ক্রিস হ্যারিসকে হাঁকানো সেই ছক্কা এখনো চোখে ভাসে শান্তর

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০২:০৩ পিএম, ২৭ মে ২০১৯

অপির মত বিশ্বকাপে প্রথম হাফ সেঞ্চুরিয়ান তিনি নন। মিনহাজুল আবেদিন নান্নুর মত প্রথম ম্যান অফ দ্য ম্যাচের পুরস্কারটাও তার হাতে ওঠেনি। আবার খালেদ মাহমুদ সুজনের মত পাকিস্তানের সাথে ম্যাচ জেতানো অলরাউন্ড পারফরমেন্সে তিনি ম্যাচ সেরাও হননি। বিশ্বকাপের প্রথম আসরে এক ম্যাচের সেরা বোলিং ফিগারটাও তার নয়।

এমনকি বাঁ-হাতি পেসার মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জুর মত ৯৯’র বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম উইকেট শিকারীও নন তিনি । তারপরও সুঠাম দেহী ডান-হাতি দ্রুত গতির বোলার হাসিবুল হোসেন শান্তর কথা এসে যায়। টাইগারদের বিশ্বকাপ অভিষেকের ‘যা কিছু প্রথম’ তা খুঁজে বের করতে হলে তার কথা না এসে পারে না।

মূলতঃ মিডিয়াম পেসার। ছিলেন দলের উদ্বোধনী বোলার। এক নম্বর স্ট্রাইকবোলারও বলা যায়। অথচ তিনিই কিনা ব্যাট হাতে একটি ছোট্ট অথচ স্মরণীয় ঘটনার সাক্ষী। সাক্ষী বলা বোধকরি ঠিক হলো না। একটি ছোট্ট অথচ স্মরণীয় ঘটনা আবর্তিত তাকে ঘিরে।

বিশ্বকাপে টাইগারদের প্রথম ছক্কাটি আসে হাসিবুল হোসেন শান্তর ব্যাট থেকে। সেটা চেমসফোর্ডে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে।

কনকনে বাতাস আর প্রচন্ড ঠান্ডা আবহাওয়ায় চেমসফোর্ডের হার্ড বাউন্সি ট্র্যাকে বল পড়ে সাপের মত এদিক ওদিক ঘুরছিল। সেখানে আগে ব্যাটিংয়ে নেমে কিউই ফাস্ট বোলারদের সুইংয়ের মুখে শুরু থেকে বিপাকে আমিনুল ইসলাম বুলবুলের দল। দিনের তৃতীয় বলে ভাঙ্গে উদ্বোধনী জুটি।

শূন্য রানে ফিরে যান ওপেনার শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুৎ। সেই শুরু বিপর্যয়ের। তারপর আর মাথা তুলে দাঁড়ানো সম্ভব হয়নি। আসা-যাওয়ার পালা অব্যাহত ছিল। প্রতিষ্ঠিত ব্যাটসম্যানদের মধ্যে দুর্জয় (১৮), আকরাম (১৬) আর অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল (১৫) ছাড়া কেউ দু’অংকে পৌঁছাতে পারেননি।

এক পর্যায়ে ৪৬ রানে ইনিংসের প্রথম অর্ধেক শেষ হয়। আর তারপর ৭ উইকেট খোয়া যায় ৫১ রানে। তখন মনে হচ্ছিল বিশ্বকাপের অভিষেকে ১০০ রান বুঝি করতে পারবে না টাইগাররা। প্রথমে নাঈমুর রহমান দুর্জয় আর এনামুল হক মনি মিলে ৩৪ রান যোগ করে খানিক এগিয়ে দেন।

Shanto-1

তারপরও ৩০ নম্বর ওভারে (২৯.৫) নাঈমুর যখন আউট হন তখন বাংলাদেশের রান ৮ উইকেটে ৮৫। ঠিক সেখান থেকে ১০০ পার করে ১১৬’তে নিয়ে যান পেসার হাসিবুল হোসেন শান্ত। ২৮ বলে একটি করে বাউন্ডারি ও ছক্কায় করেন ১৬ রান।

এবং কিউই পেসার ক্রিস হ্যারিসের বলে তার হাঁকানো সোজা ছক্কাতেই রান গিয়ে ১০০’ স্পর্শ করে। মূলত: পেসার হয়েও দলের বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে একমাত্র ছক্কা হাঁকানো, তাও আবার সেই ছক্কায় চরম বিপদ আর ঘোর অন্ধকার থেকেও দলগত স্কোর ১০০’তে পৌঁছে যাওয়ার অন্যরকম স্বস্তি! দুয়ে মিলে একটা অন্যরকম অনুভুতি হয়েছিল হাসিবুল হোসেন শান্তর।

দীর্ঘদিন পর এবার জাগো নিউজের সাথে বিশ্বকাপের স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসেন শান্ত এবং তখন ওপরের ঘটনার বর্ননা দিতে গিয়ে শান্ত বলে ওঠেন, ‘বিশ্বকাপে আমার সে অর্থে বড়-সড় আর খুব স্মরণীয় স্মৃতি নেই। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে পড়ে। এখনো একা হলে চোখের সামনে এসে ভিড় করে কিছু টুকরো স্মৃতি। প্রথমেই স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে নিউজিল্যান্ডের সাথে প্রথম ম্যাচের কথা।

পরিষ্কার মনে আছে চেমসফোর্ডে ছিল প্রচন্ড শীত আর কনকনে বাতাস। একদম আদর্শ সীমিং কন্ডিশন। উইকেটে বাউন্সও বেশি। একদম ঘন সবুজ ঘাসে ভরা না হলেও গুড লেন্থের আশপাশে সবুজ কচি ঘাস ছিল। বল পড়ে এদিক ওদিক ম্যুভ করেছে। বাতাস ও সিম ম্যুভমেন্ট দুই’ই হচ্ছিল।

বলার অপেক্ষা রাখে না, এমন কন্ডিশনের সাথে আমাদের পরিচয় ছিল না তেমন। এক কথায় আমরা ওই ধরনের আবহাওয়া আর পিচে অনভ্যস্ত। ওই পিচে থিতু হতে সময় লাগে। সেট হতে একটু বেশি সময় উইকেটে থাকতে হয়। সেট হলে ফ্রি খেলা যেত। প্রথম ম্যাচ বলেই হয়ত আমরা সেই ফর্মুলা অনুস্মরণ করতে পারিনি। সে কারণেই হয়তো প্রথম ম্যাচে আমাদের ব্যাটসম্যানরা লম্বা ইনিংস খেলতে পারেননি। তাই শুরু থেকেই বিপাকে পড়ি।

আমাদের অবস্থা শুরু থেকে এতটাই খারাপ ছিল যে, এক সময় মনে হচ্ছিলো রান ১০০’ও হবে না। আমি ব্যাট হাতে তেমন কিছু করতে পারিনি যে বড় গলায় কথা বলবো। তবে এখনো খুব মনে পড়ে কিউই স্লো মিডিয়াম ক্রিস হ্যারিসের বলে একদম সোজা ব্যাটে একটি ছক্কা হাঁকিয়েছিলাম।

সেটাই আমাদের বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে প্রথম ও একমাত্র ছক্কা। আর সেই ছক্কায় আমাদের রান গিয়ে ঠেকে ১০০’তে। চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই, আমার বিগ হিটটি কমেন্ট্রি বক্সের দেয়ালে লেগে আবার মাঠে চলে আসে। জীবনে ক্লাব ক্রিকেট, জাতীয় লিগ আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মিলে বেশ অনেক ছক্কাই হাঁকিয়েছি। তবে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে গিয়ে চেমসফোর্ডে নিউজিল্যান্ড পেসার ক্রিস হ্যারিসের বলে সেই ‘স্ট্রেইট সিক্স’ এখনো মনে দাগ কেটে আছে।

এর বাইরে আরও দুটি ঘটনার কথা খুব মনে পড়ে শান্তর। প্রথমটি স্কটল্যান্ডের সাথে। সে খেলায় বাংলাদেশের পুঁজি কম ছিল (১৮৫)। ঐ পুঁজি নিয়ে জিততে প্রাথমিক ব্রেক থ্রু দরকার ছিল। হাসিবুল হোসেন শান্ত এনে দিয়েছিলেন সেই ভাইটাল ব্রেক থ্রু।

স্কটিশ ইনিংসের প্রথম ওভারের দ্বিতীয় বলেই শূন্য রানে ফিরিয়ে দেন ওপেনার ব্রুস প্যাটারসনকে। নিজের দ্বিতীয় ও স্কটল্যান্ড ইনিংসের তৃতীয় ওভারে আবার শান্ত ম্যাজিক। এবার আউট আরেক স্কটিশ টপ অর্ডার মাইক স্মিথ (১)। আর তাতেই ম্যাচ জয়ের রসদ পায় বাংলাদেশ। ১৮৫ রানের মাঝারী পুঁজি নিয়েও স্কটল্যান্ডের মাটিতে স্কটিশদের হারনো সম্ভব- সে সাহসের বীজটা কিন্তু শান্তই বপন করে দিয়েছিলেন প্রথম।

সে ম্যাচের কথা মনে করে শান্ত বলেন, ‘নিজেকে ভাগ্যবান মনে হয়, আমি প্রথম ওভারের দ্বিতীয় বলেই উইকেট পেয়ে যাই। ওই উইকেট শিকারের দৃশ্য এখনো চোখে ভাসে। একদম জোরের ওপরে ইয়র্কার ছুঁড়েছিলাম। একদম পারফেক্ট ইয়র্কার গিয়ে পড়ে স্কটল্যান্ড ওপেনার ব্রুস প্যাটারসনের একদম পায়ের গোড়ায়। একদম প্লাম্ব এলবিডব্লিউ। আর তার এক ওভার বিরতি দিয়ে তৃতীয় ওভারে আরও একটি উইকেট পাই। এবার মাইক স্মিথ হন কট বিহাইন্ড। অন্য প্রান্তে মঞ্জুও শুরুতে উইকেট নিয়ে ফেলে। সব মিলে আমরা প্রথম থেকেই সাঁড়াসি আক্রমণে চেপে ধরি স্কটল্যান্ডকে।’

Shanto-2

এছাড়া আরও একটি স্মৃতি তাড়া করে বেড়ায় শান্তকে। তবে সেটা সুখ স্মৃতি নয়। দুঃখের। অস্ট্রেলিয়ার সাথে অজি তারকা মার্ক ওয়াহর উইকেট পেতে পেতেও পাননি। সে আক্ষেপ পোড়ায় এখনো। ‘জানেন! অস্ট্রেলিয়ার তখনকার সেরা ব্যাটসম্যান মার্ক ওয়াহর উইকেট প্রায় পেয়েই যাচ্ছিলাম। আমার বলে কাট করতে গিয়ে গালিতে ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন মার্ক ওয়াহ; কিন্তু অপি তা ধরেও ফেলে দেয়। আমার মার্ক ওয়াহর উইকেট হয় হাতছাড়া। সে আক্ষেপ থেকেই গেছে।’

প্রথম বিশ্বকাপ আর সবার মত শান্তকে উত্তেজনায় ভাসিয়ে নিয়েছিল। তাইতো অনুভুতিটা এমন, আসলে প্রথম বিশ্বকাপের পুরোটাই আবেগ আর উত্তেজনায় ভরা। অনেক সুখ স্মৃতি। পরতে পরতে উত্তেজনা, আবেগ, উচ্ছাস। শিহরণ আর রোমাঞ্চ।

সেটা খেলতে যাবার বেশ আগে থেকেই। আর সবার মত আমিও মুখিয়ে ছিলাম কবে যাব ইংল্যান্ডে? কোন সময় নামবো মাঠে। বল হাতে বোলিং রান আপ থেকে দৌড় শুরু করবো। এসব ভাবতাম আর মনের ভিতরে একটা অদ্ভূত পুলক অনুভব করতাম।

ঠিক ভয়-ডর বলবো না, আবার একটু অন্যরকম অনুভূতিও ছিল। মনে হতো বিশ্বের সব সেরাদের সেরা পারফরমার ও শীর্ষ তারকাদের সাথে খেলবো, কি করবো? কি হবে? নিজেকে মেলে ধরতে পারবো তো- এসব সাত পাঁচ ভাবনা আর কি।

আর একদিনের কথা না বললেই নয়। তাহলো পাকিস্তানের সাথে ম্যাচ। ওই একটি খেলায় আমি দলে ছিলাম না। আমাকে আর মঞ্জুকে বিশ্রাম দেয়া হয়। আমরা না খেলেও পাকিস্তানের সাথে ম্যাচে ড্রেসিং রুম আর ডাগ আউটে বসে অনেক মজা করেছি। সারাক্ষণ চেঁচামেচি করেছি। শুরুতে মনে না হলেও এক সময় বুঝে গেলাম আমরা জিততে যাচ্ছি। নিজে খেলিনি তাতে কি? প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে গিয়ে সেই সময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপের দল পাকিস্তানকে হারনো যে অনেক বড় সাফল্য। বিশাল প্রাপ্তি। সে ম্যাচের কথা ভুলবোনা কখনো।’

এআরবি/আইএইচএস/এমকেএইচ

আপনার মতামত লিখুন :