তামিম-সাকিবের স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতায় লাভ বাংলাদেশের

বিশেষ সংবাদদাতা
বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৫:৩৩ পিএম, ২২ জানুয়ারি ২০১৮ | আপডেট: ০৫:৪৪ পিএম, ২২ জানুয়ারি ২০১৮

‘আচ্ছা, বলুনতো টেস্ট আর ওয়ানডে- দুই ফরম্যাটে বাংলাদেশের টপ স্কোরার কারা?’ উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেড়িয়ে আসবে তিনটি নাম- তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিম।

দুই ফরম্যাটেই সবচেয়ে বেশি রান তামিম ইকবালের (৫২ টেস্টে ৩৮৮৬ রান)। তার ঠিক পিছনেই সাকিব আল হাসান (৫১ টেস্টে ৩৫৯৪)। আর তিন নম্বরে মুশফিক, ৫৮ টেস্টে ৩৫১৬।

একই ভাবে ওয়ানডেতেও টপ স্কোরার তামিম (১৭৬ ম্যাচে ৫৯৩৪ রান)। দ্বিতীয় স্থানটি সাকিবের (১৮২ খেলায় ৫১৮৪)। এবং তৃতীয় মুশফিকুর রহিম (১৮১ খেলায় ৪৬৫২)। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটেও দুই শীর্ষ রান সংগ্রহকারি সাকিব (৬১ ম্যাচে ১২২৩ রান) আর তামিম (৫৬ ম্যাচে ১২০২ রান)।

তবে ক্রিকেটের ছোট্ট ফরম্যাটে রান তোলায় তিন নম্বর স্থানটি কিন্তু মুশফিকুর রহিমের নয়। সেখানে প্রমোশন পেয়ে উঠে এসেছেন মাহমুদউল্লাহ (৬০ ম্যাচে ৮৩৭ রান)। মুশফিক ওই ফরম্যাটে একটু পিছিয়ে; পাঁচ নম্বরে (৬১ ম্যাচে ৭৪১)। তার আগে চার নম্বরে সাব্বির (৩৩ খেলায় ৭৪৫)।

ওপরের এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, তিন ফরম্যাটেই জাতীয় দলের বর্তমান ক্রিকেটারদের মধ্যে তুমুল লড়াই। এই লড়াইটি কেমন? ক্রিকেটাররা তা নিয়ে কি ভাবেন?

'আমিই হবো বাংলাদেশের টপ স্কোরার। আমার ওপরে কাউকে যেতে দেব না। এমনকি সাকিবকেও না।' তামিম কি এমন ভাবেন? সাকিবের মাথায় কি বন্ধু তামিমকে টপকে টেস্ট আর ওয়ানডেতে সবচেয়ে বেশি রানের মালিক হবার চিন্তা কাজ করে? কিংবা বাকিদের মাঝেও কি আদৌ কোনো প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা বিরাজ করে?

নিশ্চয়ই খুব জানতে ইচ্ছে করছে, তাই না? তাহলে শুনুন, হ্যাঁ করে। অবশ্যই করে। তামিম চান নিজের অবস্থান ধরে রাখতে। আর সাকিবও চান বন্ধু তামিমকে ধরে ফেলতে কিংবা টপকে যেতে।

হাওয়া থেকে পাওয়া খবর নয়। শেরে বাংলা বা ক্রিকেট পাড়ার গুঞ্জন নয়। সাকিব-তামিম দু'জনার মুখেরই কথা এটা। এ দুই শীর্ষ তারকাও ভেতরে ভেতরে একজন আরেকজনকে প্রতিদ্বন্দ্বি ভাবেন। তবে তাদের ভাষায় এটা, ‘স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা।’

১৯ জানুয়ারি শ্রীলঙ্কাকে গুড়িয়ে দেবার পর জনাকীর্ণ সংবাদ সন্মেলনে সাকিব বলেই দিয়েছেন, 'আমাদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর একটা প্রতিযোগিতা সব সময় কাজ করে।' ৭২ ঘন্টা পর তামিমের মুখেও একই কথা, 'আমার কাছে মনে হয় যে, দলের মধ্যে যদি স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা থাকে। এটা সব সময়ই ভালো।'

ওই উক্তিই শেষ নয়। দুই বন্ধুই মনে করেন, দলের ভিতরে রান করা আর উইকেট শিকার নিয়ে একটা অঘোষিত লড়াই আছে। সাকিব যেমন বলেছিলেন, 'দলের মধ্যে কে বেশি রান করছে, কে বেশি উইকেট পাচ্ছে; এটা সব সময়ই আমরা ইতিবাচক ভাবে আলোচনা করি। আমার কাছে মনে হয়, প্রতিযোগিতাটা আরও ভালো হবে।'

সাকিবের উপলব্ধি, এটা স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা। দলের ভিতরে এই স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতাটা তার কাছে খুব জরুরি মনে হয়। এ সম্পর্কে সাকিবের ব্যাখ্যা, ‘সবার তো সবার প্রতি অবশ্যই একটা প্রত্যাশা থাকে। নিজের সঙ্গে নিজের একটা চ্যালেঞ্জ থাকে। এমন প্রতিযোগিতা দলের জন্য অনেক ভালো। আমরা তিন চারজন রানের দিক থেকে খুব কাছাকাছি আছি। প্রতি ম্যাচেই আমাদের চিন্তা থাকে কার থেকে কে বেশি রান করবে। চিন্তাটা এমন নয় যে, সে আউট হয়ে যাক। আমরা এটা খুব ভালো ভাবে অনুভব করি। আমার কাছে মনে হয় আমাদের তিনজনের (তামিম, মুশফিক আর সাকিব) এই প্রতিযোগিতাটা খুব ভালো। এটা যত বেশিদিন চলতে থাকবে, আমাদের দল তত ভালো খেলতে থাকবে।'

আজ তামিমও বলে দিলেন, 'ভালো হবে যদি প্রতিযোগিতা জমে। আমার কাছে মনে হয় যে, দলের মধ্যে যদি স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা থাকে, এটা সব সময়ই ভালো। আমি যদি কাউকে হারাতে চাই, এমনকি ও যদি আমাকে হারাতে চায়; এটা ভালো। সাকিব তিনে ব্যাট করায় অনেক বেশি ওভার ব্যাট করতে পারবে। এজন্য আমাকেও মনে রাখতে হবে যে, আমাকে পারফর্ম করতে হবে উপরে থাকতে হলে। কেবল সাকিব না , মুশফিকও আছে। সেও অনেক রান করে ফেলেছে। ২০১৭ সালে দারুণ বছর গেছে ওর। স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা থাকলে ব্যাটিং সাইড বলেন বা বোলিং। এটা দলের জন্য ভালো। রুবেল ১০০ উইকেট পেয়েছে, এখন ২০০ উইকেটের জন্য খেলবে। সাত বছরে ১০০ হয়েছে। এখন ওর টার্গেট থাকা উচিত তিন বছরে আরও ১০০ যেন নিতে পারে।'

দুই বন্ধু সাকিব ও তামিমের বক্তব্যে অনেক সত্য ফুটে উঠেছে। দু'জনই বোঝাতে চেয়েছেন, নিজেদের মধ্যে একটা স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা আসলে নিজেকে ছাড়িয়ে যাবার জন্যই উপকারি দাওয়াই।

তামিম ভেতরে ভেতরে চান, আমিই রান করায় সবার ওপরে থাকি। আবার সাকিবও চান আমিও তামিমের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলি। পারলে তামিমকে টপকে যাই।

টেস্টে হয়তো এ সুযোগ পাবেন কম। তবে ওয়ানডেতে এখন তামিমকে ছুঁয়ে ফেলা কিংবা পিছনে ফেলার একটা সুযোগ এসেছে সাকিবের সামনে।

তামিম বরাবরই ওপেনার। সাকিব শেষ দুই ম্যাচ আর আগের দুটি সহ মোট চার ইনিংস তিন নম্বরে ব্যাটিং করেছেন। তার ক্যারিয়ারের প্রায় ৬৭ ভাগ (১২২ টি) ম্যাচে ব্যাট করেছেন অনেক নিচে; পাঁচ নম্বরে। খুব স্বাভাবিকভাবেই তামিমের চেয়ে সাকিবের বল খেলার সুযোগ হয়েছে অনেক কম।

পার্টনারও মিলেছে কম। যে কারণে তামিমের (১৭৬ ম্যাচ) চেয়ে ছয় ম্যাচ বেশি খেলেও সাকিব এখনো ৭৫০ রান পিছনে। সেটা কভার করার সুযোগ এসেছে। এখন সাকিব তিন নম্বরে খেলবেন। উদ্বোধনী জুুটি দ্রুত ভেঙ্গে গেলে দুই বন্ধুর সামনেই থাকবে বড় ইনিংস খেলার অবারিত সুযোগ। এটা যে শুধু তাতের নিজেদের রান ক্ষুধা বাড়াবে, তা নয়। দলেরও লাভ হবে।

এক জোড়া বড় ইনিংস বেড়িয়ে আসার সমূহ সম্ভাবনাও থাকবে। তাতে আগে ব্যাট করলে বড় সড় পুুঁজি আর পরে ব্যাট করলেও একটি দীর্ঘ জুটি গড়ে উঠবে। সব মিলে লাভটা হবে বাংলাদেশের। দলের অভ্যন্তরে এমন স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতায় সমৃদ্ধ হবে টিম বাংলাদেশের ব্যাটিং।

এআরবি/এমএমআর/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :