিবদ্ধ সংস্থায় আসামিদের বিষয়ে তো খোঁজখবর আছে, তাই গ্রেফতারের আগে নাম প্রকাশ করা হয়নি। কারণ তারা পালিয়ে যেতে পারেন। আসামিদের গ্রেফতার করা হলে আদালতে হাজির করা হবে, তারপর সবাই জানতে পারবেন।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]