মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্র চালানোর শর্ত শিথিল, কমলো লাইসেন্স ফি

মাসুদ রানা
মাসুদ রানা মাসুদ রানা , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:২৭ পিএম, ০৮ ডিসেম্বর ২০২১

বেসরকারি পর্যায়ে মাদকাসক্তি নিরাময়, পুনর্বাসন ও পরামর্শ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে শর্ত শিথিল করেছে সরকার। এজন্য নতুন বিধিমালা করা হয়েছে।

২০০৫ সালের বিধিমালা বাতিল করে নতুন ‘বেসরকারি পর্যায়ে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র, মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্র ও মাদকাসক্তি পরামর্শ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনা বিধিমালা, ২০২১’ জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষাসেবা বিভাগ।

আগে ১০ শয্যার জন্য যে সংখ্যক মনোরোগ চিকিৎসক, চিকিৎসক, নার্স, আয়া, পরিচ্ছন্নতাকর্মী থাকার নিয়ম ছিল, নতুন বিধিমালা অনুযায়ী তা ৩০ শয্যার জন্য প্রযোজ্য হবে। বেসরকারি পর্যায়ে মাদকাসক্তি নিরাময়, পুনর্বাসন ও পরামর্শ কেন্দ্রের লাইসেন্স এবং লাইসেন্স নবায়ন ফিও কমানো হয়েছে।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষাসেবা বিভাগের সচিব মো. মোকাব্বির হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বেসরকারি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রগুলো যে শর্তে লাইসেন্স নিয়েছে, সে অনুযায়ী জনবল নিয়োগ, ইক্যুপমেন্ট ব্যবহার ও মেইটেন্যান্স হচ্ছিল না। এখন যেন নিরাময় ও পুনর্বাসন সঠিকভাবে চালু থাকে সেজন্য নতুন বিধিমালা করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘যেসব মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র মানসম্মত নয়, সেগুলো যেন মান নিশ্চিত করতে পারে, নতুন বিধিমালায় সে বিষয়ে নজর দেওয়া হয়েছে। তাদের আমরা সুযোগ দেবো। এরপরও যদি কেউ শর্ত পূরণ করতে না পারে, তাদের চিহ্নিত করবো এবং বন্ধ করে দেবো।’

নতুন বিধিমালায় শর্ত কিছুটা শিথিল করা হয়েছে, এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সচিব বলেন, ‘কাগজে-কলমে একটা বিষয় দিয়ে রাখলাম, কিন্তু তা মেইনটেইন করা গেলো না। এমন নিয়ম রেখে লাভ নেই। বিশেষজ্ঞ কমিটির মতামত অনুযায়ীই নতুন বিধিমালার স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ করেছি। পূরণ না হলে বিশাল টার্গেট দিয়ে তো লাভ নেই।’

মোকাব্বির হোসেন আরও বলেন, ‘মাদকদ্রব্য পুনর্বাসন ও নিরাময় কেন্দ্রগুলোকে একটা স্ট্যান্ডার্ডে আনার জন্য সরকার বদ্ধপরিকর। এ বিষয়টি সামনে রেখেই নতুন বিধিমালা করা হয়েছে।’

নতুন বিধিমালায় মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনার শর্তে বলা হয়েছে, প্রতি ১০ শয্যার জন্য পর্যাপ্ত পানি সরবরাহসহ ন্যূনতম একটি টয়লেট, গোসলখানা এবং সুপেয় পানির ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে প্রতি ৩০ শয্যার জন্য একজন সার্বক্ষণিক চিকিৎসক, একজন সার্বক্ষণিক বা খণ্ডকালীন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ, একজন কাউন্সিলর, দুজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স বা বয় ও একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী থাকতে হবে।

আগের বিধিমালায় বলা ছিল, প্রতি ১০ শয্যার জন্য পৃথক একটি টয়লেট, গোসলখানা ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা থাকতে হবে। কমপক্ষে একজন মনোচিকিৎসক (খণ্ডকালীন বা সার্বক্ষণিক), একজন চিকিৎস (সার্বক্ষণিক), দুজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স বা বয়, একজন সুইপার বা আয়া থাকতে হবে।

বিধিমালায় যুক্ত নতুন বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে- ভর্তি করা ব্যক্তিদের জন্য খাবারের মেনু পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে মহাপরিচালক বা তার কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অনুমোদিত হতে হবে। কোনো কেন্দ্র একই সঙ্গে শিশু, নারী ও পুরুষ মাদকাসক্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা বা পুনর্বাসনবিষয়ক কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাইলে লাইসেন্স নেওয়ার আগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে তা জানাতে হবে।

এক্ষেত্রে শিশু, নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা আবাসন, খাওয়া এবং শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা থাকতে হবে। শিশু, নারী ও পুরুষের জন্য স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে এবং একই ফ্লোরে শিশু, নারী ও পুরুষ মাদকাসক্ত রোগী রাখা যাবে না।

নারীদের জন্য সার্বক্ষণিক নারী চিকিৎসক ও কাউন্সিলর থাকতে হবে। তবে নারী চিকিৎসক বা নারী কাউন্সিলর পাওয়া না গেলে কাউন্সেলিং কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে পুরুষ চিকিৎসক বা কাউন্সিলর নিয়োগ করা যাবে বলে বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, নারী মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তির আগে প্রেগনেন্সি টেস্ট করতে হবে। নারী মাদকাসক্ত রোগীদের ওয়ার্ডের প্রবেশমুখে সিসি ক্যামেরা থাকতে হবে এবং ক্যামেরার ফুটেজ কমপক্ষে তিন মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে হবে।

মাদকাসক্ত রোগীর অনিচ্ছা সত্ত্বেও অভিভাবকের অনুমতি সাপেক্ষে কোনো কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট রোগীকে ভর্তি ও চিকিৎসা দিতে পারবে জানিয়ে নতুন বিধিমালায় বলা হয়েছে, তবে অনিচ্ছুক রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার আগে অভিভাবকের লিখিত অনুমতি গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট থানা ও স্থানীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অফিসকে জানাতে হবে। রোগী ভর্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রোগীর সাতদিনের মধ্যে মাদকাসক্তির প্রমাণ হিসেবে ক্লিনিক্যাল ও ল্যাবরেটরি টেস্ট করতে হবে।

প্রত্যেক কেন্দ্র তাদের দেওয়া সেবার বিষয়ে আসক্ত ব্যক্তি বা তার পরিবারের অভিযোগ করার জন্য একটি অভিযোগ বই এবং অভিযোগ বক্স সংরক্ষণ করবে বলে বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি লাইসেন্স ছাড়া কেন্দ্র পরিচালনা করলে লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র বন্ধ করে দিতে পারবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনের বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে। কোনো ব্যক্তি লাইসেন্সের শর্তভঙ্গ করলে লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৫, ১৬, ১৭ ধারার অধীনে ব্যবস্থা (লাইসেন্স বাতিল ও স্থগিত এবং জরিমানা) নিতে পারবে।

লাইসেন্স-নবায়ন ফি কমলো
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী মাদকাসক্তি পরামর্শ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার লাইসেন্স ফি এবং নবায়ন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে দুই হাজার টাকা। আগের বিধিমালা অনুযায়ী মাদকাসক্তি পরামর্শ কেন্দ্র (যেখানে রোগীর বহির্বিভাগে চিকিৎসা ও পরামর্শ দেওয়া হয়) লাইসেন্স ফি ছিল ১০ হাজার টাকা। লাইসেন্স নবায়ন ফি ছিল পাঁচ হাজার টাকা।

বর্তমানে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র/মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্র (এক বা একাধিক কেন্দ্র) প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার লাইসেন্সের ক্ষেত্রে তিন ধাপে ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। ১০ শয্যা পর্যন্ত পাঁচ হাজার টাকা, ২০ শয্যা পর্যন্ত ১০ হাজার এবং ২০ শয্যার বেশি হলে লাইসেন্স ও নবায়ন ফি ২০ হাজার টাকা।

আগে ১০ শয্যা পর্যন্ত লাইসেন্স ফি ২০ হাজার টাকা, নবায়ন ফি ১০ হাজার টাকা; ২০ শয্যা পর্যন্ত লাইসেন্স ফি ৩০ হাজার টাকা, নবায়ন ফি ১৫ হাজার টাকা এবং ২০ শয্যার বেশির ক্ষেত্রে লাইসেন্স ফি ৫০ হাজার টাকা, নবায়ন ফি ২৫ হাজার টাকা ছিল।

নতুন বিধিমালায় তিন ধাপে বিলম্ব লাইসেন্স নবায়ন ফি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। তিন মাস পর্যন্ত বিলম্বের জন্য লাইসেন্স ফির অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ, ছয় মাস পর্যন্ত বিলম্বের জন্য লাইসেন্স ফির অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ এবং ছয় মাসের বেশি কিন্তু তিন বছরের মধ্যে বিলম্বের জন্য লাইসেন্স ফির অতিরিক্ত ৬০ শতাংশ ধার্য করা হয়েছে। ডুপ্লিকেট লাইসেন্স ফির ২০ শতাংশ দিতে হবে।

আরএমএম/এএএইচ/এইচএ/এএসএম

যেসব মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র মানসম্মত নয়, সেগুলো যেন মান নিশ্চিত করতে পারে, নতুন বিধিমালায় সেই বিষয়ে নজর দেওয়া হয়েছে। তাদের আমরা সুযোগ দেবো। এরপরও যদি কেউ শর্ত পূরণ করতে না পারে, তাদের চিহ্নিত করবো এবং বন্ধ করে দেবো

বর্তমানে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র/মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্র (এক বা একাধিক কেন্দ্র) প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার লাইসেন্সের ক্ষেত্রে তিন ধাপে ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। ১০ শয্যা পর্যন্ত পাঁচ হাজার টাকা, ২০ শয্যা পর্যন্ত ১০ হাজার এবং ২০ শয্যার বেশি হলে লাইসেন্স ও নবায়ন ফি ২০ হাজার টাকা

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]