বিমানবন্দর থেকে ২০ মিনিটেই যাত্রাবাড়ী

মফিজুল সাদিক
মফিজুল সাদিক মফিজুল সাদিক , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:৩১ পিএম, ০৫ ডিসেম্বর ২০২১

নগরীর যানজট নিরসনে জাদুরকাঠি হিসেবে কাজ করবে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (উড়াল সড়ক) প্রকল্প। দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে প্রকল্পের কাজ। চার লেনের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মূল লেনের দৈর্ঘ্য ১৯ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার। ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি ছুটবে নগরবাসীর স্বপ্নের এ প্রকল্পে। বিমানবন্দর থেকে মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটেই পাড়ি দেওয়া যাবে যাত্রাবাড়ী।

jagonews24

সরেজমিনে দেখা যায়, বিমানবন্দর সড়ক-বনানী ফ্লাইওভার লেভেল ক্রসিং পর্যন্ত কাজ এগিয়েছে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে। এ ধাপের মোট দৈর্ঘ্য ৭ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার। বলা যায় এ অংশের কাজ প্রায় শেষ দিকে। প্রকল্প শুরুর প্রথম সাত বছরে কাজের অগ্রগতি ১০ শতাংশও ছিল না। তবে নতুন করে প্রকল্পের গতি বেড়েছে। থাইল্যান্ডভিত্তিক ইটাল-থাই ও চীনের সিনোহাইড্রো ও সিএসআই শেয়ার ভাগাভাগি করে এটি বাস্তবায়ন করায় মূলত গতি পেয়েছে প্রকল্পের।

jagonews24

বিমানবন্দর থেকে বনানী পর্যন্ত পিয়ারের কাজ শতভাগ সম্পন্ন। পাশাপাশি আই গার্ডার স্থাপনের অগ্রগতিও বেড়েছে। পুরো উড়ালপথ এখনই অনেকটা দৃষ্টিনন্দন। বিমানবন্দর থেকে বনানীর রেলপথ, বনানী ও মহাখালী ফ্লাইওভার মাড়িয়ে এগোচ্ছে প্রকল্পের কাজ।

প্রকল্প এলাকায় কোথাও চলছে পাইলিং, কোথাও পিয়ারের ওপর ক্রস বিম বসানোর প্রস্তুতি। চলছে পিয়ার ঢালাইও। বিমানবন্দর এলাকায় প্রথম অংশে একপাশে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, অন্যপাশে রেললাইন। মাঝখানে চলছে প্রকল্পের কাজ। টিনের বেড়া দিয়ে ঘেরা। ভিতরে কাজ করছেন দেশি-বিদেশি শ্রমিক-প্রকৌশলীরা।

jagonews24

কুড়িল ফ্লাইওভার থেকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে নেমে ডান দিকে তাকালেই চোখে পড়বে অনেকগুলো দৃষ্টিনন্দন পিয়ার। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রথম অংশের পিয়ার এগুলো। এছাড়া কুড়িল ফ্লাইওভার থেকে দেখা মিলবে উড়ালসড়কের দৃষ্টিনন্দন কাজ। মহাখালী, তেজগাঁও, মগবাজার পর্যন্ত শতভাগ পিলারের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কমলাপুর হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্তও সমানতালে চলছে প্রকল্পের কাজ।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রতিদিন ঢাকার এক লাখ যানবাহন এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করতে পারবে। রাজধানীর ভেতরে ৩১টি স্থান থেকে উড়ালপথে ওঠানামা করবে গাড়ি। পাঁচ থেকে ছয়তলা ভবনের সমান উঁচু হচ্ছে এ উড়াল সড়কপথ। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে কাওলা থেকে শুরু হয়ে রেললাইনের ওপর দিয়ে যাচ্ছে এ সড়ক।

jagonews24

প্রকল্প পরিচালক এএইচএমএস আকতার জাগো নিউজকে বলেন, চীনের সিনোহাইড্রো প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার পর কাজে গতি পেয়েছে। এরই মধ্যে সাড়ে ছয় কিলোমিটার উড়াল সড়কের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। নির্ধারিত সময়েই বাকি কাজ শেষ হবে। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ৮০ কিলোমিটার গতিতে যানবাহন চলবে। বিমানবন্দর থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত পাড়ি দিতে সময় লাগবে মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিট।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ সূত্র জানায়, প্রকল্পটি ২০১১ সালের জুলাই থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে বাস্তবায়নের কথা ছিল। মূল প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল তিন হাজার ২১৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। পরে প্রকল্প ব্যয় অপরিবর্তিত রেখে প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। প্রকল্পটির বিদ্যমান অঙ্গসমূহের পরিমাণ ও ব্যয় বাড়ার কারণে প্রথম সংশোধনীতে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় চার হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা। একই সঙ্গে সময় বাড়ানো হয় ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। দ্বিতীয়বারের মতো প্রকল্পে সংশোধনী এনে সময় আরও বাড়িয়ে ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে কাজ শতভাগ সম্পন্ন করার কথা জানান সংশ্লিষ্টরা। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-কুড়িল-বনানী-মহাখালী-তেজগাঁও-মগবাজার-কমলাপুর-সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী-ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক (কুতুবখালী) পর্যন্ত উড়াল সড়কে নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে আট হাজার ৯৪০ কোটি টাকা।

jagonews24

নির্মাণ সুবিধার্থে প্রকল্পটি তিনটি ট্রাঞ্চে ভাগ করা হয়েছে। ট্রাঞ্চ-১. বিমানবন্দর-বনানী-রেলস্টেশন পর্যন্ত এর মোট দৈর্ঘ্য ৭ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার। এ অংশের অগ্রগতি ৭২ শতাংশ। ট্রাঞ্চ-২. প্রকল্পের মোট দৈর্ঘ্য ৫ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার। বনানী রেলস্টেশন-মগবাজার অংশের অগ্রগতি ২৬ শতাংশ পর্যন্ত। ট্রাঞ্চ-৩. মোট দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ৬৩ কিলোমিটার। তবে মগবাজার-চিটাগাং রোডের কুতুবখালী পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি তেমন হয়নি। প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৩৭ শতাংশ।

প্রকল্পের প্রথম ধাপে এক হাজার ৪৮২টি পাইলের কাজ শতভাগ সম্পন্ন। ৩২৯টির মধ্যে ২৮৫টি পাইল ক্যাপ, ৩২৯টি কলামের মধ্যে ২৭৭টির কাজ শেষ হয়েছে। এছাড়া ৩২৯টি ক্রস-বিমের মধ্যে ২৭৭টির কাজ সম্পন্ন, তিন হাজার ৭২টি আই গার্ডারের মধ্যে এক হাজার ২৪২টির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এছাড়া সম্পন্ন হয়েছে এক হাজার ৬৫টি আই গার্ডার স্থাপন।

jagonews24

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বনানী রেলস্টেশন ও তেজগাঁও রেলস্টেশন এলাকায় প্ল্যান্ট, স্টাক ইয়ার্ড ও কন্সট্রাকশন ইয়ার্ড নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে শেষ হয়েছে বনানী থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত এক হাজার ২১০টি পাইলের কাজ। এ অংশে মোট এক হাজার ৯৯৪টি পাইল হবে। এছাড়া ১১৩টি (৬৩১) পাইল ক্যাপ ও ৮০টি (৬৩১) কলামের এবং একটি (৬৩১) ক্রসবিম নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। শেষ হয়েছে কুড়িল এলাকায় সেন্ট্রাল কন্ট্রোল বিল্ডিংয়ের পাইল ড্রাইভিং কাজ। বর্তমানে পাইল ক্যাপের কাজ চলমান।

jagonews24

সরকার জনদুর্ভোগ নিরসনসহ নানা কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে অন্যতম ঢাকা শহরের উত্তর-দক্ষিণ অংশের সংযোগ ও ট্রাফিক ধারণক্ষমতা বাড়ানো, যাত্রার সময় কমানো ও ভ্রমণ আরামদায়ক করা, উত্তর ও দক্ষিণ গেটওয়ের সংযোগ উন্নত, এশিয়ান হাইওয়ে করিডোরে উন্নত পর্যায়ের সেবা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আঞ্চলিক সংযোগ উন্নত করা। এছাড়া যোগাযোগ দক্ষতা অর্জন, যোগাযোগ ব্যয় ও যানবাহন পরিচালন খরচ কমাবে এ প্রকল্প।

jagonews24

দেশের অর্থনৈতিক প্রভাবসহ প্রবৃদ্ধি অর্জনে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এটি বাস্তবায়ন হলে ঢাকা শহরের যানজট অনেকাংশে কমবে এবং ভ্রমণের সময় ও খরচও বাঁচবে। সার্বিকভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থার সহজীকরণ ও আধুনিকায়ন হলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে এ প্রকল্প।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ সূত্র জানায়, উড়ালসড়ক বাস্তবায়নের পর ঢাকার উত্তর-দক্ষিণে বিকল্প সড়ক সৃষ্টি হবে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েটি হেমায়েতপুর-কদমতলী-নিমতলী-সিরাজদিখান-মদনগঞ্জ-ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক-মদনপুরে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করবে।

উড়ালসড়ক শুধু বিমানবন্দর ও যাত্রাবাড়ী রুটের যাত্রীদেরই স্বস্তি দেবে না, একইসঙ্গে চট্টগ্রাম, সিলেটসহ পূর্বাঞ্চল এবং পদ্মা সেতু হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যানবাহন ঢাকায় প্রবেশ না করে সরাসরি উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে প্রবেশ করতে সহায়তা করবে। উত্তরাঞ্চল থেকে আসা যানবাহনগুলো ঢাকাকে বাইপাস করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সরাসরি যাতায়াত করতে পারবে। এতে ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী অংশে নিরসন হবে যানজট।

এমওএস/এমকেআর/এএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]