বোলার নাহিদ রানাই এখন পাকিস্তানিদের কাছে আতঙ্কের নাম
একটা সময় ছিল, যখন ইমরান খান, ওয়াসিম আকরাম আর ওয়াকার ইউনুসরা টেস্টের পর টেস্টে প্রতিপক্ষের হৃৎকম্পনের কারণ হতেন। গণ্ডায় গণ্ডায় ফাইফার পেতেন। ম্যাচে ৮, ১০ কিংবা ১২ উইকেট করে পতন ঘটাতেন।
অল্প সময়ের ক্যারিয়ারে নাহিদ রানা ঠিক তা করতে পারেননি। তবে একটা কাজ করেছেন। তা হলো, জন্মগতভাবে জোরে বল খেলা পাকিস্তানিদেরও আতঙ্কের কারণ হয়েছেন বাংলাদেশের এ ফাস্টবোলার।
বোঝাই যায়, বলের গতিই শুধু নয়, পাকিস্তানিদের কাছে বোলার নাহিদ রানাও রীতিমতো এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। তার প্রমাণ, পাকিস্তানের সবচেয়ে পরিপাটি ব্যাটিং টেকনিক ও শৈলির অধিকারী বাবর আজমও বারবার নাহিদ রানার বলেই আউট হচ্ছেন।
সেটা যে শুধু নাহিদের দ্রুত গতি আর বলের কারুকাজে, তা নয়। নাহিদ রানা নিজেই বাবর আজমের কাছে এক আতঙ্ক হয়ে গেছেন। আজ সিলেটে তার এক সাধারণ ডেলিভারিতে বাবর আজমের মিড অনে ক্যাচ দিয়ে ফেরার ঘটনাই তার প্রমাণ।
৮৪ বল মোকাবিলা করা বাবর এরচেয়ে ঢের ভালো বলের মুখোমুখি হয়েও সাফল্যের সঙ্গে উৎরে গেছেন। বেশ কিছু ভালো বলে বাউন্ডারিও হাঁকিয়েছেন। বেশির ভাগ ডেলিভারির বিপক্ষে খেলেছেন সমান আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে; কিন্তু যে বলে আউট হয়েছেন, সেটা ঠিক আউট হওয়ার মতো ডেলিভারি ছিল না। নাহিদ রানার বেশির ভাগ বলের গড়পড়তা যে গতি থাকে, ওই ডেলিভারিটি ছিল তার চেয়ে স্লো।
লেগ-মিডলে পিচ পড়া ওই ডেলিভারিটি বাবর আজম অনায়াসে আরও আস্থা, আত্মবিশ্বাস নিয়ে আরও ভালোভাবে খেলতে পারতেন; কিন্তু তিনি খেললেন কম আস্থা ও ভাঙাচোরা মনোবল নিয়ে। বোঝাই গেলো- তাসকিন, শরিফুল, তাইজুল ও মিরাজের বিপক্ষে যতটা কনফিডেন্স নিয়ে খেলেছেন, তার অনেকটাই ছিল না নাহিদ রানার বিপক্ষে। দুরু দুরু বক্ষে কাঁপা হাতে তাই তো তড়িঘড়ি করে অনসাইডে ঘোরানোর চেষ্টা করলেন। বল গিয়ে জমা পড়ল মিড অনে মুশফিকুর রহিমের বুকেরও নিচে থাকা উচ্চতায়।
আজকের আউটটা যতটা না বলের কারুকাজ ও গতিতে, তারচেয়ে অনেক বেশি বোলার নাহিদ রানার আতঙ্কে, শঙ্কায়। এটাই বোলারের কৃতিত্ব। তার বলের গতি ও কারুকাজের পাশাপাশি এখন বোলার নাহিদ রানাও পাকিস্তানিদের কাছে অনেক বড় আতঙ্কের নাম।
সেই ২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ২২ রানে নাহিদের বলে বোল্ড হওয়া দিয়ে শুরু। দ্বিতীয় টেস্টে আবার দ্বিতীয় ইনিংসে ১১ রানে তার বলে সাদমানের হাতে ক্যাচ আউট হন বাবর। আর আজকে আস্থার প্রতিমূর্তি হয়ে উঠেও আবার সেই নাহিদের বলেই ৬৮ রানে আউট হলেন।
এই যে পরপর ৩ টেস্টে ৩ বার নাহিদ রানার বলে সাজঘরে ফেরা, সেটাই বলে দিচ্ছে বলই শুধু নয়, বোলার নাহিদ রানাও এখন পাকিস্তানিদের কাছে আতঙ্কের নাম।
এটাই টেস্টে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সাফল্যের একটা বড় উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ ১৭ মে সিলেটে পাকিস্তানের ব্যাটিংটা পাখির চোখে পরখ করলে দেখা যাবে, নাহিদের বোলিংটাই বাংলাদেশকে শেষ পর্যন্ত ৪৬ রানে এগিয়ে থাকতে মূল ভূমিকা রেখেছে।
কেউ কেউ হয়তো বলবেন, কেন? তাসকিন আহমেদের শুরুতে দুটি দুর্দান্ত ডেলিভারিতে পাকিস্তানের দুই ওপেনার আজান আওয়াইজ আর আব্দুল্লাহ ফজলকে ফিরিয়ে দেওয়া, দুই স্পিনার মেহেদি হাসান মিরাজ আর তাইজুল ইসলামের স্পিন ঘূর্ণিতে শান মাসুদ, সৌদ শাকিল আর আগা সালমানের ফিরে যাওয়ার কি কোনো মূল্য নেই? আছে। অবশ্যই আছে। তারা তিনজনই কাজের কাজ করে দিয়েছেন। ভাইটাল ব্রেক-থ্রু এনে পাকিস্তানিদের জুটি বড় করা থেকে বিরত রেখেছেন।
কিন্তু যে দুজনের ব্যাট পাকিস্তানকে এগিয়ে নিয়ে গেছে, সেই বাবর আজম আর সাজিদ খানকে যদি নাহিদ রানা না থামাতেন, তাহলে পাকিস্তান লিডও নিয়ে ফেলতে পারত।
পরিসংখ্যান জানান দিচ্ছে, পাকিস্তানের পতন হওয়া ১০ উইকেটের সমান ৩টি করে জমা পড়েছে নাহিদ রানা আর তাইজুলের ঝুলিতে। আর তাসকিন ও মিরাজ পেয়েছেন দুটি করে উইকেট। কিন্তু যে উইকেট দুটি বাংলাদেশকে লিড পেতে সাহায্য করেছে, সেই বাবর আজম ও সাজিদ খানের উইকেট দুটি কিন্তু ঠিক নাহিদ রানাই নিয়েছেন।
তার মানে সর্বাধিক উইকেট শিকারি না হয়েও সিলেট টেস্টে বাংলাদেশকে এগিয়ে রাখার পেছনে আসল ভূমিকা নাহিদের। বলে দেওয়া যায়, বাংলাদেশ আড়াইশোর বেশি রানে এগিয়ে থাকলে আবারও নাহিদ রানাই হবেন অধিনায়ক শান্তর ‘তুরুপের তাস’।
এআরবি/আইএইচএস