বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় হলে রিসাইকেল পণ্যের রপ্তানি বাড়বে

সাইফুল হক মিঠু
সাইফুল হক মিঠু সাইফুল হক মিঠু
প্রকাশিত: ১০:০১ এএম, ১৪ নভেম্বর ২০২১

রাস্তার ধারে কিংবা ময়লার ভাগাড়ে পড়ে থাকা ব্যবহৃত প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিক বর্জ্য, ঝুট কাপড় তুলে নিয়ে যান ভাঙারি শ্রমিকরা। বিভিন্ন হাত ঘুরে সেসব হয়ে ওঠে রিসাইকেল পণ্য (পুনর্ব্যবহার্য)। এভাবে একজনের জঞ্জাল অন্য আরেকজনের সম্পদ হয়ে উঠছে। এতে একদিকে পরিবেশ যেমন সুরক্ষিত হচ্ছে, তেমনি অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। প্রসার হচ্ছে দেশের শিল্প-বাণিজ্য।

বাংলাদেশে পরিত্যক্ত প্লাস্টিক রিসাইকেল করে তৈরি হচ্ছে হরেক রকমের পণ্য। সেসব পণ্য বিভিন্ন দেশে রপ্তানিও হচ্ছে। বার্ষিক ব্যবহারের ৫০ শতাংশ প্লাস্টিক রিসাইকেল করতে পারলে শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

রিসাইকেল সেক্টর, সমস্যা-সম্ভাবনা এবং উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধাসহ সার্বিক বিষয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. অদীতি শামস্। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাইফুল হক মিঠু

জাগো নিউজ: প্লাস্টিকসহ অন্যান্য পণ্য রিসাইক্লিংয়ের সম্ভাবনা কতটুকু?

ড. অদীতি শামস্: বাংলাদেশ বছরে আট লাখ প্লাস্টিক বর্জ্য নিঃসরণ করে। এর মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ রিসাইকেল হয়। দেশে প্লাস্টিকের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। প্লাস্টিকের বর্জ্য ছাড়াও গার্মেন্টসের ঝুট, ইলেকট্রনিক্স বর্জ্য রিসাইকেল করা যায়। টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে কেবল প্লাস্টিক বর্জ্য নয়, পুরো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করতে হবে। বর্জ্য কীভাবে রিসাইকেল করা যায় সেটা চিন্তা করতে হবে।

বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা ষাটের দশকে প্লাস্টিক উৎপাদন শুরু করেন। প্রথমে পুরো কাঁচামাল আমদানি করতেন তারা। সম্প্রতি রিসাইকেল করে প্লাস্টিকের অনেক কাঁচামালের জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। গার্মেন্টসের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজকে সাপোর্ট দিচ্ছে এ রিসাইকেল প্লাস্টিক। দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী ‘প্রাণ গ্রুপ’ ছাড়াও কিছু প্রতিষ্ঠান কাজ করছে এ খাতে। প্রায় ৩০০টির মতো রিসাইক্লিং ইউনিট কাজ করছে সারাদেশে।

E-waste.jpg

সারা বছর আমরা ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকার প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করি। শত কোটি টাকার প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি করি। ২০১৮-১৯ অর্থবছর ১১৯ দশমিক ৮০ মিলিয়ন (১১ কোটি ৯০ লাখ) মার্কিন ডলারের প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি হয়েছে। যার মধ্যে প্লাস্টিক বর্জ্য ছিল ১০ শতাংশেরও কম। রিসাইকেল প্লাস্টিকের রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ভালো, প্রায় ৬ শতাংশের মতো। প্রতি বছরই এটা বাড়ছে।

ই-বর্জ্য রিসাইকেল করে সেখান থেকে মূল্যবান ধাতু বের করা যায়। কিন্তু পুরো বিষয়টা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ।

গার্মেন্টসের বর্জ্য বা ঝুট আছে, রিসাইকেল করে ব্যবহার করা যায়। ছোট ছোট এসএমই প্রতিষ্ঠান এসব নিয়ে কাজ করতে পারে। গার্মেন্টস ঝুট থেকে নতুন ডিজাইনের পণ্য তৈরি করা যেতে পারে, আপসাইকেল বলে যেটাকে। ঝুট থেকে জুতা, কার্পেট তৈরি করা যায়। সমন্বয় করা গেলে এগুলোতে রপ্তানির ব্যাপক সম্ভাবনা আছে।

জাগো নিউজ: টেকসই ব্যবসা হিসেবে রিসাইক্লিং ব্যবসা কতটা উপযোগী। খাতটি আরও সমৃদ্ধ করা যায় কীভাবে?

ড. অদীতি শামস্: বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে গ্রিন ইন্ডাস্ট্রি বাড়ানো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলছেন, আগামী ১০ বছরের মধ্যে আমাদের অর্থনীতি গ্রিন বিজনেসে বড় ভূমিকায় থাকবে। গ্রিন বিজনেসের পরিধি বাড়াতে হলে এর সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি তাদের মনিটরিংয়ের মধ্যে আনতে হবে। পণ্যের বৈচিত্র্যকরণের পাশাপাশি বহুমুখীকরণেও আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। রপ্তানির ক্ষেত্রে কেবল কয়েকটি দেশে সীমাবদ্ধ না থেকে অন্য দেশেও সুযোগ খুঁজতে হবে।

জাগো নিউজ: রিসাইকেল প্লাস্টিক থেকে কী কী পণ্য তৈরি হচ্ছে? আরও কী কী পণ্যের সম্ভাবনা রয়েছে?

ড. অদীতি শামস্: রিসাইকেল প্লাস্টিক থেকে নন-ফুড আইটেম তৈরি হয়, যেমন-চেয়ার, টেবিল, গার্ডেনিং টুলস, বালতি, বেলচা ইত্যাদি। পিইটি, পিভিসি, এলপি, পিপি, পিএস প্লাস্টিক থেকে রিসাইকেল প্রোডাক্ট তৈরি হচ্ছে। এছাড়া পাইপ, টাইলস, কার্পেট, কলম, জুতা, রোড সাইড গ্লাস, টাইলসের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। ‘প্রাণ’ প্লাস্টিক রিসাইকেল করে ফেন্স তৈরি করছে। এছাড়া বাবল র‌্যাপ, গার্বেজ ক্যানের রপ্তানির সম্ভাবনা আছে। প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত প্লাস্টিক স্ট্র্যাপের ভালো বাজার আছে। কয়েকটা এসএমই প্রতিষ্ঠান এটা নিয়ে কাজ করছে।

E-waste.jpg

জাগো নিউজ: রিসাইক্লিং পণ্যের বিশ্ববাজার ধরে রাখতে কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?

ড. অদীতি শামস্: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। রিসাইকেল প্লাস্টিক যারা সংগ্রহ করবে, যারা উৎপাদন করবে তাদের জন্য প্লাস্টিক সংগ্রহ সহজ করে দিতে হবে। এ খাতে দক্ষ শ্রমিক ও ভালো মেশিনারিজ দরকার। মেশিনারিজের ক্ষেত্রে শুল্ক ও কর ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। রিসাইকেলের ক্ষেত্রে এ ধরনের ইন্ডাস্ট্রিকে গ্রিন ইন্ডাস্ট্রি ধরা হয়। দেশে ও বিদেশে আমাদের পণ্যের প্রচুর চাহিদা আছে। সাপ্লাই, ম্যানুফ্যাকচারারের অভাবে সেই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। রিসাইকেল প্রোডাক্ট তৈরিতে উদ্যোক্তারও ঘাটতি আছে। উদ্যোক্তাদের ট্রেনিং ও ঋণ সহায়তা দিতে হবে।

জাগো নিউজ: বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক বর্জ্য রিসাইক্লিংয়ের অবস্থা সম্পর্কে বলবেন?

ড. অদীতি শামস্: ই-বর্জ্য নিয়ে খুব বেশি কাজ হয়নি আমাদের এখানে। যতদূর জানি আমাদের একটা কোম্পানি কাজ করছে। তবে এটা ফরমালাইজড কিছুই হয়নি। ই-বর্জ্যের পরিবেশগত মারাত্মক ঝুঁকি আছে।

ই-বর্জ্যকে প্রসেস, রিসাইকেল করা অনেক ব্যয়বহুল। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিও আছে। দেশের প্রেক্ষাপটে এই ই-বর্জ্য রিসাইকেল করাটা একটু কঠিন। এ খাতে যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল নেই। ভাগাড় বা ভাঙারির দোকানে শিশুশ্রমের ভিত্তিতে এই ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা হয়। এতে শিশুরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে।

সঠিক ব্যবস্থাপনায় আনতে পারলে ই-বর্জ্য থেকেও রিসাইকেল করা সম্ভব হবে। ই-বর্জ্য থেকে গোল্ড, কপারের মতো মূল্যবান কিছু জিনিস বের করে আনা যায়। প্রক্রিয়াটা ব্যয়বহুল হওয়ায় ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসছেন না বলে আমার ধারণা।

জাগো নিউজ: আপনাকে ধন্যবাদ।

ড. অদীতি শামস্: জাগো নিউজকেও ধন্যবাদ।

এসএম/এমআরআর/এইচএ/এমএস

সারাবছর আমরা ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকার প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করি। শত কোটি টাকার প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি করি। ২০১৮-১৯ অর্থবছর ১১৯ দশমিক ৮০ মিলিয়ন (১১ কোটি ৯০ লাখ) মার্কিন ডলারের প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি হয়েছে। যার মধ্যে প্লাস্টিক বর্জ্য ছিল ১০ শতাংশেরও কম। রিসাইকেল প্লাস্টিকের রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ভালো, প্রায় ৬ শতাংশের মতো। প্রতি বছরই এটা বাড়ছে

ই-বর্জ্য প্রসেস, রিসাইকেল করা অনেক ব্যয়বহুল। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিও আছে। দেশের প্রেক্ষাপটে এই ই-বর্জ্য রিসাইকেল করাটা একটু কঠিন। এ খাতে যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল নেই। ভাগাড় বা ভাঙারির দোকানে শিশুশ্রমের ভিত্তিতে এই ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা হয়। এতে শিশুরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে

আগামী ১০ বছরের মধ্যে আমাদের অর্থনীতি গ্রিন বিজনেসে বড় ভূমিকায় থাকবে। গ্রিন বিজনেসের পরিধি বাড়াতে হলে এর সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি তাদের মনিটরিংয়ের মধ্যে আনতে হবে। পণ্যের বৈচিত্র্যকরণের পাশাপাশি বহুমুখীকরণেও আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। রপ্তানির ক্ষেত্রে কেবল কয়েকটি দেশে সীমাবদ্ধ না থেকে অন্য দেশেও সুযোগ খুঁজতে হবে

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]