ছুটি নিয়ে বিতর্ক : অনেক প্রশ্নের জবাব দিলেন সাকিব

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৮:৪৩ পিএম, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | আপডেট: ০৮:৫৭ পিএম, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭
ছুটি নিয়ে বিতর্ক : অনেক প্রশ্নের জবাব দিলেন সাকিব

তিনি দলের সেরা পারফরমার। সময়ের প্রবাহমানতায় আরও কয়েকজন নির্ভরযোগ্য পারফরমার তৈরি হলেও এখনো বাংলাদেশ দলের চালিকাশক্তি, সম্ভাবনার আধার তিনি। যে কোনো সিরিজ-আসরে সাকিবের ব্যাট ও বল হাতে জ্বলে ওঠার ওপর টিম বাংলাদেশের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে।

বেশি দূর যেতে হবে না। এইতো অস্ট্রেলিয়ার সাথে এবার দুই ম্যাচের হোম সিরিজের চালচিত্র একটু খুঁটিয়ে দেখলেই দেখা মিলবে এ সত্যের। ঢাকার শেরেবাংলায় প্রথম টেস্টে বাংলাদেশ জিতেছে। যাতে তামিম, মুশফিক আর মিরাজ, তাইজুলেরও অবদান আছে; কিন্তু আসল রূপকার তো ছিলেন সাকিব।

প্রথম ইনিংসে ৮৪ রানের দারুণি ইনিংস। আর বল হাতে দুই ইনিংসে ৫+৫ = ১০ উইকেট। তাতেই গড়ে উঠেছিল জয়ের ভিত। চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে ব্যাট ও বল হাতে অনুজ্জ্বল সাকিব। ১০ উইকেট বহুদুওে, ম্যাচে উইকেট পেয়েছেন মোটে দুটি। আর রান করেছেন সাকুল্যে ২৪+২ = ২৬। তাতেই হেওে বসলো বাংলাদেশ।

এমন একজন পারফরমার হঠাৎ দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের আগে বিশ্রামের আবেদন করেছেন, তাও ওয়ানডে কিংবা টি-টোয়েন্টি সিরিজ থেকে নয়। দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ থেকে। তা নিয়ে সমালোচনার ঝড় বয়ে না গেলেও কিছু প্রশ্ন কিন্তু উঠেছে।

একটা প্রশ্ন অনেকেরই মনে ঘুরপাক খাচ্ছে, ‘আচ্ছা সাকিব তো বাংলাদেশ জাতীয় দলের চালিকাশক্তি। কম হোক, বেশি হোক- জাতীয় দলে খেলার জন্য টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টিতে ম্যাচ ফি পান। বোর্ড তাকে বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটের তুলনায় ভাল মাসোহারা বা বেতনও দেয়। সে কারণে জাতীয় দলের ওপর তার দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং দায়বদ্ধতা অনেক বেশি হওয়ার কথা।

তাহলে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার মত কঠিন কন্ডিশনে দলকে বেকায়দায় ফেলে টেস্ট থেকে বিশ্রাম না চেয়ে আইপিএল, বিপিএল, বিগ ব্যাশ, সিপিএল ও এসএলপিএল- এই সব ফ্র্যাঞ্চাইজি আসর থেকে কেন বিশ্রাম নিলেন না? ওই সব আসরে মোটা টাকা মেলে তাই? তাই যদি না হবে, তাহলে কেন শুধু টেস্ট থেকে বিশ্রাম চাওয়া? সমালোচকরাই শুধু নন, অনেক সাকিব ভক্তের মনেও এ প্রশ্ন।

আজ তার বনানী ডিওএইচএসে নিজের বাসায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েও এ প্রশ্নগুলো শুনতে হয়েছিল সাকিবকে। এ প্রশ্নের জবাবে সাকিব অনেক কথাই বলেছেন।

তার সারমর্ম হলো, দেশের বাইরের ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট গুলোয় কোনই চাপ থাকে না। কোন চিন্তা-ভাবনার উদ্রেকও ঘটে না। মনে হয় অনেকটা ছুটির আমেজে খেলা হয়। আর দেশের হয়ে টেস্ট খেলা মানে দুই ইনিংস ব্যাট করা। পাশাপাশি দুই ইনিংসেই বল হাতে অবদান রাখা। সেটা শতভাগ শারীরিক সুস্থতা আর মনের প্রফুল্লাতা ছাড়া ভাল করা সম্ভব না। তাই টি টুয়েন্টি টুর্নামেন্ট ছেড়ে টেস্ট থেকে বিশ্রামে যাবার ইচ্ছে প্রকাশ করলেন।

আপনি ফ্র্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট ছেড়ে শুধু টেস্টে কেন বিশ্রাম নিতে চাচ্ছেন? এ নিয়ে বিস্তর কথা হচ্ছে। সমালোচনাও হচ্ছে। আপনার প্রতিক্রিয়া কি?

এ প্রশ্নের জবাবে সাকিবের বিরাট ব্যাখ্যা, ‘ (এসবে) প্রতিক্রিয়াই দেখাই না। কারণ আমি বিষয়টা ভেবে দেখি এভাবে- আমার শরীর কেমন। আমার শরীর কি চায়? তা আমি বুঝতে পারব। আমার ওপর যে কতটা ধকল যাবে সেগুলো আমিই ভাল বুঝবো। এই যে ওয়ানডে-টি-টোয়েন্টি কেন বিশ্রাম নিলাম না, বাইরের টি-টোয়েন্টি থেকে কেন বিশ্রাম চাইলাম না, এই প্রশ্নগুলো আসলে একটু অবাকই লাগে। কারণ আমি যখন বাইরের টি-টোয়েন্টি খেলি, তখন সম্পূর্ণ চাপমুক্ত থাকি। না কোনো চাপ আছে, না কোনো ভাবনা আছে। আমার কছে মনে হয় হলিডে ধরনের খেলা। সাথে একটা অভিজ্ঞতাও হয়।’

অর্থনৈতিক বিষয়টা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ অর্থনৈতিক দিক অবশ্যই অনেক গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও থাকে। টেস্ট ম্যাচে আমার যেটা হয় যে যেহেতু আমি ব্যাটিং-বোলিং দুটিই করি, চারটা ইনিংসেই আমার অবদান রাখার দরকার হয়। দলও আশা করে। যদি আমি অর্ধেক অবদান রাখতে পারলাম, অর্ধেক পারলাম না- তাহলে দল যেটা আশা করে সেটা তো পুরোপুরি দিতে পারলাম না। পুরোটা না দিতে পারা মানে, আমার মনে হয় না ভালো দিক। আমি যখন চারটা ইনিংসেই ভালো করতে পারব, এবং আমার মনে হবে সেই সামর্থ্য আমার আছে বা সেই ইচ্ছাটাও থাকবে,আমার মনে হয়, তখনই খেলার সেরা সময়। আমি তো চাইলেই খেলতে পারি। ম্যাচ ফি পাব, পারিশ্রমিক পাব। সবই পাব; কিন্তু ওভাবে খেলাটা আমার মনে হয় না খুব একটা গুরুত্ব বহন করে আমার কাছে। ঠিক আছে, এটা আমার চাকনি; কিন্তু দিন শেষে এখানে আমার আগ্রহ, আমার প্যাশন, ভালোবাসা থেকেই খেলাটা শুরু করা। ওটা যদি না থাকে, ওই খেলাটার মানে আছে বলে মনে করি না।’

এখানেই কথা শেষ নয়, আরও আছে। টেস্ট থেকে বিশ্রামের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সাকিবের শেষ কথা, ‘সীমিত ওভারের খেলা ১ ঘণ্টার হয় বা ৩ ঘণ্টার হয়। টেস্ট ম্যাচ পাঁচ দিনের হয়। প্রস্তুতি আরও ১০-১৫ দিনের। সফরে গেলে প্রস্তুতি ম্যাচ ৩ দিনের থাকে। একটি টেস্ট সিরিজ থেকে বিশ্রাম নিলে পাওয়া যায় এক মাসের বিরতি। টি-টোয়েন্টি থেকে বিশ্রাম নিলে পাওয়া যায় ৩ দিনের বিরতি, ওয়ানডে সিরিজ থেকে বিশ্রাম নিলে পাওয়া যাবে ৭ দিনের বিরতি। আমার একটু বড় বিরতি দরকার। এই কারণেই টেস্ট সিরিজে বিশ্রাম।’

অর্থাৎ সাকিব বোঝাতে চেয়েছেন, অর্থনৈতিক বিষয়টা আছে। তবে সেটাই মূল কারণ নয়। অর্থের কারণেই বা মোটা টাকা মিলবে- এই ভাবনা চিন্তা করেই দেশের হয়ে টেস্ট থেকে কিছু দিন বিশ্রামে থাকার ইচ্ছে জাগেনি। টেস্ট ক্রিকেট খেলার জন্য টি-টোয়েন্টি বিশেষ করে ফ্র্যাঞ্চাইজি আসরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ফিটনেস, মনোযোগ, মনোসংযোগ ও চিত্তে প্রফুল্লতা দরকার। তাই টেস্ট থেকে ছয়মাস দুরে থাকার ইচ্ছে।

এআরবি/আইএইচএস/এমএস